সায়ীদ আলমগীর, কক্সবাজার »
কক্সবাজার পৌরশহরের মোহাজের পাড়া-ঘোনার পাড়ায় মুক্তিযোদ্ধা পরিবারসহ দেড়’শ পরিবার উচ্ছেদ আতংকে রয়েছে। দীর্ঘ ৪০-৪৫ বছর ধরে বাস করা এসব বসতি স্থলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও কক্সবাজার পৌরসভা পানির টাংকি বসানোর উদ্যোগের কথা বলে কয়েকবার সার্ভে করায় তারা উচ্ছেদ আতংকে দিনাতিপাত করছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পানির টাংকি বসানোর নামে ১৫০ পরিবারকে জোরপূর্বক উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র বন্ধের দাবিতে গত ৫ অক্টোবর জেলা প্রশাসককে লিখিত আবেদন দিয়েছেন শংকিত পরিবারের সদস্যরা।
আবেদনে তারা উল্লেখ করেন, কক্সবাজার পৌরসভার ঘোনার পাড়া বড় কবরস্থানের লাগোয়া প্রায় ১৫০ পরিবার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ঘোনার পাড়া ও ১০ নম্বর ওয়ার্ডের মোহাজের পাড়ার আওতাভুক্ত। তাদের বসতি কক্সবাজার মৌজার বিএস ১নং খাস খতিয়ানের বিএস ৩৬১৯ দাগের সরকারি জমিতে। দাগের ২ একর ৫৭ শতক জমিতে জেলার বিভিন্ন উপকূলের জলবায়ু উদ্বাস্তু শতাধিক পরিবার ৪০-৪৫ বছর ধরে বাস করে আসছেন। সেই মতে ভোটার তালিকাভূক্তি, পৌর হোল্ডিং ট্যাক্সসহ সরকারি সকল পাওনা সন সন পরিশোধ করে আসছেন তারা।
কিন্তু সম্প্রতি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও কক্সাবাজার পৌরসভার সমন্বয়ে কবরস্থান লাগোয়া উচু পাহাড়ের টিলায় পানি সরবরাহের রিজার্ভ টাংকি করার উদ্যোগ নেয়। এডিবির অর্থায়নে পানির ট্যাংক বসাতে ইত্যবসরে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর উক্ত জায়গায় বেশ কয়েকবার সার্ভে করে। তখন বলা হয় টিলা স্থানটির আশ-পাশে বসতিগুলো সরে যেতে হবে। বিনা নোটিশে পৌরসভা তাদের সরে যাবার তাগাদাও দিয়েছে। এতে স্থানীয়দের মাঝে মাথাগুজার ঠাঁই হারানোর আতংক বিরাজ করছে।
স্থানীয় অধিবাসী মোজাম্মেল হক, শামশুল আলম, রুমা আকতারসহ একাধিকজন বলেন, এখানকার বাড়িটি ছাড়া আমাদের মাথাগুজার আর কোথাও ঠাঁই নেই। বিগত ১৯৯৫ সালেও একইভাবে বসতি সরানোর পাঁয়তারা করা হয়। সেসময় মহামান্য হাইকোর্টে একটি রীট পিটিশন দায়ের করলে (নং- ২০৩০/১৯৯৯) বিজ্ঞ বিচারক পিটিশন মঞ্জুর করে উচ্ছেদ না করতে নির্দেশ দিয়েছিল। পানি স্থানীয় বসবাসকারিদের জন্য। কিন্তু বসতি তুলে দিয়ে পানির ট্যাংক কার উপকারে আসবে- এমন প্রশ্ন রাখেন তারা।
স্থানীয় নুর আহমদ, মুহাম্মদ জাহেদ, জাহাঙ্গীর আলম, আমান উল্লাহ, নুর হোসেন ও আবু তাহের বলেন, আমাদের বসতির জমির মালিক জেলা প্রশাসন। কিন্তু উচ্ছেদের হুমকি দিচ্ছে পৌর কর্তৃপক্ষ, এটি আইনসম্মত নয়। তাছাড়া কাউকে নোটিশও প্রদান করা হয়নি। মিয়ানমারের ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে যদি মানবিকতার কারণে হাজার হাজার একর বনভূমি বিরাণ করে বসতি করতে দেয়া যায়- তাহলে আমরা বাংলাদেশি নাগরিক হয়ে সরকারি খাস জমিতে বাস করতে পারবো না কেন? তাছাড়া উচ্চ আদালত আমাদের মাথাগুজার ঠাঁইটি বন্দোবস্তি দিতে নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রশাসন সে নির্দেশনা পালন শুরু করলে আমরা নিয়মমতো ফি জমা দেব। শেষ আশ্রয়স্থল কেড়ে নিলে পরিবার পরিজন নিয়ে আত্মহত্যা করা ছাড়া কোন পথ থাকবে না।
স্থানীয় অধিবাসী মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ প্রায় অর্ধশত বছর এ জায়গায় বাস করছি। এখন পানির টাংকি বসানোর অজুহাতে উচ্ছেদ করা হলে এ বৃদ্ধ বয়সে পরিবার নিয়ে পথে বসতে হবে। বিমানবন্দর সম্প্রসারণে জমি প্রয়োজন হওয়ায় খাসজমিতে বাসকারীদের খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্প করে ঘর দেয়া হয়েছে। এখানে পানির টাংকি প্রয়োজন হলে অধিবাসীদের অন্যত্র মাথাগুজার ঠাঁই করেদিক। তাছাড়া জনবসতি এলাকায় না করে সরকারি কোন পরিত্যক্ত জমিতে টাংকি বসানো যায় কিনা তা ভেবে দেখতে কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ করেন তিনি। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী মানবতার মা শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষন করেন মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার।
কক্সবাজার পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীনের পরই পাহাড়ের এ টিলাই একটি পানির টাংকি স্থাপন করা হয়েছিল। যদিও কয়েকযুগ ধরে তা পরিত্যাক্ত। এখন পৌরবাসীর পানিসংকট নিরসনে সেই পুরোনো টাংকির স্থলে নতুন ট্যাংক স্থাপনের উদ্যোগ চলছে। যেহেতু সরকারি খাস জমি, তাই টাংকির প্রয়োজনে আশপাশের বসতিগুলো সরিয়ে নেয়া দরকার।
কক্সবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ঋত্বিক চৌধুরী বলেন, শহরে বর্তমানে তীব্র বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির অপর্যাপ্ততার কারণে পরিশোধিত পানির সংস্থান জরুরি। শহরের কয়েকটি জায়গায় পানির টাংকি স্থাপন করা হবে। পুরোনো টাংকি এলাকাটি উচু হওয়ায় কোন বৈদ্যুতিক শক্তি ছাড়াই পানি সরবরাহ করা সম্ভব। নতুন টাংকি বসাতে গেলে কাজের প্রয়োজনে আশপাশের অসংখ্য বাড়ি-ঘর উঠে যেতে হবে। খাস জমিগুলো বরাদ্দ পেতে জেলা প্রশাসনে আবেদন করা হয়েছে। বুঝাপড়ায় জমি পাওয়া না গেলে বিকল্প পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, ঘোনারপাড়া-মোহাজেরপাড়ার লোকজনের দেয়া একটি আবেদন পেয়েছি। উচ্চ আদালতের ১৯৯৯ সনের পিটিশনের বিষয়টি জানা ছিলনা। বিষয়টি খতিয়ে দেখে আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের প্রতি নজর দেয়া হবে।
বাংলাধারা/এফএস/এএ












