২৬ মার্চ ২০২৬

পিকআপ চাপায় নিহত পাঁচ ভাইয়ের শোকাবহ শ্রাদ্ধানুষ্ঠান

সায়ীদ আলমগীর, কক্সবাজার»

পিতার মৃত্যুর ১০ দিনের মাথায় শ্রাদ্ধ শুরুর আগে পূঁজা করে ফেরার পথে পিক-আপ চাপায় নিহত পাঁচ ভাইয়ের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান শোকাবহ পরিবেশে সম্পন্ন করেছে পরিবার। শুক্রবার (১২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী মৃত্যুর চার দিন পর শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে হাজার খানেক মানুষকে খাওয়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন নিহতদের বোন জামাই খগেশপ্রতি চন্দ্র।

কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মালুমঘাট রিংভং ছগিরশাহকাটা হাসিনাপাড়া এলাকার পরিচিত মুখ পল্লী চিকিৎসক সুরেশ চন্দ্র শীল (৬০) বার্ধক্য জনিত রোগে মারাযান গত ৩০ জানুয়ারি। এর ১০ দিনের মাথায় গত ৮ ফেব্রুয়ারী ভোরে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জন্য সুরেশের সাত ছেলে ও দুই মেয়ে স্থানীয় তিনমাথা এলাকার মন্দিরে যান। সেখান থেকে ৯ ভাইবোন একসঙ্গে বাড়ি ফিরছিলেন। পথে পিকআপের ধাক্কায় ঘটনাস্থলে চার ভাই অনুপম শীল (৪৬), নিরুপম শীল (৪০), দীপক শীল (৩৫), চম্পক শীল (৩০) মারা যান। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিকেলে মারা যান আরেক ভাই স্মরণ শীল (২৯)।

একই ঘটনায় গুরত্বর আহত আরেক ভাই পড়ে আছেন চট্টগ্রাম মহানগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র্রে (আইসিইউ)। আরেকজন চিকিৎসাধীন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আর তাদের বোন হিরা শীল (৪৫) চিকিৎসাধীন চকরিয়ার মালুমঘাট খ্রিষ্টান মেমোরিয়াল হাসপাতালে। বৃহস্পতিবার তার পায়ে অস্ত্রোপচার হয়েছে।

ডুলাহাজার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাসানুল ইসলাম আদর বলেন, সকাল থেকে ধর্মীয় রীতিতে আচার অনুষ্ঠান শুরু হয় নিহতদের পরিবারে। সেই অনুষ্ঠানে যোগ দেন জেলা ও উপজেলা প্রশাসন কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিগণ। নিহতদের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে নগদ এক লাখ টাকা সহযোগিতা দেয়া হয়েছে। দেয়া হয়েছে শীতবস্ত্র ও ভোগ্যপণ্যও।

শুক্রবার (১১ ফেব্রুয়ারী) জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদের পক্ষ থেকে চকরিয়ার মালুমঘাটে পিকআপ চাপায় নিহত সহোদর পাঁচ ভাইয়ের পরিবারকে দেখতে যান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আমিন আল পারভেজ। তিনি শোক সন্তপ্ত পরিবারকে জেলা প্রশাসকের পক্ষ হতে সান্তনা ও সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। এ সময় তাদের পরিবারের জরুরী ব্যয় নির্বাহের জন্য নগদ এক লাখ টাকা, খাদ্য ও শীতবস্ত্র সহায়তা প্রদান করেন। দূর্ঘটনার পরেরদিন উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে নিহতদের পরিবারকে এক লাখ পঁচিশ হাজার টাকা নগদ সহায়তা দেয়া হয়েছিল।

এসময় চকরিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুল করিম সাঈদী, উপজেলা নির্বাহী অফিসার জেপি দেওয়ান, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রাহাতুজ্জামান এবং ডুলাহাজরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাসানুল ইসলাম আদসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।

অপরদিকে, ১০ দিনের ব্যবধানে স্বামী ও পাঁচ ছেলে হারিয়ে এখনো নির্বাক সুরেশের স্ত্রী মানু রানী শীল (৫০)। শোকের বোঝা বুকে নিয়ে শুক্রবার পাঁচ ছেলের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান সমপন্ন করেন তিনি।

চকরিয়ার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মালুমঘাট মেমোরিয়াল খ্রিষ্টান হাসপাতালের পাশের গ্রাম হাসিনাপাড়া। বন বিভাগের পরিত্যক্ত ভূমিতে ৩৪টি সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু পরিবার এ পাড়ায় বাস করেন। অবসরপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য পরিদর্শক সুরেশ চন্দ্রের টিনের আধা পাকা বাড়ি পাড়ার মাঝখানে। শুক্রবার সকাল থেকে সুরেশের বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর উপস্থিতি। বাড়ির উঠানে চলছে নিহত পাঁচ ভাইয়ের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান। স্বামী-আর পাঁচ ছেলেকে হারিয়ে শোকে কাতর মানু রানী শীল নিজেই শ্রাদ্ধানুষ্ঠান তদারকি করেন।

