১৮ মার্চ ২০২৬

রেল উন্নয়নে মাইলফলক

মাকসুদ আহম্মদ, বিশেষ প্রতিবেদক»

রেলওয়েতে আওয়ামীলীগ সরকারের স্বরণকালের উন্নয়ন মহাযজ্ঞ চলমান। দুবারের নির্বাচনী ইশতেহারে যা প্রত্যাশা দিয়েছিল আওয়ামীলীগ তা পূরণ করে মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা স্বপ্নও বাস্তবায়ন করা শুরু করেছে। বিদেশী ঋণ ছাড়াই পদ্মা সেতু ও পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ দেয়ার মত অবিস্মরণীয় বড় বড় মেগাপ্রকল্প চলমান রেখেই এ সরকার ২০ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে এমনটিই বললেন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন।

সারা দেশে ট্রেন যোগাযোগে আড়াইলাখ কোটি টাকার কর্মযজ্ঞ চলছে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামীলীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশে। যুগান্তকারী এই পদক্ষেপ কার্যকর হলেই কয়েকটি স্থান ছাড়া প্রায় সারা দেশেই ট্রেনে যাতায়ত সম্ভব হবে। চারটি স্তরে প্রতিটি পাঁচ বছর মেয়াদী এই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা হবে ২০৩০ সাল পর্যন্ত । মোট ২৩৫টি প্রকল্পের মাধ্যমে এই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে চলছে রেল মন্ত্রণালয়। এতে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। উল্ল্যেখ,রেলের উন্নয়নে ২০ বছর মেয়াদী এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে ২০১০ সাল থেকেই।

রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেন, আড়াই লাখ কোটি টাকার ২০ বছর মেয়াদী প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব পাচ্ছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমূদ্র সৈকত। সৈকত সিটি কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে প্রধান মন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের কর্মযজ্ঞ চলছে। এছাড়া সারা দেশে ডুয়েল গেজ রেলপথ স্থাপনের মাধ্যমে পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে পশ্চিমাঞ্চলের সরাসরি ট্রেন যোগাযোগ, বঙ্গবন্ধু সেতুতে রেল লাইন স্থাপন, যমুনা নদীর উপর বাহাদুরাবাদ-ফুলছড়ি এলাকায় আরেকটি রেল সেতু নির্মাণ পরিকল্পনা রয়েছে এই ২০ বছর মেয়াদী এই মাস্টার প্ল্যানে।

রেল মন্ত্রনালয় সূত্রে জানা গেছে, রেলের ২০ বছরের মহা পরিকল্পনায় ২০২২ সালে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার ট্রেন যাওয়ার কথা থাকলেও তা করোনাকালিন মহামারীর কারণে পিছিয়ে যাচ্ছে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। বাস্তবায়নের পর বিস্তৃতি পাবে পর্যটন শিল্প। আড়াই লাখ কোটি টাকার প্রকল্পের মধ্যে গত ১০ বছরে অর্ধেকেরও বেশী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত। ব্রডগেজের জন্য ভারতীয় ১০ ইঞ্জিন যেমন এসেছে তেমনি কোরিয়ান ১০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন গত বছরের আগস্টে চট্টগ্রামের ডিজেল সপে পৌছেছে।২০২১ সালের জুনে আরো ১০টি এসি লোকোমটিভস যুক্ত হয়েছে রেলের পূর্বাঞ্চলে। এর আগে ২০১৮ সালে ৫০টি ব্রডগেজ ও ১০০টি মিটারগেজ কোচ ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানী করা হয়েছে। সর্বশেষ ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়া থেকে ক্রমান্বয়ে ২০০টি যাত্রীবাহী কোচ ক্রয় করে পাহাড়তলীস্থ ক্যারেজ ও ওয়াগন মেরামত কারখানার মাধ্যমে নতুন নতুন ট্রেনে যুক্ত হচ্ছে লোড ও স্পীড ট্রায়ালের পর। এগুলোর কমিশনিং ও লোডিং ট্রায়াল শেষ করে যাত্রীবাহি ট্রেনের সঙ্গে সংযুক্ত করে লাল সবুজের জাতীয় পতাকার আদলে নিয়ে আসা হচ্ছে সব ট্রেন গুলোকে।

