নাম ‘লং মার্চ’। কিন্তু মানুষ হাঁটছে কতটা, আর রাজনীতি হাঁটছে কোন দিকে— প্রশ্নটা সেখানে।
ইতিহাসে ‘লং মার্চ’ শুধু দীর্ঘ পথের নাম নয়। চীনের ১৯৩৪–৩৫ সালের লং মার্চ ছিল একটি রাজনৈতিক শক্তির টিকে থাকার কঠিন যাত্রা। বাংলাদেশে ১৯৭৬ সালে মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা লং মার্চ ছিল পানির ন্যায্য হিস্যা ও রাষ্ট্রীয় অধিকারের প্রশ্নে গণপ্রতিরোধ। অর্থাৎ লং মার্চের রাজনৈতিক শক্তি কিলোমিটারে নয়; জনসম্পৃক্ততা, ত্যাগ ও লক্ষ্যের গভীরতায়।
সেই ইতিহাসের পাশে আজকের বিরোধী জোটের কর্মসূচি রাখলে প্রশ্ন আসে— এটি কতটা লং মার্চ, আর কতটা চলমান রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন? কর্মসূচিটি মূলত গাড়িবহরনির্ভর— ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, পথে পথসভা, শেষে সমাবেশ। ফলে এখানে দীর্ঘ পদযাত্রার চেয়ে বেশি দৃশ্যমান সংগঠনের সক্ষমতা ও রাজনৈতিক উপস্থিতি।
একে শুধু ‘তামাশা’ বলে উড়িয়ে দিলে অবশ্য রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক বাদ পড়ে যাবে। ক্ষমতাসীন দল রাষ্ট্র পরিচালনার কারণেই প্রতিদিন দৃশ্যমান; বিরোধী দলের সেই সুবিধা নেই। তাকে রাজপথে নেমে দেখাতে হয়— তার সংগঠন আছে, কর্মী আছে এবং তাকে রাজনৈতিক হিসাব থেকে বাদ দেওয়া যাবে না।
মিছিল তাই শুধু বক্তব্য বহন করে না; মিছিল নিজেই একটি বক্তব্য। এই জায়গা থেকে বর্তমান লং মার্চকে বিরোধী রাজনীতির অস্তিত্ব রক্ষার কর্মসূচি হিসেবেও পড়া যায়। এখানে ‘অস্তিত্ব রক্ষা’ মানে দল বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া নয়; বরং রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে না পড়া। বিশেষ করে জোট যখন বলছে, এটি সরকার উৎখাতের আন্দোলন নয়, তখন এত বড় আয়োজনের আরেকটি উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়— নিজেদের রাজনৈতিক গুরুত্ব দৃশ্যমান রাখা।
তবে দৃশ্যমানতা আর গ্রহণযোগ্যতা এক জিনিস নয়। জ্বালানি, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, বিচার কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতার মতো প্রশ্ন জনজীবনের বাস্তব বিষয়। বিরোধী দল তুলেছে বলেই সেগুলো বাতিল করা যায় না। কিন্তু সমস্যার তালিকা দেওয়া আর বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প তৈরি করা এক কথা নয়। সরকারের ব্যর্থতা দেখানোর পাশাপাশি বিরোধী দলকে বলতে হবে— তার সমাধান কী এবং কেন সেই সমাধান বিশ্বাসযোগ্য।
