১৩ মার্চ ২০২৬

যৌতুক না পেয়ে গৃহবধূকে নির্যাতন, বিষ খাইয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ

কক্সবাজার প্রতিনিধি »

কক্সবাজার সদর উপজেলার পোকখালির ইউনিয়নে কাঙ্খিত যৌতুক না পেয়ে কুলসুমা বেগম (২৫) নামের এক গৃহবধূকে আগুনের ছ্যাকায় নির্যাতনের পর বিষ খাইয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এ দু’দফা কল এবং কক্সবাজার সদর থানায় দু’দফা দেখা করেও আইনি সহায়তা পায়নি বলে অভিযোগ করেছেন ভিকটিমের স্বজনরা।

ভিকটিমের পরিবার সদর হাসপাতাল ও পোকখালি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সূত্র জানায়, পোকখালির নাইট্যংদিয়ার মৃত ঠান্ডা মিয়ার ছেলে মো. মফিজের স্ত্রী কুলসুমা। তাদের সংসারে তাওসীফ নামের তিন বছরের এক সন্তান রয়েছে। অভাবের সংসার হওয়ায় প্রায়ই তাদের ঝগড়া বিবাদ হয়। ১১ এপ্রিল শরীরের পোড়া দাগ ও বিষ খাওয়া অবস্থায় কুলসুমাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আনা হয়।

এবিষয়ে ভিকটিমের মা রাশেদা বেগম বলেন, বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের জন্য আমার মেয়েকে মারধর করে মফিজ ও তার পরিবারের লোকজন। এনিয়ে অনেকবার সালিশ বৈঠক হয়। সর্বশেষ মাসখানেক আগে মফিজকে আমরা কিছুৃ টাকা দিয়েছি। তারপরও ৯ এপ্রিল আমার মেয়েকে যৌতুকের জন্য মারধর করে মফিজ। খবর পেয়ে ১০ এপ্রিল আমি মেয়েকে আনতে যায়। কিন্তু আমার মেয়েকে আনতে দেয়নি মেয়ের শশুর বাড়ির লোকজন।

‘পরে ১১ এপ্রিল দুপুর সাড়ে ১২ টার মফিজ আমাকে কল করে বলে কুলসুমা বিষ খেয়েছে তাকে হাসপাতাল নেয়া হচ্ছে। একথা শুনে আমরা তাৎক্ষনিক সদর হাসপাতালে ছুটে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি আমার মেয়ে মেঝেতে পড়ে রয়েছে কিন্তু তার শ^শুরবাড়ির লোকজন আশেপাশে নেই। তখন আমরাই মেয়েকে সদর হাসপাতাল ভর্তি করি। ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত আমার মেয়ে সেখানে চিকিৎসাধীন ছিল। কিন্তু এই সময়ে মেয়ের স্বামী ও ভাইয়েরা একবারের জন্যও খবর নেয়নি।’

তিনি আরো বলেন, ১৭ এপ্রিল হাসপাতাল থেকে আমার মেয়েকে জোর করে নিয়ে যেতে চায় মফিজের বোন নাহারু ও ভাইঝি তসলিমা। তবে আমার মেয়ে যেতে রাজি হননি।

ভিকটিম কুলসুমা বলেন, আমার স্বামী যৌতুকের জন্য পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কথা ধরে আমাকে প্রায়ই মারধর করে। ৯ এপ্রিল আমাকে মারধর করে ফেলে রাখে। ১০ এপ্রিল আমার মা আমাকে ডাক্তারের কাছে নিতে চাইলেও নিতে দেয়নি। আমার মা কেন আমাকে দেখতে এসেছে এবং আমাকে কেন ডাক্তার দেখাতে চাইছে এসব কথা বলে ১১ এপ্রিল আবারো আমাকে মারধর করে মফিজ। একসময় আমার শরীরে গরম লোহার ছ্যাকাও দেয় সে। এসময় চিৎকার করলে মফিজের বোন নাহারু, ভাইঝি তাসলিমা ও মফিজের তিনভাই জগির, মুস্তাফিজ, মোস্তাক আমাকে শক্ত করে ধরে রাখে এবং মফিজ আমার মুখে বিষ খাইয়ে দেয়। তারা এখন আমার শিশু সন্তানকে জিম্মি করে রেখেছে। আর আমাকে বলেছে আমি যদি পুলিশের কাছে যাই তবে তারা আমার সন্তানকে মেরে ফেলবে।

