২১ অক্টোবর ২০২৬

লোকসুরে রবীন্দ্রবন্দনা, চট্টগ্রামে উদীচীর ‘একতারা ও রবীন্দ্র বীণা’

লোক-ঐতিহ্যের সুর আর রবীন্দ্র চেতনার মেলবন্ধনে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সাংস্কৃতিক আয়োজন ‘একতারা ও রবীন্দ্র বীণা’। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণ দিবস ২২ শ্রাবণ স্মরণে এ আয়োজন করা হয়।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টায় নগরের থিয়েটার ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে বাংলার লোকজ বাউল সুর ও ভাবধারায় অনুপ্রাণিত রবীন্দ্রসংগীত ও বাউল গানের অনন্য মেলবন্ধনে মুখর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল।

আবহমান বাংলার লোক-ঐতিহ্য, মাটির সুর ও রবীন্দ্র চেতনার সমন্বয়ে কবিগুরুকে স্মরণ করা হয় মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তচিন্তার আলোকে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি ও চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সভাপতি, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক জসীম চৌধুরী সবুজ। সভা সঞ্চালনা করেন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট অসীম বিকাশ দাশ।

আলোচনায় অংশ নেন চট্টগ্রাম কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক সুধীর বিকাশ দেব, কবি-নাট্যকার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অভীক ওসমান এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ শেখ সাদী।

অধ্যাপক সুধীর বিকাশ দেব বলেন, বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে উদীচীর এ আয়োজন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথের বাউল দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সীমানা অতিক্রম করে অন্তরের ‘মনের মানুষ’র সন্ধান।

তিনি বলেন, বাউল দর্শনের প্রভাবে রবীন্দ্রনাথ জাতিভেদ, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সামাজিক উগ্রতার বিরোধিতা করেছেন। মানুষের সমান অধিকার ও মানবমুক্তির যে দর্শন বাউল সংস্কৃতিতে রয়েছে, তা রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

নাট্যকার অভীক ওসমান বলেন, বর্তমানের বিভাজিত সময়ে বাউল ও রবীন্দ্রনাথের মানবিক দর্শন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষকে চেনা এবং প্রকৃতির মাঝে পরমাত্মাকে উপলব্ধি করার যে জীবনবোধ রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতে ফুটে উঠেছে, তা আজও মানুষকে পথ দেখায়।

অধ্যাপক মোহাম্মদ শেখ সাদী বলেন, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা একজন প্রগতিশীল মানবতাবাদী ও সংস্কারক। জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতার বিরোধিতা, নারী স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান, শিক্ষা সংস্কার এবং সাম্রাজ্যবাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদের সমালোচনার মধ্য দিয়ে তাঁর প্রগতিশীল চিন্তার প্রকাশ ঘটেছে।

তিনি বলেন, শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতীর মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিনির্ভর ও সর্বজনীন শিক্ষার যে ধারণা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা তাঁর আধুনিক ও মানবিক চিন্তারই প্রতিফলন।

সভাপতির বক্তব্যে জসীম চৌধুরী সবুজ বলেন, সংস্কৃতি শুধু অতীতকে স্মরণ করার বিষয় নয়; সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে চেতনা জাগায়, বিভাজনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শক্তি দেয় এবং মানুষকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসে।

তিনি বলেন, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী দীর্ঘ সাংস্কৃতিক অভিযাত্রায় শোষণ, নিপীড়ন, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, বৈষম্য ও মানুষের ওপর মানুষের আধিপত্যের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। মানবমুক্তির সংগ্রামে সংগঠনটি তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে অবিচল রয়েছে।

আলোচনা সভা শেষে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী বোয়ালখালী থানা সংসদের শিল্পীরা সমবেত সংগীত পরিবেশন করেন। এরপর মাধবী নৃত্যকলা একাডেমীর নৃত্য পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়।

সবশেষে অপর্ণা চৌধুরীর সংগীত পরিচালনায় বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের শিল্পীরা পরিবেশন করেন ‘একতারা ও রবীন্দ্র বীণা’ সুর আলেখ্য। বাউল সুর ও রবীন্দ্রসংগীতের এই মেলবন্ধন উপভোগ করেন উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