সরকারের জন্যও একই কঠিন মানদণ্ড প্রযোজ্য। বিরোধীদের কর্মসূচিকে ‘শোডাউন’ বলে উড়িয়ে দিলে মানুষের সমস্যাগুলো মুছে যায় না। বিরোধী দলের দুর্বলতা কখনো সরকারের সাফল্যের প্রমাণ নয়। সরকারের সাফল্য যাচাই হবে মানুষের জীবন, নীতি ও তার ফলাফলে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট সম্ভবত এখানেই— ক্ষমতাসীনরা অনেক সময় ক্ষমতায় থাকাকেই সাফল্য মনে করে, আর বিরোধীরা বিরোধিতা করাকেই বিকল্প রাজনীতি হিসেবে হাজির করে। অথচ নাগরিকের প্রয়োজন জবাবদিহিমূলক সরকার এবং বিশ্বাসযোগ্য বিরোধী শক্তি।
তাই কত গাড়ি গেল, কত মানুষ এল কিংবা সমাবেশ কত বড় হলো— এসব রাজনৈতিক শক্তির দৃশ্যমান হিসাব। আসল প্রশ্ন আরও কঠিন— এই রাজনীতি নাগরিককে কী দিল?সরকারের সমালোচনা করলেই বিরোধী দলের সমর্থক হতে হয় না; বিরোধী দলকে প্রশ্ন করলেই সরকারের পক্ষ নিতে হয় না।
গণতন্ত্রে চিন্তার স্বাধীনতা ঠিক এখানেই— ক্ষমতা ও বিরোধিতা, দুটোকেই একই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করানো।
লেখক : অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
লং মার্চ : পথটা চট্টগ্রামের দিকে, নাকি রাজনৈতিক অস্তিত্বের দিকে?
নাম ‘লং মার্চ’। কিন্তু মানুষ হাঁটছে কতটা, আর রাজনীতি হাঁটছে কোন দিকে— প্রশ্নটা সেখানে।
ইতিহাসে ‘লং মার্চ’ শুধু দীর্ঘ পথের নাম নয়। চীনের ১৯৩৪–৩৫ সালের লং মার্চ ছিল একটি রাজনৈতিক শক্তির টিকে থাকার কঠিন যাত্রা। বাংলাদেশে ১৯৭৬ সালে মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা লং মার্চ ছিল পানির ন্যায্য হিস্যা ও রাষ্ট্রীয় অধিকারের প্রশ্নে গণপ্রতিরোধ। অর্থাৎ লং মার্চের রাজনৈতিক শক্তি কিলোমিটারে নয়; জনসম্পৃক্ততা, ত্যাগ ও লক্ষ্যের গভীরতায়।
সেই ইতিহাসের পাশে আজকের বিরোধী জোটের কর্মসূচি রাখলে প্রশ্ন আসে— এটি কতটা লং মার্চ, আর কতটা চলমান রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন? কর্মসূচিটি মূলত গাড়িবহরনির্ভর— ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, পথে পথসভা, শেষে সমাবেশ। ফলে এখানে দীর্ঘ পদযাত্রার চেয়ে বেশি দৃশ্যমান সংগঠনের সক্ষমতা ও রাজনৈতিক উপস্থিতি।
একে শুধু ‘তামাশা’ বলে উড়িয়ে দিলে অবশ্য রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক বাদ পড়ে যাবে। ক্ষমতাসীন দল রাষ্ট্র পরিচালনার কারণেই প্রতিদিন দৃশ্যমান; বিরোধী দলের সেই সুবিধা নেই। তাকে রাজপথে নেমে দেখাতে হয়— তার সংগঠন আছে, কর্মী আছে এবং তাকে রাজনৈতিক হিসাব থেকে বাদ দেওয়া যাবে না।
মিছিল তাই শুধু বক্তব্য বহন করে না; মিছিল নিজেই একটি বক্তব্য। এই জায়গা থেকে বর্তমান লং মার্চকে বিরোধী রাজনীতির অস্তিত্ব রক্ষার কর্মসূচি হিসেবেও পড়া যায়। এখানে ‘অস্তিত্ব রক্ষা’ মানে দল বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া নয়; বরং রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে না পড়া। বিশেষ করে জোট যখন বলছে, এটি সরকার উৎখাতের আন্দোলন নয়, তখন এত বড় আয়োজনের আরেকটি উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়— নিজেদের রাজনৈতিক গুরুত্ব দৃশ্যমান রাখা।
