তারেক মাহমুদ »
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসে প্রতিনিয়তই বাড়েছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। এ ভাইরাসে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৬৯ হাজার ৫৫২ জন আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছেন ৬ হাজার ৫১৬ জন। চীনের পর সর্বোচ্চ আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ইতালিতে। ইতালির পরেই রয়েছে ইরান। সম্প্রতি প্রাণঘাতি এ ভাইরাস প্রবেশ করেছে বাংলাদেশে। এদিকে এই মুহূর্তে চট্টগ্রাম করোনার সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে আছে বলে জানিয়েছেন জেলা সিভিল সার্জন শেখ ফজলে রাব্বী মিয়া। বিমানবন্দর ও সমুদ্র বন্দরের কারণে এখানে ঝুঁকির পরিমাণটা সবচেয়ে বেশি। তাছাড়া চট্টগ্রামে তিনটি রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকায় কয়েক’শ কারখানা, নির্মাণাধীন একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল, কর্ণফুলী টানেলসহ বেশকিছু প্রকল্পে বিদেশি নাগরিকরা কর্মরত। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ প্রবাসী নাগরিকের সংখ্যাও দেশের অন্যান্য জেলার চেয়ে চট্টগ্রামে বেশি। সবমিলিয়ে চট্টগ্রামে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে।
চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে ইতোমধ্যেই থার্মাল স্ক্যানার বসানো হয়েছে। এছাড়া সমুদ্রবন্দরে হ্যান্ড থার্মাল স্ক্যানারের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হচ্ছে। করোনাদুর্গত এলাকার মধ্যে ইতালি থেকেই সবচেয়ে বেশি প্রবাসীরা ফিরছেন। সাধারণত একজন করোনা আক্রান্ত রোগীর উপসর্গ দেখা দিতে ২ থেকে ১৪ দিন সময় লাগে। তাই বিমানবন্দরে স্ক্রেনিংয়ে করোনায় সংক্রমিত ব্যক্তি বেরিয়েও যেতে পারে। তাই চট্টগ্রামে করোনার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
করোনার প্রভাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে নগরীর পলোগ্রাউন্ড মাঠে চট্টগ্রাম চেম্বার আয়োজিত ২৮তম আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা স্থগিত করা হয়েছে। এই বাণিজ্য মেলাকে ঘিরে লাখ লাখ মানুষের সমাগমের মাধ্যমে করোনার ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
সাম্প্রতিক করোনা পরিস্থিতির কারণে আগামী ২১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠেয় ‘স্বাধীনতার বইমেলা’ স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থগিত করা হয়েছে রসায়ন অলিম্পিয়াডের চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রতিযোগিতা।
এই ভয়াবহ ভাইরাসের কারণে বন্ধ রয়েছে নগরীর সব কোচিং ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এদিকে, নগরীর সব সিনেমা হল বন্ধের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বাতিল হয়েছে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের অধিকাংশ ফ্লাইট।
করোনার ধাক্কায় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে এরই মধ্যে রফতানি কমে গেছে। বন্দরে জাহাজ আসার পরিমাণও কমছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের কিছু বিদেশি এজেন্ট চীনের সঙ্গে চট্টগ্রামে বন্দরে সরাসরি জাহাজযোগে পণ্য আনা-নেওয়া করে। এসব জাহাজ এখন বন্দরে এলে ১৪ দিনের পর্যবেক্ষণে থাকছে। যার ফলে জাহাজ আসা থেকে পণ্য খালাস পর্যন্ত বড় একটি সময়ের অপচয় হচ্ছে। এ কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতির সম্মুখীন।
এদিকে নগরীতে বইছে সিটি করপোরেশন নির্বাচনী হাওয়া। আসছে ২৯ মার্চের এই নির্বাচনকে ঘিরে জনসংযোগের মধ্য দিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা। প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসের কারণে সংক্ষেপে ও কম জনসমাগমের মধ্য দিয়ে জনসংযোগ কার্যক্রম সম্পন্ন করছেন প্রার্থীরা। পাশাপাশি নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে গিয়ে আলিঙ্গন ও করমর্দন করা থেকে নিজেদের বিরত রাখছেন প্রার্থীরা।
করোনার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতেও। আতঙ্কে অনেকেই স্থগিত করছেন নানা ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান। সড়কজুড়ে কমে গেছে যাত্রীদের আনাগোনা। প্রয়োজনীয় কাজ সেরেই ঘরে ফিরে যাচ্ছেন নগরবাসী।
চট্টগ্রামে গত ২৪ ঘণ্টায় ৮ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া এর আগে চট্টগ্রামে হোম কোয়ারেন্টাইনে ছিল ২১ জন।
করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় চট্টগ্রামের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল, সিভিল সার্জন কার্যালয়, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক), শাহ্ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং চট্টগ্রাম বন্দর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের উদ্যোগে জেনারেল হাসপাতালে পাঁচটি আইসোলেশন বেড, চট্টগ্রাম বন্দর ও বিমানবন্দরে চারজন করে দু’টি মেডিকেল টিম রাখা হয়েছে। তাছাড়া চমেক হাসপাতালেও খোলা হয়েছে পাঁচটি আইসোলেশন বেড। চসিকের স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্যোগে জরুরি প্রয়োজনে চসিক জেনারেল হাসপাতাল, মেমন মাতৃসদন হাসপাতাল ও ওয়ার্ড স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দায়িত্বরত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এদিকে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে সন্দেহজনক এমন রোগীদের বিশেষ ব্যবস্থায় কোয়ারেন্টাইনে রাখার জন্য স্কুলের পরিবর্তে নগরীর দু’টি আবাসিক হোটেলকে বেছে নিয়েছে জেলা প্রশাসন।
জেলা সিভিল সার্জন শেখ ফজলে রাব্বী মিয়া জানান, চট্টগ্রাম জেলা এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে আছে। কারণ আমাদের দুটি বন্দর, একটি বিমানবন্দর ও অপরটি সমুদ্র বন্দর। দু’টি বন্দর দিয়েই সংক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এন্ট্রি পয়েন্টেই যদি সংক্রমণকারীকে ঠেকিয়ে দেয়া না যায়, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না।’ ইতালিফেরত প্রবাসীদের কারণে চট্টগ্রামে ঝুঁকির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সিভিল সার্জন বলেন, করোনাদুর্গত এলাকার মধ্যে ইতালি থেকেই সবচেয়ে বেশি প্রবাসীরা ফিরছেন। সাধারণত একজন করোনা আক্রান্ত রোগীর উপসর্গ দেখা দিতে ২ থেকে ১৪ দিন সময় লাগে। তাই বিমানবন্দরে স্ক্রিনিংয়ে করোনায় সংক্রমিত ব্যক্তি বেরিয়েও যেতে পারে। এ সব কারণে আমরা বিমানবন্দর থেকে প্রতি মুহূর্তে আপডেট তথ্য নিচ্ছি এবং প্রবাসীদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে কাজ করছি।’
ফজলে রাব্বী মিয়া বলেন, এছাড়া করোনাদুর্গত এলাকা থেকে আগত প্রবাসীদের কারও যদি শরীরে তাপমাত্রা বেশি পাওয়া যায় তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই বিমানবন্দর থেকে তাকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
হোম কোয়ারেন্টাইনের বিষয়ে সিভিল সার্জন বলেন, চট্টগ্রামের হোম কোয়ারেন্টাইন তদারকিতে একটি শক্তিশালী কমিটি কাজ করছে। এতে জেলা প্রশাসক, স্বাস্থ্য বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও আছে। বিমানবন্দর থেকে প্রবাসফেরত যাত্রীদের তালিকা স্থানীয় প্রশাসন ও ডিজিএফআইকে সরবরাহ করা হচ্ছে। তারাই হোম কোয়ারেন্টাইনের বিষয়টি তদারকি করছেন।
তিনি বলেন, হোম কোয়ারেন্টাইনের ক্ষেত্রে পরিবারকে বেশি সচেতন হতে হবে। প্রবাস থেকে আগত সদস্যকে একটি আলাদা ঘরে ১৪ দিনে জন্য আলাদা করে রাখতে হবে। বাড়ির পাশের মানুষদের বলব, আপনারা প্রবাসীদের শত্রু ভাববেন না। তারা তো দেশের জন্যই অর্থ উপার্জন করেন। তারা মূলত, একটি বৈশ্বিক পরিস্থিতির শিকার। তাই তাদের সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করুন। প্রয়োজনে তাদের পরিবারের সদস্যদের বাজার-সদাই করে দিন। এ ক্ষেত্রে যোগাযোগ হবে অবশ্যই মোবাইলে। কোনোভাবেই যেন তারা রেসিজমের (বর্ণবাদ) শিকার না হন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্দেহভাজন ৬ শিক্ষার্থী করোনামুক্ত জানিয়ে সিভিল সার্জন বলেন, সেই ৬ যুবক করোনাভাইরাসমুক্ত। আমরা পরীক্ষা করে কোনো আলামত পাইনি। তাদের মধ্যে ইতালিফেরত যুবক ছাড়া অন্য ৫ জনকে ১৪ দিনের জন্য হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে। আর ইতালি থেকে আসা যুবকের ১৩ দিন অতিবাহিত হওয়ায় তাকে ১ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকা লাগবে।
শাহ্ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক উইং কমান্ডার সরওয়ার-ই-জামান বলেন, নতুন থার্মাল স্ক্যানারটি দিয়ে বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের করোনার লক্ষণ আছে কিনা দেখা হচ্ছে। করোনা মেকাবিলায় আমরা সব ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।
বাংলাধারা/এফএস/টিএম












