২৯ মার্চ ২০২৬

বোনের বাড়া ভাত খাওয়া হলো না শিক্ষক পারভেজের

শাহ আব্দুল্লাহ আল রাহাত »

চারদিকে মৃত্যুর সাইরেন বেজেই চলছে, লড়ছে করোনা যোদ্ধারা। তবে এই ভয়াল পরিস্থিতিতে কর্মস্থলে পৌঁছানোর জন্যই ভোরের সূর্যের আলো কিংবা ঝড় বৃষ্টির সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলতে হয় পেশাজীবীদের।

তাই তো গত ১৬ জুন মঙ্গলবার সকালে নিজ কর্মস্থল মিরসরাই উপজেলার বারইয়ারহাট পৌর এলাকার সালমা চৌধুরী স্কুলে যোগ দিয়েছিলেন জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের দক্ষিণ তাজপুরের বাসিন্দা মোঃ পারভেজ। গত ১ বছর যাবত তিনি আই সি টি শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন বিদ্যালয়টিতে।শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও পি এস সি, জে এস সি বিষয়ক রেজিষ্ট্রেশন এবং বিদ্যালয়ের আই সি টি বিষয়ের উপর শিক্ষক হিসেবে পারভেজের নজরদারি থাকার কারণে যেতে হয়েছিলো কর্মস্থলে। যাবতীয় সব কাজকর্ম সেরে ফিরে আসছিলেন নিজ গৃহে। বারইয়ারহাট থেকে সিএনজি যোগে এসেছিলেন জোরারগঞ্জ। তারপর আরেকটি সিএনজি ধরে যাত্রা শুরু করেছেন নিজ বাড়ি দক্ষিন তাজপুরের শামসুদ্দিন মেস্ত্রী বাড়ির উদ্দেশ্যে।

সিএন জিতে থাকা অবস্থায় ছোট বোন শাহেদা আক্তার সাথী কে ফোন করেছিলেন ভাত বেড়ে রাখতে কারণ সারাদিন কর্মব্যস্তায় প্রচুর ক্ষিদে জেগেছিলো পারভেজের। ওদিকে ছোট বোন সাথী ও অপেক্ষায় ভাইদের পথচেয়ে।

জোরারগঞ্জ-মুহুরীপ্রজেক্ট সড়কের সবুজ গাছগাছালির স্নিদ্ধ বাতাসে মন ছুঁয়ে গিয়েছিলো পারভেজের। তখনও সে জানতো না আর ২ মিনিট পরেই অপেক্ষা করছে মালাকুল মউত। কিছুক্ষণ পরই বিদায়ের পথে ধরতে হবে চিরতরে, এই ভুবনে মরীচিকার স্তুপ ছেড়ে।

ঠিক বিকেল সাড়ে তিনটায় সড়কটির ইছামতী ব্রিজের পূর্বপাশে উল্টো দিক থেকে আসা একটি পিক আপের সাথে সংর্ঘষে গুরুতর আহত হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে যান পারভেজ। কিছুক্ষণ আগে প্রকৃতির স্নিগ্ধ বাতাসে হারিয়ে যাওয়া টগবগ যুবক পারভেজ এখন মৃত্যুপথযাত্রী। ততক্ষণে খবর পৌঁছে গিয়েছে বাড়িতে। ভাত নিয়ে অপেক্ষায় থাকা ছোট বোন সাথী চিৎকার দিয়ে ভারি করেছে চারপাশের আকাশ বাতাস।

এরপর আরো ৬ ঘন্টা বেঁচে ছিলেন তিনি। উপজেলার ২ হাসপাতাল ঘুরে শেষমেশ এ্যাম্বুলেন্স যোগে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো চমেকে। তবে করোনা মহামারির বির্পযস্ত এই সময়ে অক্সিজেন সিলিন্ডারও জোগাড় করতে বেগ পেতে হয়েছিলো। সবশেষ অ্যাম্বুলেন্সে থাকা অক্সিজেন দিয়ে মেডিকেলের আই সি ইউ তে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিলো মৃত্যুর যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা পারভেজকে। তবে এর প্রায় ১৭ মিনিট পর সব চেষ্টার অবসান ঘটিয়ে ৬ ঘন্টার পাঞ্জা লড়াইয়ে মৃত্যুর কাছে হার মেনে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে বিদায় হয়ে যান শিক্ষক পারভেজ।

ঘড়িতে তখন রাত ৯ টা বেজে অনেকদূর এগিয়েছে আর পারভেজের পিতা শামসুদ্দিনের জন্য নির্ধারিত হয়ে গেছে পৃথিবীর সবচেয়ে ভারি বোঝা পিতার কাঁধে পুত্রের লাশ। পারভেজে মা পেয়ারা বেগমের চিৎকারে ছুটে এসেছে সবাই, সকলে জেনে গেছে শিক্ষক পারভেজ আর নেই। চিরতরে ছিন্ন হয়ে গিয়েছে ভাই বোনের স্নেহ। ভাত নিয়ে অপেক্ষায় থাকা বোনের বিলাপে সুর বেজেই চলছে। পরিবারের একমাত্র ছোট ভাইটিও কাঁদছে হাউমাউ করে। মসজিদের মাইকে অ্যার্লাম বাজতে শুরু করছে, করোনার ভয় উপেক্ষা করে আসতে শুরু করেছে নিকটবর্তী আত্মীয় স্বজনরা। ইতিমধ্যে গোরস্থানে পারভেজের জন্য সাড়ে তিন হাত মাটির ঘর খুঁড়তে ছুটে গিয়েছে একদল শবযাত্রী।

সবার কাছে পরিচিত নিয়মিত মুসল্লি পারভেজ আজ সবার কাছে লাশ নামেই বেশ পরিচিতি। মধ্যে রাতে সাইরেন বাজিয়ে আর্তনাদ করতে করতে বাড়ি এসেছে পারভেজের কফিন। সাদা কাপড়ে চোখ বন্ধ হয়ে কেবলামুখী হয়ে আছেন তিনি। জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের দক্ষিণ তাজপুরে এলাকার বাসিন্দা ছিলেন এই শিক্ষক। দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।

প্রবাসে ও কাটিয়েছেন বেশ কিছু সময়। স্বপ্ন ছিলো একজন এমপিও ভুক্ত শিক্ষক হবেন, শিক্ষা দিবেন। ছিলো সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন। যৌবনের সব লালিত স্বপ্নকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে চলে গেলেন অসীম জীবনের খোঁজে এবং আমাদের শিক্ষা দিয়ে দিলেন যৌবন কিংবা বয়সের তাড়ানায় নয়, বরং মৃত্যু আসবে যে কোনো সময়। আর এই পৃথিবীর সময় কেবলই মরীচিকা সাজে, আমাদের ফিরে যেতে হবে মহান আল্লাহর কাছে।

বাংলাধারা/এফএস/টিএম

আরও পড়ুন