এদিকে ভিকটিমের মামা এহেছান বলেন, ১১ এপ্রিল আমার ভাগনি বিষ খেয়েছে খবর শুনে আমি হাসপাতাল গিয়ে জানতে পারি সে বিষ খাইনি তাকে জোর করে শ্বশুর বাড়ির লোকজন বিষ খাইয়েছে। পরে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা ব্যবস্থা করি। এরপর ৯৯৯ এ আইনি সহয়ায়তার জন্য কল করি। সেখান থেকে আমাকে কক্সবাজার সদর থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়। তাদের পরামর্শ মত আমি সদর থানার ওসির সাথে দেখা করি । কিন্তু ওসি কোন সহযোগিতা করেনি। এরপর ১৭ এপ্রিল সকাল ১১ টার দিকে হাসপাতালে যায় আমার ভাগ্নির ননদ ও তার স্বামী ভাইঝি। তারা জোর করে ওকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে যেতে চাই।

‘আমি বাধা দিলে তাদের সাথে দুচারজন আমাকে হেনস্তা করে ও মারধর করে। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে আমি আমার ভাগ্নির নিরাপত্তার জন্য তাকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসি। পরে আমি আবার ৯৯৯ এ কল করি। সেখান থেকে আবারো থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়। আবার আমি থানায় যাই। সেবারও কোন সাহায্য করেনি পুলিশ। দুদফা থানা পুলিশ ও ৯৯৯ এ কথা বলার পর পুলিশের কেউ ভিকটিমকে হাসপাতালে দেখতে পর্যন্ত যায়নি।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে মফিজের মুঠোফোন কল করা হয়। কিন্তু তা বন্ধ থাকায় ভিকটিমের শ্বশুর বাড়ির লোকজনের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

তবে পোকখালি ইফপি’র নাইক্যংদিয়া এলাকার সদস্য মো. আলম বলেন, মফিজ ও কুলসুমার তিনবছরের ছেলে রয়েছে। ছেলের জ্বর হওয়ায় কুলসুমা তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে বলেন। কিন্তু লকডাউন হওয়ায় মফিজ ডাক্তারের কাছে না নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসার ওষুধ খাওয়াতে চান। এনিয়ে দুজনের ঝগড়া হয়। তখন স্বামী স্ত্রীকে মারধর করে। মারধর সইতে না পেরে অপমানে কুলসুমা বিষ খায়। খবর পেয়ে আমি সিএনজির ব্যবস্থা করি। মফিজের বোন ও ভাইঝিকে সাথে করে হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে চিকিৎসার যাবতীয় খরচ দিয়েছি আমি। ১৭ এপ্রিল ডাক্তার তাকে ছাড়পত্র দেয়। সেসময় কুলসুমাকে শ্বশুর বাড়ির লোকজন নিয়ে আসতে চাইলেও কুলসুমার মামা তাকে আনতে দেননি।

কুলসুমার শরীরের পোড়া দাগের বিষয়ে জানাতে চাইলে ইউপি সদস্য আলম বলেন, শরীরে পোড়া দাগ কোথায় থেকে এসেছে আমি জানি না। সালিশি বৈঠকে বসলেই বিষয়টি জানতে পারব।

এবিষয়ে জানার জন্য কয়েকদফা কক্সবাজার সদর থানার ওসি শাহজাহান কবিরের মুঠোফোনে কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

তবে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. ইকবাল হোসাইন বলেন, আমার সাথে ভিকটিমের মামার কথা হয়েছে। আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।

বাংলাধারা/এফএস/টিএম/এএ

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