১ এপ্রিল ২০২৬

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের প্রশ্নবিদ্ধ অনুমোদন

পাহাড়তলীতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা নিয়ে বিতর্ক

চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে রেলওয়ের শহীদ শাহজাহান মাঠে আগামী ৫ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত মাসব্যাপী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে ‘এ এম এস পি এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোরালো প্রচারণা চালানো হলেও, মেলাটির বৈধতা, আয়োজক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ বাধ্যতামূলক। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, উক্ত মেলার ক্ষেত্রে এসব নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

আয়োজক প্রতিষ্ঠান ‘এ এম এস পি এন্টারপ্রাইজ’-এর প্রোপ্রাইটর এম এম মোশাররফ হোসেন। যদিও ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা কোনো কাজের অন্তরায় নয়, তবুও আন্তর্জাতিক মানের একটি বড় মেলা আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা প্রতিষ্ঠানটির আছে কিনা—তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া, আন্তর্জাতিক মেলার জন্য নির্ধারিত আবেদন ফি বাবদ ২ হাজার মার্কিন ডলার জমা দেওয়া হয়েছে কিনা, সে বিষয়েও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।

রেলওয়ের অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন

রেলওয়ের মালিকানাধীন শহীদ শাহজাহান মাঠ বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আয়োজক প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করেছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিজ্ঞ ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে তুলনামূলক অনভিজ্ঞ একটি প্রতিষ্ঠানকে এমন বড় আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়াকে অনেকেই অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন।

এদিকে, একই সময়ে এবং কাছাকাছি স্থানে রেলওয়ের পলোগ্রাউন্ড মাঠে ১০ এপ্রিল থেকে ৯ মে পর্যন্ত আরেকটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে অর্থনৈতিক কার্যক্রম, দর্শনার্থীর উপস্থিতি এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একই সময়ে দুটি বড় মেলা আয়োজন করলে উভয় আয়োজনের আকর্ষণ কমে যেতে পারে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিয়েও সংশয়

একটি মেলাকে আন্তর্জাতিক হিসেবে অভিহিত করতে হলে নির্দিষ্ট সংখ্যক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সরাসরি অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো থাকা বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি, মেলা শুরুর অন্তত সাত দিন আগে অংশগ্রহণকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠানের তালিকা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে হয়। তবে এই মেলার ক্ষেত্রে এসব শর্ত পূরণ করা হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক শর্ত

সংশ্লিষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী, এ ধরনের মেলা আয়োজনের জন্য আয়োজক প্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন ও ভ্যাট নিবন্ধন থাকতে হয়। পাশাপাশি বড় বিনিয়োগ পরিচালনার সক্ষমতা প্রমাণে ব্যাংক সলভেন্সি সার্টিফিকেট এবং বিদেশি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তিপত্র প্রয়োজন হয়। এসব শর্ত পূরণ না করলে আন্তর্জাতিক মানের মেলা আয়োজনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

রেলওয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলী-১ আবু রাফি মোহাম্মদ ইমতিয়াজ হোছাইনের মোবাইলে বারবার কল করা হলেও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “মাঠ বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। আবেদনকারী প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছে বলেই প্রাথমিকভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা হিসেবে আয়োজনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার অনুমোদন নেওয়ার দায়িত্ব আয়োজকদেরই।”

তিনি আরও বলেন, “একই সময়ে একাধিক মেলার অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে। তবে মাঠের প্রাপ্যতা ও পূর্বনির্ধারিত সূচির কারণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”

প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে 

উপরোক্ত নানা অনিয়ম ও অস্পষ্টতার প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠেছে—প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক শর্ত পূরণ না করে একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মতো বড় আয়োজনের অনুমতি পায়?

(চলবে…)
পরবর্তী পর্বে থাকছে—আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার নামে কারা অংশ নিচ্ছেন এবং মেলার আড়ালে আসলে কী ঘটছে।

আরও পড়ুন