৩১ মার্চ ২০২৬

লামায় অবৈধ বালু উত্তোলন, নদীভাঙ্গনে বিলীন ফসলের মাঠ-বসতবাড়ি

লামা প্রতিনিধি »

বান্দরবানের লামা উপজেলার ৪টি ইউনিয়নে শতাধিক স্থান থেকে কোন প্রকার অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে কিছু প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।

উপজেলার ফাঁসিয়াখালী, সরই, আজিজনগর ও ফাইতং ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থান হতে শেলো মেশিন দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। প্রশাসনের কার্যকরী কোন পদক্ষেপ না থাকায় কোন ভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে বালু সন্ত্রাসকে এমনটাই জানান স্থানীয়রা।

অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হয়ে বলে জানিয়েছেন, লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার নূর-এ জান্নাত রুমি। তিনি আরো বলেন, লামা উপজেলার কোথাও সরকারীভাবে বালু উত্তোলনের ইজারা দেওয়া হয়নি। বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ বেআইনী। অসংখ্যবার আমরা অভিযান চালিয়েছি। বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের হারগাজা ছড়া, খুটাখালী ছড়া, লাইল্যারমার পাড়া, পাগলির বিল, ফকিরাখোলা, বগাইছড়ি, উত্তর মালুম্যা, আব্দুল্লাহ ঝিরি, কমিউনিটি সেন্টার, ফাঁসিয়াখালী ছড়া, কুমারী এলাকায় হতে কমপক্ষে ৩৫টি সেলু মেশিন দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী মানুষ, সরকারদলীয় লোকজন ও পার্শ্ববর্তী ডুলহাজারা-চকরিয়ার লোকজন এই বালু সন্ত্রাসের সাথে জড়িত।

হারগাজা এলাকার মো. হোসাইন, নুর ইসলাম, নুরুল আলম ও আমির হোসেন সহ অনেকে জানিয়েছেন, বালু তোলার কারণে তাদের ফসলের জমি, বসতবাড়ি ও খালের দু’পাড় ভেঙ্গে যচ্ছে। তারা কাউকে বলে কোন প্রতিকার পাচ্ছেন না। বালু ব্যবসায়ীরা ক্ষমতাবান হওয়ায় কেউ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেনা।

উপজেলার সরই ইউনিয়নের পুলু খাল, হরি খাল ও ডলু খালের কমপক্ষে ২৫টি পয়েন্ট থেকে সেলু মেশিন দিয়ে অবৈধ ভাবে বালু তোলা হয়। এতে করে খালের দু’পাড় ভেঙ্গে নষ্ট হচ্ছে বিস্তৃর্ণ ফসলের মাঠ, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, পাহাড় ও বসতবাড়ি। পার্শ্ববর্তী চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা ও সরই এলাকার সরকার দলীয় কিছু প্রভাবশালী লোকজন এই পরিবেশ ধ্বংসের সাথে জড়িত বলে জানায় স্থানীয়রা।

ইউনিয়নের ধুমচা বিল, পুলাং পাড়া, কেয়া বন্যা, হাসনা ভিটা, কিল্লাছডা, ডলুছড়ি বাজার পাড়া, ঝটকি বনিয়া পাড়া, আমতলী মুসলিম পাড়া, কিল্লাখোলা সহ অসংখ্য স্থান থেকে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে হরিখালটির মৃত্যু হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে ৬ মাস খালটিতে পানি থাকেনা। পাশাপাশি একইভাবে আজিজনগর ও ফাইতং ইউনিয়নের অসংখ্য জায়গা থেকে বালু তোলা হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করা সত্ত্বে ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের হারগাজা ও লাইল্যারমার পাড়া কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, বালু উত্তোলনকারীদের সাথে স্থানীয় সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সাথে সখ্যতা রয়েছে। দ্রুত বালু পাচার বন্ধে প্রশাসনের জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করেন স্থানীয়রা।

তারা আরো বলেন, ব্যাপক বালু তোলার কারণে এলাকার অর্ধশত ব্রিজ, কালভার্ট ও কয়েকটি রাস্তাঘাট বিলীনের পথে। প্রতিবছর জানুয়ারী থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত স্থানীয় ও বহিরাগত প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সেলু ইঞ্জিন দিয়ে নদী, খাল ও ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু তুলে থাকেন। ৪টি ইউনিয়নে প্রতিদিন গড়ে ২৫০ থকে ২৭০ ট্রাক বালু উত্তোলন করে নিয়ে যায়।

ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের বগাইছড়ি ও মালুম্যা হতে বালু উত্তোলনকারী মো. শাহজাহান, সিরাজুল ইসলাম ও আলতাজ মিয়া বলেন, নিউজ করা দরকার নেই। আপনাদের কাছে শুভেচ্ছা পেকেট চলে যাবে!

বৃহস্পতিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলা ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নে ১নং ওয়ার্ডের লাইল্যার মার পাড়া, হারগাজা, মালুম্যা ও বগাইছড়ি অংশের খালের মাঝে বালু উত্তোলন করে পাচারের উদ্দেশ্যে স্তূপ করে রেখেছে। পুরো খাল জুড়ে রয়েছে বালুর স্তূপ।

সরই পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মোঃ কাসেম আলী বিশ্বাস বলেন, বালু ব্যবসায়ীরা আমাদের নিষেধ শুনেনা।

ফাঁসিয়াখালী ইউপি চেয়ারম্যান জাকের হোসেন মজুমদার বলেন, কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অবৈধ বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। আমার জানা মতে লামা উপজেলার কোথাও বালু মহালের পারমিট নেই। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলন করার কারণে প্রতিবছর ভাঙ্গছে খালের দু’পার। গত কয়েক বছরের ব্যাপক ভাঙ্গনে ২৫টি বসতবাড়ী সম্পূর্ন বিলীন ও ভাঙ্গনের ঝুঁকিতে রয়েছে খালপাড়ের ৫০ থেকে ৭০টি বসতভিটা সহ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ ও বৌদ্ধ মন্দির।

বাংলাধারা/এফএস/এমআর

আরও পড়ুন