২৬ মার্চ ২০২৬

পরিপাটি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র

মাকসুদ আহম্মদ, বিশেষ প্রতিবেদক»

ঝকঝকে তকতকে আর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। এটি চট্টগ্রামে অন্যতম সরকারি দফতর পাহাড়তলীস্থ কৃষি গবেষণা কেন্দ্র। দফতরের প্রবেশ দ্বারেই অর্থাৎ রাস্তা থেকে ভেতরে ঢোকার পথে আগতদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ধারণা দিতে বসানো নানা আয়োজন। ভেতরে প্রবেশের পর কোথাও কোন ময়লা আবর্জনা ফেলার সুযোগ নেই। সরকারি দফতরে এমন ব্যবস্থাপনা শুধু চট্টগ্রামেরই নয়, অন্য জেলা শহরগুলোতে রয়েছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

কর্মরতরা বললেন, পরিবেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন না থাকলে কাজের আগ্রহ থাকে না। কর্মকর্তা হোক আর কর্মচারীই হোক সকলের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারলে সকল দফতরের আঙিনাই হবে পরিপাটি। তবে এ আঙিনা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার পেছনে শুধু আমারই নয়, সকল কর্মকর্তা কর্মচারীদের অবদান রয়েছে। সে সঙ্গে আগতরাতো আছেনই। কারণ, নিজেরা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হলেই হয় না।

এই আঙ্গিনার ভেতরে থাকা অন্যদেরকেও পরিষ্কার থাকার নির্দেশনা বা ঐ রকম পরিবেশে ঘুরে ফিরে দেখানো গেলে অবশ্যই সচেতনতা জেগে উঠবে প্রত্যেকের মাঝে। প্রথমে কয়েকটি ডাস্টবিন দেওয়া হয়েছিল দফতর আঙিনায়। পরবর্তীতে আবাসস্থলেও এ সচেতনা সৃষ্টি করতে প্রত্যেক পরিবারকে ডাস্টবিন দেয়া হয়েছে। এমনকি কর্মশালায় আগতদের মাঝেও ঝুড়ি আকারের ডাস্টবিন বিতরণ করা হয় প্রায়ই।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধীনে থাকা পাহাড়তলী কৃষি গবেষণা কেন্দ্র পরিদর্শন করে পরিবেশ সচেতনতার দিক নির্দেশনা পাওয়া গেছে। গাড়ি থেকে নামতেই বিশাল এলাকার এ গবেষনা কেন্দ্রের প্রাচীর গেটেই দেখা যাবে প্লাস্টিকের ডাস্টবিন। যাদের অক্ষর জ্ঞান নেই তারা ডাস্টবিনের গায়ে থাকা সঙ্কেত চিত্র দেখেই বুঝতে পারবেন এটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার সামগ্রিক চেষ্টার একটি উদ্যোগ। তবে যদি কোন বিদেশী নাগরিক তথা যারা বাংলা বোঝেন না তাদের জন্যও এ ডাস্টবিনের গায়ে লেখা রয়েছে ‘ইউজ মী’।

প্রাচীর ঘেরা গেট দিয়ে প্রবেশ করতেই হাতের বা দিকে পড়বে পাহাড়তলীস্থ চট্টগ্রাম কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের অফিস ভবন। এ ভবনটি ফখরি ইট দিয়ে তৈরি। কোন ধরনের প্লাস্টার করা হয়নি। তবে ভবনটিকে সবুজে ছেয়ে দিতে এক ধরনের পরজীবী উদ্ভিদ লাগানো হয়েছে। ছোট পাতার ও গাঢ় সবুজ রঙের হওয়ায় পুরো ভবনটির বাহিরের দেয়াল আস্তে আস্তে সবুজে পরিপূর্ণ হচ্ছে। এমন্ এক সময় আসবে যখন শুধুমাত্র দরজা জানালাগুলো দেখা যাবে। ইটের কোন বালাই বাহির থেকে পর্যবেক্ষণ করা যাবে না। গত কয়েক বছরে পরজীবী লতাজাতীয় গাছগুলো ভবনের প্রায় অর্ধেকটা ঢেকে গেছে। অনেকটা আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে এ ভবনটি। ফটোসেশনের উপযোগী এ ভবনটি আগতদের নজর কাড়ে খুব সহজে। দূর থেকে অনেকটা মনেহয় সবুজের রঙে গড়া এ ভবন। কিন্তু কাছে আসলে বুঝা যায় ইটের উপর সবুজের প্রলেপ গাছের পাতায় ভরে গেছে।

