২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

মাথার খুলি খুলে রক্ত বের করা সেই পাবেল এখনও অচেতন

বাঁচাতে শেষ চিৎকার—‘মানুষ মানুষের জন্যে’

জীবন-মরণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে কর্ণফুলীর হাস্যময় যুবক শাহিদুল ইসলাম পাবেল (৩২)। বাড়ির সিঁড়ি থেকে নিচে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত, মস্তিষ্কের ভেতরে রক্তক্ষরণ, তারপর সংক্রমণ একটি অবুঝ শিশুর বাবাকে বাঁচাতে এখন যুদ্ধ করছেন চিকিৎসকরা। কিন্তু এই যুদ্ধের ময়দানে সবচেয়ে বড় বাধা এখন আর্থিক সংকট।

নিম্নবিত্ত পরিবারটির পক্ষে প্রতিদিন লাখ টাকার কাছাকাছি খরচ বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। শেষ ভরসা হিসেবে তাঁরা এখন মানবিক সবার সাহায্যের দিকে তাকিয়ে।

চট্টগ্রাম নগরীর ব্যস্ত প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল-এর আইসিইউর ৩-এম আইসিইউ-০৬ নম্বর কেবিনে ভেন্টিলেটরের নল গলায় গুঁজে পড়ে আছেন পাবেল। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে কর্ণফুলী উপজেলার নিজ বাড়ির সিঁড়ি থেকে পড়ে যাওয়ার পর থেকে আর স্বাভাবিক জীবনে ফেরা হয়নি তাঁর।

প্রথমে মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তির পর জটিলতা বাড়লে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে অ্যাপোলো ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মস্তিষ্কের প্রচণ্ড চাপ কমাতে নিউরোসার্জন কর্নেল মো. আব্দুল হাই মানিকের নেতৃত্বে জরুরি অস্ত্রোপচার করে পাবেলের মাথার খুলির একটি অংশ খুলে ফেলা হয়েছে এবং ভেতরে জমে থাকা রক্ত বের করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এরপরও বিপদ কাটেনি।

মস্তিষ্কের পর্দায় ছড়িয়ে পড়েছে মারাত্মক সংক্রমণ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যা ‘মেনিনজাইটিস’। আর এই সংক্রমণের জন্য দায়ী শক্তিশালী ও প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া, যা সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকেই মানতে নারাজ।

চোখের মণি সাড়া দিচ্ছে না

ভর্তির সময় পাবেলের শারীরিক অবস্থা ছিল শোচনীয়। জ্বর ছিল ১০৩.৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট, রক্তচাপ ছিল বিপজ্জনক পর্যায়ে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ছিল ‘গ্লাসগো কোমা স্কেল’ বা জিসিএস স্কোর, যা রোগীর চেতনার মাত্রা নির্ধারণ করে। পাবেলের স্কোর এত কম ছিল যে তিনি ছিলেন গভীর অচেতন।

চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর বাম চোখের মণি ছিল অস্বাভাবিক রকম ছোট এবং আলোতে প্রায় সাড়া দিত না। আর ডান চোখের মণি ছিল সম্পূর্ণ অচল। এটি মস্তিষ্কের গুরুতর আঘাতের ভয়াবহ লক্ষণ।

সামান্য উন্নতি, কিন্তু শঙ্কা কাটেনি

টানা চিকিৎসায় এখন জ্বর নিয়ন্ত্রণে এলেও চেতনা ফিরতে সময় লাগছে। জিসিএস স্কোর সামান্য বেড়েছে, রোগী নিজে থেকে শ্বাস নিতে পারছেন, কিন্তু সম্পূর্ণ সচেতন না হওয়ায় এন্ডোট্র্যাকিয়াল টিউব (শ্বাসনালির নল) খুলে ফেলা সম্ভব হচ্ছে না। তাই চিকিৎসকেরা শ্বাসনালিতে স্থায়ী পথ তৈরি (ট্রাকিওস্টমি) করার পরিকল্পনা করছেন।

হাসপাতালের সাম্প্রতিক কয়েকটি রিপোর্ট বলছে, পাবেল এখন ‘ক্রিটিক্যাল বাট স্টেবল’ অবস্থায় আছেন। রক্তচাপ ১২০/৭০, পালস ৭৩, অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৬ লিটার অক্সিজেনে স্বাভাবিক রয়েছে। তবে ল্যাব রিপোর্টে ধরা পড়েছে ভেন্টিলেটর-জনিত নিউমোনিয়া ও মাইক্রোসাইটিক অ্যানিমিয়া (রক্তস্বল্পতা)। চিকিৎসকদের মতে, পরবর্তী ৭ থেকে ১৪ দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এলে তবেই পূর্ণ সচেতনতা ফেরার আশা করা যাবে।

প্রতিদিন লাখ টাকার খরচ, পরিবার নিঃস্ব

এখন পাবেলকে বাঁচাতে প্রতিদিন প্রয়োজন হচ্ছে আইসিইউ সাপোর্ট, ভেন্টিলেটর, শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক (যার প্রতিটি ইনজেকশনের মূল্য হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়), বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ও একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা।

সূত্রে জানা গেছে, শুধু আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর খরচই প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক (যেমন কোলিস্টিন, মেরোপেনেম) ও অন্যান্য ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কনসালটেশন ও নার্সিং খরচ মিলিয়ে দৈনিক ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় এক লাখ টাকার বেশি।

ছোটখাটো ব্যবসা করে সংসার চালানো পাবেলের পরিবারের পক্ষে এই বিপুল অর্থ জোগান দেওয়া একপ্রকার অসম্ভব। বড় ভাই হারুনের কণ্ঠে হাহাকার,
“ভাইকে বাঁচাতে যা করার করছি। কিন্তু সামর্থ্য ফুরিয়ে এসেছে। ওর একটা ছোট শিশু আছে, স্ত্রী আছে। ওকে বাঁচানো আমাদের একার পক্ষে সম্ভব না। সবার সাহায্য চাই।”

ভূপেন হাজারিকার গানের সুরে কর্ণফুলীবাসীরও আহ্বান

পাবেলের চিৎকার যেন শোনা যাচ্ছে ভূপেন হাজারিকার বিখ্যাত গানের কলিতে “মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে। একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?”

কর্ণফুলীর হাজার হাজার মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাবেলের সুস্থতা কামনায় আকুতি জানাচ্ছেন। কেউ কেউ এগিয়েও এসেছেন। কিন্তু চিকিৎসার শেষ দেখা নেই। এখনও লাখ লাখ টাকা প্রয়োজন। পাবেলের চিকিৎসা শেষ করে তাঁকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দিতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন পরিবার ও স্বজনরা।

আপনারা যারা সক্ষম, এগিয়ে আসুন। একটি শিশুর বাবাকে বাঁচান। একটি পরিবারের স্বপ্ন ফিরিয়ে দিন।

সাহায্য পাঠানোর ঠিকানা: পাবেলের বড় ভাই ফরিদের মুঠোফোন: ০১৬১৩-৫৩৮০০২, ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বর (পারসোনাল): ০১৯৫৬-৭৫৬৩২৩

আরও পড়ুন