মাকসুদ আহম্মদ, বিশেষ প্রতিবেদক »
কক্সবাজারে সমুদ্রের বিশালতায় ঢেউয়ের তালে তালে গা ভেজাতে ফাঁকা সৈকত খুঁজে বেড়ায় পর্যটকরা । লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী বীচ হচ্ছে পর্যটকদের পরিভ্রমনের অন্যতম স্থান। সকাল না হতেই পর্যটকরা ছুঁটে চলে সৈকতের বালিয়াড়িতে। সেখানে সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঘোলা পানিতেই লুটোপুটি খায়। কিন্তু যারা বেশ কয়েকবারে কক্সবাজার গিয়েছেন তাঁরা কিন্তু এসব বীচে পা ফেলেন না। তাঁরো চলে যান হিমছড়ি, ইনানী আর টিউলিপ বীচে। যেখানে স্বচ্ছ পানির মিলনমেলা। তবে খুব ভোরে বিশেষ করে সূর্যোদয়ের আগে যদি ইনানী বীচে পৌছানো যায় তাহলে দেখা যাবে বাংলাদেশে হোয়াইট গোল্ড খ্যাতির রহস্য। তথা এ দেশের চিংড়ী রফতানি করে কিভাবে হেচারী মালিকরা বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন করছেন। তবে এ বৈদেশিক মূদ্রা আসে কক্সবাজারের ইনানী বীচের চিংড়ী পোনা থেকে। সকাল সাড়ে ছয়টার মধ্যেই চিংড়ী পোনা ধরা শেষ জেলেদের।

সুঁতোর মত চিংড়ী পোনা। কক্সবাজারের ইনানী সমূদ্র সৈকতে খুঁজে বেড়াচ্ছেন এক শ্রেণীর জেলেরা। সূর্যের প্রখরতা বাড়ার আগেই মশারীর জালে ধরতে হয় এসব বাগদা চিংড়ীর পোনা। তাই সূর্যোদয়ের আগেই ভোর সকালে চিংড়ী পোনা আহরণে নামে এইসব জেলে। অভিনব কৌশলে এসব পোনা আহরণ করে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই আবার স্থানীয় হেচারীতে বিক্রি করা হয়। পোনা নির্ভর হেচারীগুলোতে একশত পোনা ক্রয় করা হয় মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ টাকায়। তবে কক্সবাজারের সুগন্ধা, কলাতলী কিংবা লাবণী পয়েন্টে এ ধরনের সুযোগ নেই।

প্রত্যক্ষভাবে দেখা গেছে, ঠিকমতো সূর্যোদয় হয়নি। তখন থেকেই পর্যটকদের আনাগোনা শুরু হয় ইনানী সমূদ্র সৈকতে। বিশেষ করে যারা নিজেদের গাড়ীতে সৈকতের রাণী কক্সবাজারে বেড়াতে যান তারাই খুব ভোরে পৌছাতে পারেন ইনানীতে। সৈকতে যখন জোয়ার চলে ঠিক তখনই চিংড়ী পোনা ধরতে জেলেরা মেতে উঠে। জোয়ারের ঢেউয়ের পানিতে ভেসে আসা চিংড়ীর পোনা ধরতে জলেরা ব্যবহার করছে মশারীর কাপড়ের তৈরী এক ধরনের জাল। অনেকটা বস্তার ন্যায় তৈরী করা এসব জালের একপাশে মুখ বেঁধে দেয়া হয়। তারপর বাঁশে আটকানো জারে ঢেউয়ের পানি কয়েক দফায় প্রবেশ করিয়ে চিংড়ী পোনা আটকানো হয়। এরপর একটি পাতিলে ঢেউয়ের সঙ্গে থাকা ময়লা আবর্জনাসহ জালটির মুখ খুলে দেয়া হয়।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি এই পোনা আহরনের দৃশ্য অন্যরকম। চোখে না দেখলে বোঝার উপায় নেই। কারন পাতিলের পানিতে জোয়ারে ভেসে আসা পোনাগুলোকে আবার খুঁজে নিতে হয়। সাদা একটি প্লাস্টিকের বাটিতে পাতিলের ময়লা মিশ্রিত পানিগুলো একটু একটু করে তোলা হয়। সাদা বাটিতে তোলা পানিতে অন্য ময়লা আবর্জনার সঙ্গে কয়েকটি চিকন সুঁতোর মত কাটা টুকরো দেখা যায়। সেগুলোই হচ্ছে বাগদা চিংড়ীর পোনা। যারা কখনো এই দৃশ্য দেখেনি তারা কিছুতেই বুঝতে পারবেন না সাগর পাড়ে এসব মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টা কি করছেন কাক ডাঁকা ভোরে। পরে আসলে তারা সুঁতোর মত পোনাগুলোকে একটি পাতিলে আলাদা করেন।

এসব জেলেরা জানিয়েছেন, যুগের পর যুগ তারা এভাবে সকাল ভোরে জোয়ারের সময় চিংড়ীর পোনা ধরেন। ইনানী সমূদ্র্র উপকূলের আশ পাশ এলাকার মানুষ এসব পোনা ধরার উপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে। ইনানীর বিভিন্ন পয়েন্টে জেলেরা তাদের ছেলে পুলে নিয়ে জোয়ারে পানিতে চিংড়ী পোনা আহরণে নামেন। মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে ৫শ’ থেকে হাজার টাকা আয় করতে পারে জেলে পরিবারগুলো। তবে এই সুযোগ প্রতিদিন আসে না। সপ্তাহে তিন থেকে চারদিন এসব পোনা জোয়ারের পানিতে ভেসে আসে।এদিকে, কক্সবাজারের কৃষিজীবি পরিবারের শতকরা ২০ ভাগই ট্রলার বা নৌকায় মাছ শিকার করে জীবনযাপন করেন। জীবিকার তাগিদে সাগরের ঢেউয়ে চিংড়ী পোনা ধরেন তারা। আর এতে কোন ধরনের বাধাও নেই। তবে ভৌগলিক অবস্থানের কারনে কুতুবদিয়া ও মহেশখালীতে সামূদ্রিক মাছের লালন, প্রজনন ও বিচরণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। সাগর ও নদীর মোহানায় এমনকি উপকূলীয় অঞ্চলের নদী, খাল, বিল ও খাঁড়ি বা ডোবা থেকে ধান চাষের সময় প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। এছাড়াও বৃষ্টির সময় বিভিন্ন জাতের প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। এই অঞ্চলের জমিতেও ব্যাপক আকারে চিংড়ীর চাষ করা হয়।
বাংলাধারা/এফএস/এফএস












