২১ মার্চ ২০২৬

মায়ের সঙ্গে আর কোনো দিন স্কুলে যাবে না আসিফুর

বাংলাধারা প্রতিবেদন »

৫ বছর বয়সী ছোট্ট শিশু আতিফুর মায়ের সাথে সকালে গিয়েছিল স্কুলে। হয়ত আজ স্কুলে নতুন কি শিখবে তা নিয়ে ভাবছিল আসিফুর। হতে পারে আসিফুরের মা ভাবছিলেন ছেলেরা স্কুল থেকে ফিরলে আজ প্রিয় খাবারটি রান্না করে খাওয়াবেন। কিন্তু চট্টগ্রামের গ্যাসলাইন বিস্ফোরণে রাস্তায়ই নিহত হন আসিফুরের মা ও ভাই। কপালগুণে বেঁচে যায় আতিফুর। 

পরিবারে দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে আতিকুল হক সুমন। প্রতিদিনের মতো ছেলেকে স্কুলে যাওয়ার আগে প্রাইভেট শিক্ষকের বাসায় নিয়ে যাচ্ছিলেন আতিকুলের মা জুলেখা খানম ফারজানা। বাসা থেকে বের হয়ে পাথরঘাটা বড়ুয়া বিল্ডিং এর পাশে আসতেই কিছু বুঝার আগেই ধসে পরে দেয়াল। আর নিমিষেই শেষ হয়ে যায় মা ছেলের প্রাণ। পরে থাকে নিথর দুটি দেহ।

খবর পেয়ে ছোট ছেলে ব্রাদার ফ্লাভিয়ান স্কুলের নার্সারির ছাত্র আসিফুর রহমান শুভ্রকে (৫) নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে আসেন আইনজীবী আতাউর রহমান। আসিফের গায়ে তখনও স্কুলের পোশাক।

স্ত্রী আর এক সন্তানকে হারিয়ে পাগলপ্রায় আতাউরের বিলাপে ভারি হয়ে ওঠে হাসপাতালের পরিবেশ। ছোট্ট আসিফও যেন বিহ্বল।

নিহত আতিকুরের গৃহ শিক্ষিকা এলিনা বিশ্বাস হাসপাতালে বলেন, “আগামীকাল থেকে আতিকুরের বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। তাই সকালে তাকে পাথরঘাটায় এক শিক্ষকের বাসায় প্রাইভেট পড়াতে নিয়ে যাচ্ছিলেন তার মা।

“এর আগে সকালে ছোট ছেলেকে তিনি নিজে স্কুলে দিয়ে আসেন। এরপর বাসায় ফিরে বড় ছেলেকে নিয়ে বের হন। বড়ুয়া বিল্ডিংয়ের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মা-ছেলে দেয়াল চাপা পড়েন।”

চট্টগ্রাম মেডিকেলে ফারজানার স্বামী এডভোকেট আতাউর রহমান তাদের ছোট ছেলেকে নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেলে

লাশ ঘরের পাশে কাঁদতে কাঁদতে বার বার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিলেন।

আতাউর রহমানের বন্ধু লোকমান হোসেন বলেন, স্বামী আতাউর রহমান ও দুই সন্তানকে নিয়ে পাথরঘাটা এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন ফারজানা। নিহত ছেলে আতিকুল  হক সুমন সেন্ট প্লাসিডস স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়তো। ছোট ছেলে আতিফুর রহমান (৫) পড়ে নার্সারিতে। ফারজানার স্বামী আতাউর রহমান চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবী।

তিনি আরো বলেন, ফারজানা ম্যাডাম প্রতিদিন দুই ছেলেকে স্কুলে আনা-নেওয়া করেন। বাসার পাশেই বড় ছেলে আতিকুলকে একজন প্রাইভেট শিক্ষকের বাসায় পড়াতে নিয়ে যেতেন। প্রতিদিনের মতো রোববার সকালে আতিফুরকে স্কুলে দিয়ে এসে বড় ছেলে আতিকুল হককে প্রাইভেট শিক্ষকের বাসায় নিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রাইভেট শিক্ষকের বাসা কাছে হওয়াতে হেঁটে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে দুর্ঘটনায় মারা যান মা-ছেলে।

রোববার (১৭ নভেম্বর) সকাল ৯টায় চট্টগ্রামের পাথরঘাটায় দুর্ঘটনায় সাত জন নিহত ও অন্তত ২৫ জন আহত হয়। তাদের মধ্যে ১৯জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে বলা হয়, নিহতরা হলেন- ১) পটিয়ার মেহেরআটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা অ্যানি বড়ুয়া (৪০), ২) পাথরঘাটার জুলেখা খানম ফরজানা (৩০) ও ৩) তার ছেলে আতিকুর রহমান (৮), ৪) কক্সবাজারের উখিয়ার নুরুল ইসলাম (৩১), ৫) রাঙ্গুনিয়ার কাজল নাথের মেয়ে কৃষ্ণকুমারী স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অর্পিতা নাথ (১৬),৬) নতুন ব্রিজ এলাকার শ্রমিক নুরুল ইসলাম (৩০) এবং প্রশান্ত ।

জানা যায়, সন্ধ্যা রাণী বড়ুয়া সকালে গ্যাসের চুলায় আগুন দিলে বিকট শব্দে গ্যাস লাইনে বিস্ফোরণ হয় এবং দেয়াল ধ্বসে হতাহতের ঘটনা ঘটে।

এদিকে গ্যাস পাইপলাইন বিস্ফোরণে গুরুতর আহত একজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আজ রোববার বেলা ২টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে স্বজনরা তাঁকে অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন ।

আহত ওই নারীর নাম অর্পিতা রানী দেবী (১৬)। তিনি পাঁচতলা ধনা বড়ুয়া ভবনের নিচতলার বাসিন্দা ছিলেন। ওই ভবনের নিচতলায় গ্যাসের পাইপলাইন বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণে অর্পিতা রানী দেবীর শরীরের ৪৫ শতাংশ পুড়ে গেছে।

বাংলাধারা/এফএস/টিএম

আরও পড়ুন