আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে জাতীয় নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছেন নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলেন, কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিযোগিতা নয় গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে দলগুলোর স্পষ্ট ও দায়িত্বশীল অবস্থান থাকা জরুরি।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) বিকাল সাড়ে তিনটায় চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ, বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)-এর উদ্যোগে সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির স্থায়ী ক্যাম্পাসের বায়েজিদ আরেফিন নগরের হলরুমে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। আলোচনার বিষয় ছিল রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে জাতীয় নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান।
বক্তারা বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কারণে বর্তমানে যে মানবিক, আর্থিক, সামাজিক ও পরিবেশগত সংকট বিদ্যমান, ভবিষ্যতে এর সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামরিক সংকট যুক্ত হলে তা বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের নাজুক পরিস্থিতির সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট যুক্ত হলে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে মারাত্মক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি।
তারা আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে কেবল মানবিক সহায়তার দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই। এই সংকটের দীর্ঘসূত্রতা জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন শুধু রোহিঙ্গাদের জন্য নয়, বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সব রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। এ বিষয়ে ভিন্নমতের কোনো সুযোগ নেই। ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ না হলে ভবিষ্যতে এই সংকট ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
তিনি বলেন, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তিনটি স্তরে রোহিঙ্গা সমস্যা মোকাবিলা করেছিলেন মানবিক সহায়তা, আন্তর্জাতিক সংযোগ এবং কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে। তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা। ১৯৭৮ সালের ৭–৯ জুলাই ঢাকায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।
অনুষ্ঠানের ধারণাপত্র উপস্থাপনকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সিসিআরএসবিডি’র নির্বাহী পরিচালক প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ বলেন, জাতীয় স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলো নির্বাচনী ইশতেহারে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কেবল ক্ষমতার রাজনীতি গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে বাধাগ্রস্ত করবে।
সিসিআরএসবিডি’র চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনায় প্রধান আলোচক ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো. কামাল উদ্দিন।
সভাপতির বক্তব্যে লিয়াকত আলী চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু মানবিক সমস্যা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি, সামাজিক কাঠামো ও পরিবেশের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গোলটেবিল বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, গবেষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। বক্তারা বলেন, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসছে, অথচ দীর্ঘমেয়াদে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী বহন করা বাংলাদেশের পক্ষে বাস্তবসম্মত নয়। আঞ্চলিক জোটগুলোর কার্যকর ভূমিকার অভাব এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে এই সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশকে এককভাবে বহুমাত্রিক চাপ সামলাতে হচ্ছে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিসিআরএসবিডি’র পরিচালক প্রফেসর সরওয়ার জাহান। স্বাগত বক্তব্য দেন মো. নাজমুল ইসলাম চৌধুরী, পরিচালক, সিসিআরএসবিডি।













