১৪ মার্চ ২০২৬

সংকটের দুই বছরে চার শতাধিক মামলায় ১১’শ রোহিঙ্গা কারান্তরিণ

কক্সবাজার প্রতিনিধি »

আজ ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলার দুই বছর পূর্ণ হলো। ২০১৭ সালের ২৩ আগস্ট দিবাগত রাতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে বিদ্রোহী গ্রুপের হামলার ঘটনা ঘটে। এতে তাদের বেশ কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়। হামলাকারিদের আশ্রয় দেয়ার অজুহাতে ২৪ আগস্ট রাতে সংখ্যালুঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের উপর স্বরণকালের ভয়াবহ বর্বরতা শুরু করে সে দেশের সেনাবাহিনী ও উগ্রপন্থী মগরা (বৌদ্ধ ধর্মালম্বীরা)। চলে  গনহত্যা, ধর্ষন, অগ্নিসংযোগসহ বিভৎস সব নির্যাতন। এতে প্রাণ রক্ষায় দলে দলে বাংলাদেশ সীমান্তে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা। 

মানবিকতার কারণে বাংলাদেশ সরকার কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের সীমান্তপথ খুলে দিয়ে নিপীড়িত প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়। সীমান্তের দু’উপজেলার প্রায় ৮ হাজার একর পাহাড়ি বনভূমিতে আশ্রয়স্থল তৈরী করে ৩৩টি ক্যাম্পে রাখা হয়েছে নতুন পুরোনো প্রায় সোয়া ১১ লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে। এদের অধিকাংশই নারী-শিশু। দেয়া হচ্ছে জীবন ধারণে প্রয়োজনীয় রসদ। বাংলাদেশের এ মানবিকতা বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে। 

কিন্তু আশ্রয়ের পাশাপাশি সবধরণের সুযোগ পেয়ে দিন দিন উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা শিবিরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিষিয়ে তোলছে রোহিঙ্গারা। ইয়াবা পাচার, ডাকাতি চুরি ও হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়াচ্ছে জাতিগত নিধনের শিকার এসব রোহিঙ্গাদের অনেকে। এসব কারণে মানবতা দেখানো স্থানীয়দের জন্য রোহিঙ্গারা এখন বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দিয়েছে। 

নানা অপরাধে গত দুই বছরে ৪ শতাধিকের বেশী মামলার আসামী হয়েছে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ। এসব মামলায় কারান্তরিণ হয়েছে প্রায় ১১’শ রোহিঙ্গা। এমন পরিস্থিতিতে তড়িত প্রত্যাবাসন না হলে অনাগত দিনগুলো নিয়ে শঙ্কিত স্থানীয়রা। 

আইনশৃঙ্খলাবাহিনী সুত্র জানায়, গত দুই বছরে রোহিঙ্গা শিবিরে নিজেদের অভ্যন্তরীন দ্বন্ধ ও প্রশাসনের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন ৪৬ রোহিঙ্গা। এদের মাঝে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন ৩২ জন। এছাড়াও ডাকাতি, অপহরণ, ধর্ষণ, চুরি, মাদক ও মানবপাচারসহ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৪৭১ টি। যার মধ্যে, মাদক মামলা ২০৮, হত্যা মামলা ৪৩ ও নারী সক্রান্ত মামলা ৩১ টি। এসব মামলায় আসামী ১১০৫ রোহিঙ্গা। অপরাধের সাথে জড়িতদের নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

স্থানীয়রা বলছেন, দিন দিন রোহিঙ্গারা বেপরোয়া হচ্ছে। তারা জড়িয়ে পড়ঝে চুরি, হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে। ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে স্থানীয়দের উপর হামলার ঘটনাও ঘটছে। বৃহস্পতিবার হত্যা করা হয়েছে টেকনাফের হ্নীলার ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি ওমর ফারুককে। 

উখিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে আশ্রয়ে আছে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। বিপুল এই জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এদিকে দেশী-বিদেশী দাতা সংস্থা গুলোর কারসাজিতে পরপর দুই বার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হওয়ায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ভুগছেন স্থানীয়রা। রোহিঙ্গাদের অপরাধ কর্মকান্ড ও সহিংস আচরণও রাড়ছে। এটি নি:সন্দেহে ভাবনার বিষয়। 

কক্সবাজারের সিভিল সোসাইটির নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, বেপরোয়া রোহিঙ্গারা বেশীরভাগ সময় স্থানীয়দের উপর আগ্রাসি হচ্ছে। কিছু এনজিওর উস্কানিতে তারা এমন আচরণ করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। 

কক্সবাজার র‌্যাব-১৫ এর অধিনায়ক উইন কমান্ডার আজিম আহমেদ বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধ দমনে র‌্যাব প্রতিনিয়িত অভিযান চলাচ্ছে। পাশাপাশি মাদক পাচারে জড়িত বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে। র‌্যাবের সঙ্গে গুলিবিনিময়ের ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সবসময় সচেষ্ট রয়েছে র‌্যাব। 

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. ইকবাল হোসাইন বলেন, প্রতিদিনই বাড়ছে রোহিঙ্গাদের মামলার সংখ্যা। হত্যা,চুরি মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তারা। অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলেই ৪ শতাধিক মামলা হয়েছে এবং কারান্তরিণও আছে প্রায় ১১’শ জন। নিপীড়ন দেখে বেড়ে উঠা এত সংখ্যক উদ্বাস্তু এক জায়গায় থাকলে অপরাধের মাত্রা বাড়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে রয়েছে পুলিশ, এমনটি উল্লেখ করেন তিনি।

বাংলাধারা/এফএস/এমআর/টিএম

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