দেখা গেছে, উঠানে টানানো শামিয়ানার নিচে পূজান্ডপ। সেখানে চেয়ারে রাখা পাঁচ ভাইরে ছবির ওপর পরানো ফুলের মালা। পুরোহিত পাশে বসে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা চালাচ্ছেন। মানু রানী নিহত পাঁচ সন্তানের স্ত্রীদের পূজার স্থলে নিয়ে আসেন। সবার পরনে সাদা শাড়ি।

মন্ডপের পাশে দাঁড়িয়ে কান্নাকাটি করছিলেন নিহত অনুপম শীলের স্ত্রী পপি শীল (৩৫)। পাশে মেয়ে দেবত্রী শীল (১৫)। পপি বলেন, স্বামীর অবর্তমানে দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে কী করবেন, ভেবে পাচ্ছেন না। মেয়ে পড়ছে দশম শ্রেণিতে, ছেলে পঞ্চম শ্রেণিতে। তার স্বামী ছিলেন পল্লিচিকিৎসক। লামার আজিজনগর বাজারে তিনি রোগী দেখে সংসার চালাতেন, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতেন। এখন তিনি নেই, ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার খরচ, সংসার চালানোর মতো কোনো সম্বলও তার নেই।

একই কথা বলেন, নিহত দীপক শীলের স্ত্রী পূজা শীল (২৬) । একমাত্র ছেলে আয়ূশ শীল (৬)’র মা পূজা বলেন, তার স্বামী দীপক সুশীল কাতারপ্রবাসী ছিলেন। সেখানে তার (দীপক) একাধিক দোকান ছিল। বাবার শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে এসে পিকআপের চাপায় মারা গেলেন তিনি। এখন কাতারের দোকানের খবর নেয়ার লোকও নেই। তার হাতে স্বামীর রেখে যাওয়া কিছুই নেই।

পূজার স্থলের আরেক পাশে রান্না-বান্নার কাজ শেষে দুপুর থেকে খাওয়ানো হয় লোকজনকে। সবকিছু দিক নির্দেশনা দিচ্ছিলেন মা মানু রানী শীল।

শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে চট্টগ্রামের হাসপাতালের আইসিইউতে সংকটাপন্ন সন্তান রক্তিম সুশীলের সুস্থতা কামনা করে প্রার্থনা করেন মা মানু রানী। ক্ষণে ক্ষণে বলছিলেন, ‘ভগবান, রক্তিমকে ফিরিয়ে দাও। মায়ের কাছে পাঠিয়ে দাও। এ জীবনে আর কত পরীক্ষা নিবা ভগবান। ভগবান পাঁচ ছেলের পরিবর্তে আমাকে উঠিয়ে নিলেই বেশি খুশি হতাম। এত কষ্ট হতো না; আর সহ্য করতে পারচ্ছি না। এসব কথার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন এ বৃদ্ধা। যা উপস্থিত সবাইকে কাতর করে তোলে।

ঘটনায় অক্ষত অবস্থায় বেঁচে যাওয়া সুরেশ চন্দ্রের মেয়ে মুন্নী শীল বলেন, ঘটনার চার দিন পার হলেও পুলিশ এখনো পিকআপচালককে আটক করতে পারেনি। চালক ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের চাপা দিয়েছেন। এটা পরিকল্পিত হত্যাকান্ড।

অনুষ্ঠান তদারকির দায়িত্বে থাকা, মুন্নী শীলের স্বামী খগেশপ্রতি চন্দ্র বলেন, নিহত পাঁচ ভাইয়ের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান দুপুরে শেষ হলে খাবার পরিবেশন শুরু হয়। অন্তত এক হাজার মানুষকে খাওয়ানো হয়েছে, রকমারি সবজির সঙ্গে সাদা ভাতের নিরামিষ।

খগেশপ্রতি বলেন, চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তাদের ভাই রক্তিম শীলের অবস্থা সংকটাপন্ন। তাকে বাঁচানো যাবে কি না, সন্দেহ। গত বুধবার রাতে সেখানকার আইসিইউতে ৭২ ঘণ্টা পার হয়েছে, কিন্তু এখনো তার নড়াচড়া নেই। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন প্লাবন শীলের অবস্থাও অপরিবর্তিত, উন্নতি হচ্ছে না। বুধবার দুপুরে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরে হঠাৎ তিনি মাটিতে পড়ে যান। এখনো তিনি কথা বলতে পারছেন না।

স্বজনরা জানান, হিন্দুধর্মীয় রীতি অনুযায়ী স্বাভাবিক কারও মৃত্যু হলে ১০ দিন পর আর অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে ৪ দিনের মাথায় শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান করা হয়। এ কারণে শুক্রবার নিহত পাঁচ ভাইয়ের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়েছে।

চকরিয়ার মালুমঘাট হাইওয়ে থানার ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক শেফায়েত হোসেন বলেন, ঘটনার দিন রাতেই নিহতদের ভাই বাদি হয়ে অজ্ঞাত চালককে আসামি করে মামলা করেছেন। পিকআপ ভ্যান জব্দ করা হয়েছে। ভ্যানের চালক ও মালিককে ধরার চেষ্টা চলছে। ঘটনাটি পরিকল্পিত কিনা তাও গভীরভাবে তদারক করে দেখা হচ্ছে।

আরও পড়ুন