রেল ভবনস্থ ডিজির দফতর সূত্রে জানা গেছে, রেলের ২০১১ সাল থেকে ২০ বছরের মহা পরিকল্পনার তথ্য বিবরনী থেকে পাওয়া গেছে, ২০১১-২০১৮ সাল পর্যন্ত এক পরিসংখ্যানে মাত্র ৮ বছরে ৩৩০ দশমিক ১৫ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ করা হয়েছে। ১১৩৫ দশমিক ২৩ কিলোমিটার রেললাইনের পুননির্মাণ করা হয়েছে। ১৭৭টি রেল স্টেশনের রিমডেলিং করা হয়েছে। ৬৪৪টি রেল সেতু পুননির্মাণ করা হয়েছে। ভারত ও ইন্দোনেশিয়া ক্রয় করা হয়েছে মিটারগেজ এবং ব্রডগেজ ৩৫০ টি যাত্রীবাহী কোচ। ৫১৬টি মালবাহী ওয়াগন কেনা হয়েছে ভারত থেকে। ১১৭টি নতুন ট্রেন চালু করা হয়েছে যাত্রীদের জন্য। ট্রেন দুর্ঘটনা কবলিত স্থান থেকে যাত্রীবাহী কোচ ও ওয়াগন উদ্ধার করতে দুটি ‘এ’ ক্লাস রিলিফ ট্রেন ক্রয় করা হয়েছে। নতুন করে ৯১টি স্টেশন বিল্ডিং নির্মাণ করা হয়েছে। স্টীল স্ট্রাকচারের ২য় ভৈরব ও স্টীল স্ট্রাকচারের ২য় তিতাস সেতুসহ ২৯৫টি নতুন রেল সেতু নির্মাণ করা হয়েছে।

এদিকে, ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরে হাইস্পীড ট্রেন চলাচলের সম্ভাব্যতা যাচায়ের কাজ চলছে। বিশ্বের দীর্ঘতম সমূদ্র সৈকত কক্সবাজারকে শতভাগ পর্যটন কেন্দ্রে রুপান্তর করতে রেললাইন স্থাপন বা নির্মাণ কাজ চলছে। চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত যদিও রেল লাইন স্থাপন করা থাকলেও ওই রেলপথকে সংস্কারের মাধ্যমে চলনক্ষম করা হয়েছে। দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু-গুনদুম পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের কাজ চলছে। ২০২২ সাল নাগাদ এই লাইনে কক্সবাজার যেতে পারবে প্রতিদিন হাজারো পর্যটকসহ ওই এলাকার যাত্রীরা এমন টার্গেট থাকলেও তা পূরণ হতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
অপরদিকে, বঙ্গবন্ধু রেল সেতু প্রকল্পের কাজ হাতে নিয়েছে রেল মন্ত্রনালয়। খুলনা থেকে মোংলা পোর্ট পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ কাজ চলছে। এ পর্যন্ত কয়েকবার দোহাজারী-গুনদুম-কক্সবাজার রেল লাইনের কাজ পরিদর্শন করেছেন রেল মন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন। যমুনা নদীর উপর পৃথকভাবে বঙ্গবন্ধু রেল সেতু নির্মিত হবে। এই সেতুতে ডুয়েলগেজ ডাবল লেন রেললাইন স্থাপন করা হবে। ঢাকা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত ফোরলেন রেল লাইন স্থাপনের কাজ চলছে।

এছাড়াও সারা দেশে প্রায় ৭২৫ কিলোমিটার বিদ্যমান রেলপথের পুণর্বাসন করা হচ্ছে। ঢাকা শহরে সার্কুলার রেলপথ কাম-রোড সেতু নির্মাণ করা হবে। ঢাকা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত পাতাল রেলপথ নির্মাণ করার পরিকল্পনায় এগিয়ে চরছে সমীক্ষা। এছাড়াও আখাউড়া থেকে সিলেট সেকশানে পাতাল রেলপথ নির্মাণের প্রকল্প রয়েছে এই মেগা প্রকল্পে। এদিকে, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম রুটে ইলেকট্রিক ট্রাকশন ব্যবস্থাপনা প্রবর্তনের মাধ্যমে রেলে যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। সাতক্ষীরা থেকে মুন্সীগঞ্জ পর্যন্ত ব্রডগেজ লাইন নির্মাণ করার পরিকল্পনা রয়েছে আওয়ামীলীগ সরকারের।