তবে দৃশ্যমানতা আর গ্রহণযোগ্যতা এক জিনিস নয়। জ্বালানি, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, বিচার কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতার মতো প্রশ্ন জনজীবনের বাস্তব বিষয়। বিরোধী দল তুলেছে বলেই সেগুলো বাতিল করা যায় না। কিন্তু সমস্যার তালিকা দেওয়া আর বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প তৈরি করা এক কথা নয়। সরকারের ব্যর্থতা দেখানোর পাশাপাশি বিরোধী দলকে বলতে হবে— তার সমাধান কী এবং কেন সেই সমাধান বিশ্বাসযোগ্য।
সরকারের জন্যও একই কঠিন মানদণ্ড প্রযোজ্য। বিরোধীদের কর্মসূচিকে ‘শোডাউন’ বলে উড়িয়ে দিলে মানুষের সমস্যাগুলো মুছে যায় না। বিরোধী দলের দুর্বলতা কখনো সরকারের সাফল্যের প্রমাণ নয়। সরকারের সাফল্য যাচাই হবে মানুষের জীবন, নীতি ও তার ফলাফলে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট সম্ভবত এখানেই— ক্ষমতাসীনরা অনেক সময় ক্ষমতায় থাকাকেই সাফল্য মনে করে, আর বিরোধীরা বিরোধিতা করাকেই বিকল্প রাজনীতি হিসেবে হাজির করে। অথচ নাগরিকের প্রয়োজন জবাবদিহিমূলক সরকার এবং বিশ্বাসযোগ্য বিরোধী শক্তি।
তাই কত গাড়ি গেল, কত মানুষ এল কিংবা সমাবেশ কত বড় হলো— এসব রাজনৈতিক শক্তির দৃশ্যমান হিসাব। আসল প্রশ্ন আরও কঠিন— এই রাজনীতি নাগরিককে কী দিল?সরকারের সমালোচনা করলেই বিরোধী দলের সমর্থক হতে হয় না; বিরোধী দলকে প্রশ্ন করলেই সরকারের পক্ষ নিতে হয় না।
গণতন্ত্রে চিন্তার স্বাধীনতা ঠিক এখানেই— ক্ষমতা ও বিরোধিতা, দুটোকেই একই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করানো।
লেখক : অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
আরও পড়ুন
চট্টগ্রামে প্রতিমা বিসর্জনে ভক্তদের ঢল
কক্সবাজারে সাগরে নেমে তিন পর্যটকের মৃত্যু, নিখোঁজ দুই
আজ বিকালের মধ্যে সাজেক ছাড়ার নির্দেশ, বন্ধ ঘোষণা
কক্সবাজারে প্রতিমা বিসর্জন যেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মহামিলন
এ সম্পর্কিত আরও
আইএমএফের ঋণ পেতে কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে: অর্থমন্ত্রী
প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন, সাম্পানে ঘুরতে নেওয়ার কথা বলে স্ত্রীকে খুন
ঢাকা-কক্সবাজার রুটে নতুন ট্রেন, যাত্রা শুরু ২৬ অক্টোবর
বাংলাদেশ থেকে সৌদিগামী ১০৩ ফ্লাইট ব্যাহত, ভোগান্তিতে ১৫৭৭৯ যাত্রী
সর্বশেষ
চট্টগ্রামে প্রতিমা বিসর্জনে ভক্তদের ঢল
কক্সবাজারে সাগরে নেমে তিন পর্যটকের মৃত্যু, নিখোঁজ দুই
আজ বিকালের মধ্যে সাজেক ছাড়ার নির্দেশ, বন্ধ ঘোষণা
কক্সবাজারে প্রতিমা বিসর্জন যেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মহামিলন
ময়মনসিংহে আসামি ছিনিয়ে নিতে পুলিশের ওপর হামলা, আহত ২