এ কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের ভেতরের সড়কের একধারে নারিকেল গাছের সারি অনেকটা বেস্টনির মত রূপ নিয়েছে। রাস্তার দুদিকেই ফসলের মাঠ। এ মাঠে বিভিন্ন জাতের ফলন নিয়ে গবেষণা করা হয়। শাক সবজি থেকে শুরু করে ফল ফলাদি সকল পুরনো জাতের বীজের উপর গবেষণা করে নতুন জাতের উদ্ভাবন করছেন এ দফতরের গবেষকরা। সহায়ক হিসেবে রয়েছেন বিভিন্ন বিভাগের কর্মচারী, স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিক এবং দিনমজুর।

পরিচ্ছন্নতার একটি অংশ হিসেবে গত দুমাস ধরে এ দফতরের সম্মুখভাগে রাস্তা সংলগ্ন গেটে যেমন রাখা হয়েছে ডাস্টবিন তেমনি দফতরের ভেতরে বাইরে সবদিকেই রয়েছে ডাস্টবিন। কয়েক কদম হেঁটে গেলেই মাঠের দিকেও রয়েছে ডাস্টবিনের ছড়াছড়ি। এত বেশি ডাস্টবিন রাখার পেছনে মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ঐ গন্ডির মধ্যে থাকা কর্মকর্তাসহ শ্রমিক কর্মচারীরাই নয়, আগতরাও যাতে ময়লা আবর্জনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে না ফেলতে পারেন।

সকলেই এ নির্দেশনা মেনে চলতে নিজেরা যেমন সচেতন হয়েছেন, তেমনি অন্যদেরকেও সচেতন করে তুলতে সদা সজাগ দৃষ্টি রেখেছেন ময়লা আবর্জনার উপর। এক্ষেত্রে শুধু দফতরের আশপাশের আঙিনায়ও নয়, দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ এমনকি এ আঙিনায় থাকা কর্মকর্তা কর্মচারীদের আবাসস্থল গুলোতেও পরিপাটি অবস্থা।প্রত্যেকটি আবাসস্থলে তিনটি করে ডাস্টবিন দেয়া হয়েছে। একেকটি ডাস্টবিনে একেক ধরনের ময়লা আবর্জনা ফেলার নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। প্রথম প্রথম এ নির্দেশনার ক্ষেত্রে ডাস্টবিনের গায়ে পলিথিন জাতীয়, রান্না ঘরের শাকসবজির উচ্ছিষ্ট অংশ ও অন্যান্য ময়লা আবর্জনা ফেলার স্টীকারও লাগানো হয়েছিল। ব্যবহারের নীতিমালা অনুযায়ী ঐ আঙিনায় থাকা সকলেই অভ্যস্ত হয়ে গেছেন পরিষ্কার রাখার অভিযানে।

পাহাড়তলী কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বিশাল এলাকা এখন পরিচ্ছন্নতার ছোট্ট শহরে গ্রামের অবয়বে পরিণত হয়েছে। কোথাও কোন ময়লা নেই। গৃহস্থালীর বা রান্না ঘরের ময়লাগুলো সারে পরিণত করা হচ্ছে। পলিথিনগুলোকে বিশাল একটি গর্তে পুঁতে রাখা হচ্ছে। কারণ যত্রতত্র পলিথিন ফেলা হলে ফসলের বৃদ্ধি ক্ষমতা হ্রাস পায়। শাক সবজি ও মাছের আমীষ জাতীয় ময়লাগুলো ডাস্টবিন থেকে সংগ্রহ করে আরেকটি গর্তে রাখা হচ্ছে। পরতে পরতে মাটি দিয়ে এসব রান্নাঘরের উচ্ছিষ্টকে সারে পরিণত করা হচ্ছে। জৈব সার হিসেবে এ সার আবার গবেষণার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

গবেষনার মাঠে বিভিন্ন ফসলের জন্য তৈরি করা বেডের সামনে সাইন বোর্ড আকারে সাঁটানো হয়েছে সার প্রয়োগের বিভিন্ন নিয়ম। বিভিন্ন স্তরে ফসলের উপর গবেষণা চলছে এ কেন্দ্রে। স্তর ভিত্তিক এসব গবেষণায় কেমিক্যাল সার প্রয়োগ, কেমিক্যাল সারবিহীন জৈব সার প্রয়োগ, জৈব সার ও রান্না ঘরের উচ্ছিষ্ট দ্রব্যের সার, কমপোস্ট সার ও সারবিহীন বেডে ফসলের বীজ রোপণের মধ্য দিয়ে গবেষণা অব্যাহত রাখা হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে এ গবেষণায় স্থান কাল পাত্র ভেদে ফসলের বীজ থেকে চারা গজানো এবং সেই চারা থেকে ফসল উৎপাদন পর্যন্ত পরিচর্যা ধাপে ধাপে করেই বিভিন্ন ফসলের নতুন জাত উদ্ভাবনের গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন এ কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা। তাদের সহায়তা করছেন কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিকরা। নিদারুন এ দৃশ্য যেন সরকারি দফতরের প্রতিকী মাইলফলক।

বাংলাধারা/এফএস/এফএস

আরও পড়ুন