স্বপ্নের পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ব্রডগেজ রেল লাইন নির্মাণ কাজ বাস্তবায়িত হচ্ছে। দেশের জনগনের টাকায় নির্মিত হচ্ছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু। যে সেতু নির্মাণে বিশ্ব ব্যাংকের কাছে হাত পাততে হয়নি লাল সবুজের পতাকার বাংলাদেশকে। কোন ঋণ নয় সম্পুর্ণ দেশের মানুষের টাকায় নির্মিত হচ্ছে পদ্মা সেতু।

২০০৯ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত আওয়ামীলীগ সরকারের উন্নয়ন কর্মযজ্ঞে বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে তারাকান্দি পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার রেল লাইন নির্মিত হয়েছে। ঈশ্বরদী থেকে পাবনা হয়ে ঢালারচর পর্যন্ত ৭৮ কিলোমিটার রেল লাইন নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। খুলনা থেকে মোংলা পোর্ট পর্যন্ত প্রায় ৬৪ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেল লাইন নির্মাণের কাজ চলছে।

এদিকে, কাশিয়ানী খেকে গোপালগঞ্জ হয়ে টুঙ্গীপাড়া পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ কাজ চলছে। বিএনিপি- জামায়াত সরকারের আমলে বন্ধ হওয়া কালুখালী থেকে ভাটিয়াপাড়া পর্যন্ত প্রায় ৭৫ কিলোমিটার রেল লাইন এলাকার জনগনের সুবিধার্থে পুনরায় চালু হয়েছে। শুধু তাই নয় দেশের জনগনের যাতায়ত সুবিধার্থে পাঁচুরিয়া থেকে ফরিদপুর পর্যন্ত ২৫ মিলোমিটার রেল লাইন পুনরায় চালু করা হয়েছে। পর্যটকদের সুবিধার্থে দেশের উত্তর ও দক্ষিনাঞ্চল থেকে সরাসরি বিশ্বের দর্ঘিতম সমূদ্র সৈকত কক্সবাজারে যেতে দোহাজারী থেকে ১০০ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ রেল লাইন নির্মাণ কাজ চলছে ধ্রুততার সাথে।

২০০৯ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত আওয়ামীলীগ সরকারের উন্নয়ন কর্মযজ্ঞে গত ১০ বছরে যুক্ত হয়েছে, ৪৬ টি রেল ইঞ্জিন বা লোকমোটিভ। চায়না থেকে ২০ সেট ডেমু ট্রেন এনে যুক্ত হলেও কয়েক সেট ট্রেন পরিচালনাগত দূর্বলতার কারনে লোকো কারখানায় পড়ে রয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, নাজিরহাট, দোহাজারী, কুমিল্লা ও ঢাকার মত গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে প্রতিদিন শিক্ষার্থী ও যাত্রী পরিবহনে চালু রয়েছে। দোহাজারী বিদ্যুতকেন্দ্রসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তেল পরিবহনে ১৬৫টি মিটারগেজ ট্যাংক ওয়াগন ক্রয় করা হয়েছে। এছাড়াও ৮১টি ব্রডগেজ ট্যাং ওয়াগন যুক্ত হয়েছে আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে।

দেশের বিভিন্নস্থানে পণ্য পরিবহনে ২২০টি মিটারগেজ ফ্ল্যাট সংযুক্ত হয়েছে এই সরকারের আমলে। কেনা হয়েছে ৩০টি ব্রেজভ্যান। দূর্ঘটনা কবলিত এলাকা থেকে কোচ বা ওয়াগন উদ্ধারে কেনা হয়েছে ‘এ’ ক্লাস একটি ব্রডগেজ ও একটি মিটারগেজ রিলিফ ট্রেন। অপরদিকে, কম্পিউটার বেইজড সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালু করতে এ সরকার আমলে ৬৬টি স্টেশন পরিচালনায় ও কন্ট্রোল সিস্টেম আধুনিকরণে কম্পিউটার বেইজড সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। আরো ৩৪টি স্টেশনে নতুন ভাবে এই সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালু করতে রেল মন্ত্রনালয়ের কর্মযজ্ঞ প্রক্রীয়াধীন রয়েছে।

বাংলাধারা/এফএস/এফএস

আরও পড়ুন