রোগীর বিল থেকে সাড়ে ৪ কোটি টাকা কোথায় গেল? হাসপাতালের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের মধ্যেই কীভাবে গড়ে উঠল জমি, ফ্ল্যাট, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও গাড়ির বিপুল সম্পদ? চট্টগ্রাম কসমোপলিটন হাসপাতালের এডমিন ডিরেক্টর জাহেদুল ইসলামকে ঘিরে উঠেছে এমনই প্রশ্ন।
হাসপাতালের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এ অর্থ আত্মসাতের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে বলে দাবি করা হলেও কত টাকা উদ্ধার হয়েছে, কতটা বাকি এবং অর্থের চূড়ান্ত হিসাব কী— তা নিয়ে রয়েছে অস্পষ্টতা।
অন্যদিকে, তাঁর নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক ফ্ল্যাট, জমি, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফার্মেসি ও গাড়ির মালিকানার দাবি সামনে আসায় সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারী। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও আর্থিক নথি যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
২০০৯ সালের জুনে চট্টগ্রাম কসমোপলিটন হাসপাতালে ম্যানেজার হিসেবে যোগ দেন জাহেদুল ইসলাম। এর আগে তিনি ন্যাশনাল হাসপাতালে রিসেপশনিস্ট হিসেবে কাজ করতেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৮ সালে হাসপাতালের পরিচালনা পরিষদ নির্বাচনে ভোটের অনিয়মের মাধ্যমে তাঁকে সুবিধা দেওয়া সদস্যদের নির্বাচিত করা হয়। এরপর এডমিন ম্যানেজার পদে উন্নীত হন তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১৮ সালে হাসপাতালের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে আর্থিক অনিয়মে সহযোগিতার অভিযোগ ওঠার পর হিসাব বিভাগের প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরে যান জাহেদুল ইসলাম। পরে যোগ দেন ওয়ান ব্যাংক লিমিটেডে। তবে অভিযোগকারীর দাবি, ব্যাংকে চাকরির পাশাপাশি হাসপাতালের প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করেন তিনি। ২০২০ সালে হাসপাতালের শেয়ার কেনার পর এডমিন ডিরেক্টর পদে দায়িত্ব পান। বর্তমানে তাঁর বেতন ৪০ হাজার টাকা বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
রোগীর বিলেই অনিয়মের অভিযোগ
হাসপাতালের রোগীদের বিল নিয়ে অভিযোগ আরও গুরুতর। অভিযোগকারীর দাবি, ২০১৮ সাল থেকে ভর্তি রোগীদের নির্ধারিত সার্ভিস চার্জের বাইরে বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অর্থ যুক্ত করা হতো। এতে বিলের প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন চিকিৎসকের রেফারেন্স ফি দেওয়ার নামে বিল বাড়ানো এবং নিজের ইচ্ছামতো রেট নির্ধারণ করে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে রোগীদের বিল, হাসপাতালের নির্ধারিত মূল্যতালিকা, আদায়ের রসিদ ও হিসাবের নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
২০১৯ সাল থেকে হাসপাতালের দুটি ফ্লোর ব্যবহার করে অনুমোদনহীন ডায়াগনস্টিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে জাহেদুল ইসলামের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীর দাবি, হাসপাতালের চেয়ারম্যান ও একজন চিকিৎসককে সহযোগী করে এবং রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে টেকনোলজিস্ট ও প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ছাড়াই পরিচালিত হয়েছে চট্টগ্রাম কসমোপলিটন ডায়াগনস্টিক সেন্টার।
এদিকে, হাসপাতালের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সহযোগিতায় শেয়ার মালিকদের জিম্মি করে বার্ষিক সাধারণ সভা না দেওয়া, কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি বন্ধ রাখা এবং সরকারি ছুটির প্রাপ্য অর্থ না দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
তদন্তে সাড়ে ৪ কোটি টাকার হিসাব
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ, হাসপাতালের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা আত্মসাতের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ল্যাপারোস্কপিক মেশিনের কিছু অর্থ আদায় করা হলেও বাকি অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়া চলমান।
তবে তদন্ত কমিটির মূল প্রতিবেদন, অর্থ আত্মসাতের হিসাব, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় এবং কত টাকা উদ্ধার হয়েছে— এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। ফলে অভিযোগের ভিত্তিতে পুরো অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে কিংবা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির দায় চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
সম্পদ ঘিরে যত প্রশ্ন
হাসপাতালের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি জাহেদুল ইসলামের সম্পদ অর্জন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারী। দাবি করা হয়েছে, নারায়ণগঞ্জে স্ত্রীর নামে দুটি ফ্ল্যাট, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে ফার্মহাউস এবং চট্টগ্রামের ভূমি অফিসের পাশে প্রায় ৪০ কোটি টাকা মূল্যের জমিতে মালিকানা রয়েছে তাঁর।
এ ছাড়া সদরঘাট নালাপাড়া এলাকায় প্রায় ৫০ কোটি টাকা মূল্যের জমিতে শেয়ার, প্রবর্তক মোড়ে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে জেনিথ ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং চট্টেশ্বরী মোড়ে প্রায় নয় কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি ফ্লোর কেনার তথ্যও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, চট্টেশ্বরী মোড়ে কসমোপলিটন ড্রাগ হাউস নামে প্রায় অর্ধকোটি টাকার ফার্মেসি পরিচালনা, প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের দুটি ব্যক্তিগত গাড়ি এবং বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে স্ত্রীর নামে শেয়ার কেনার তথ্যও রয়েছে।
তবে এসব সম্পদের মালিকানা, প্রকৃত মূল্য, ক্রয়ের সময় এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য নথি যাচাই ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। হাসপাতালের আয়-ব্যয়ের সঙ্গে এসব সম্পদের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা-ও তদন্তের বিষয়।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চট্টগ্রাম কসমোপলিটন হাসপাতালের এডমিন ডিরেক্টর জাহেদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
রোগীর বিল থেকে অর্থ আদায়, হাসপাতালের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, অনুমোদনহীন ডায়াগনস্টিক কার্যক্রম এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ— সব মিলিয়ে প্রশ্নের মুখে চট্টগ্রাম কসমোপলিটন হাসপাতালের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা।
অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে হাসপাতালের আর্থিক নথি, ব্যাংক লেনদেন, তদন্ত কমিটির মূল প্রতিবেদন, সম্পদের মালিকানা ও অর্থের উৎস যাচাই জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তই নিশ্চিত করতে পারে, অভিযোগের কোন অংশ সত্য এবং কোথায় প্রয়োজন জবাবদিহি।














