১৮ মার্চ ২০২৬

সীতাকুণ্ডে পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণে সন্ত্রাসীরা

মাকসুদ আহম্মদ, বিশেষ প্রতিবেদক »

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ে রয়েছে প্রায় ২০ হাজার পরিবারের অবৈধ বসবাস। জেলা প্রশাসনের হিসেব অনুযায়ী, ১০ হাজার ৯৫০ পরিবারে প্রায় ৪০ হাজার সদস্যের অবৈধ বসবাস রয়েছে জঙ্গল সিলিমপুরের প্রায় ৩০টি পাহাড়ে। পাহাড়ের চূড়ায়, মাটি কেটে ধাপে ধাপে ও পাহাড়ের পাদদেশ মিলে প্রায় ৪০ হাজার লোকের বসবাস আছে অবৈধভাবে। আলীনগর ও জঙ্গল সিলিমপুরের প্রায় ১ হাজার একর পাহাড়ি বনভূমি আক্কাস বাহিনীর সাঙ্গপাঙ্গ ও ইয়াসিন বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। মাত্র ৭/৮ হাজার টাকায় প্রথমে পাহাড়ের পাদদেশে মেলে ২ শতক জায়গা। পাহাড়কাটার পর বাসযোগ্য হলেই এর দাম উঠে লাখ টাকায়।

পাহাড়ের চূড়ায় থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করলেই শুধু ছিন্নমূল ও বাস্তুহারা কমিটির চাঁদা দিলেই চলে। বাংলাদেশ বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডের খুঁটি যেমন বসানো হয়েছে অবৈধভাবে, তেমনি প্রশাসনের প্রবেশাধিকারেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে নিয়ন্ত্রকদের সাঙ্গপাঙ্গ দিয়ে। সন্ত্রাসীদের কারণে সেখানে সীতাকুণ্ড থানা পুলিশেরও নিয়ন্ত্রণ নেই আইনশৃঙ্খলায়। ফলে ছিন্নমূল বস্তি আর আলী নগর বস্তিগুলো গড়ে উঠেছে জেলা প্রশাসনের আড়ালে পৃথক সম্রাজ্যে।

সরকারি খাস জমির অংশ হিসেবে দুটি সম্রাজ্যের দখলে ৩০টি পাহাড়ে রয়েছে প্রায় ১ হাজার একর পাহাড়ি ভূমি। যেখানে এক সময় ছিল বন্যগাছের বনাঞ্চল, এখন তা পাহাড়ি জনপদে পরিণত হয়েছে। সীতাকুণ্ড থানার আওতায় হলেও একটি অংশের প্রবেশ রয়েছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পথ ধরে দুয়েক কিলোমিটার। আবার ফৌজদার হাট রেল স্টেশনের ৫শ’ গজ আগেই চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সিলিমপুর সিডিএ আবাসিক এলাকার পথ ধরেও দেড় কিলোমিটার পাড়ি দিলেই দূর থেকে দেখা যায় ছিন্নমূলের নামে গড়া দুটি সম্রাজ্যের পাহাড়ি আবাসস্থল। তবে সবচেয়ে সোজা পথ সিএমপির বায়জিদ থানার বাংলাবাজার হয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার পার হলেই শুরু হয় কর্দমাক্ত পায়ে হেটে চলার পথ। মোটামুটি ৪/৫ কিলো পার হলেই পরিচয় মেলে ছিন্নমূলের নামে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাঁচাপাকা স্থাপনা।

৩০টি পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও সন্ত্রাসীদের হাতে। ২০১০ সালের মাঝামাঝি সময়ে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুক যুদ্ধে সন্ত্রাসী ও ছিন্নমূল বস্তিবাসির নিয়ন্ত্রকের মৃত্যুর পরই নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ইয়াসিন বাহিনীর হাতে। চারটি ধাপে এই এলাকার প্রায় ৪০ হাজার মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করছে এই ইয়াসিন বাহিনী। জঙ্গল ছিলিমপুরের তিনটি প্রবেশদ্বারের বাংলাবাজারের প্রবেশদ্বারেই রয়েছে প্রায় অর্ধশত সন্ত্রাসী ইয়াসিনের ইনফরমার। মিডিয়ার লোক বা পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্য সন্দেহ হলেই খবর চলে যাচ্ছে ভেতরে। এরপরই শুরু হয় বাধা। একই পরিস্থিতি সিডিএ’র সিলিমপুর আবাসিক এলাকার সড়কেও রয়েছে। তবে সেখানে সন্ত্রাসীদের নজরদারি ততটা কঠোর নয়। কয়েক কিলোমিটার হেঁটে পাহাড় ও টিলা টপকিয়ে জঙ্গল ছিলিমপুরে পৌঁছানো যায়।

দীর্ঘ প্রায় তিন যুগ ছড়িয়ে ছিটিয়ে সরকারি পাহাড় দখল চললেও এখন চলছে সাজানো গোছানোর মতই। টাকার পরিমাণে পরিবর্তন আসছে মালিকানার। যারা এক সময় বিনে পয়সায় দখল করে বসবাসযোগ্য করেছে পাহাড়ের পাদদেশ তারা এখন বিক্রি করছে লাখ টাকায়। নীচে যারা ছিল তারা ক্রমশ পাহাড় কাটতে কাটতে আর দখল বিক্রি করতে করতে পাহাড়ের উপরে উঠছে।

ছিন্নমূল বস্তিবাসির সমিতির হিসেব অনুযায়ী, ১৫০ টাকা মাসিক চাঁদা দিয়ে সমিতির সদস্য সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার। তবে প্রায় ৪০ হাজার লোকের বসবাস রয়েছে আলীনগর ও ছিন্নমূল বস্তি এলাকায়। প্রায় ১ হাজার একর এলাকা ঘিরে গড়ে উঠা ভূমি দখলকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ ও জেলা প্রশাসন অনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

পাহাড়ি জনপথ হওয়ার কারণে ও দুর্গম পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের পদচারনা কম। ফলে সেখানকার দোকানিরা চিনতে পারেন কারা নতুন আর কারা পুরাতন। ফলে নবাগতদের ইনফরমেশন সহজেই মোবাইলের মাধ্যমে চলে যায় সমাজপতি ও নিয়ন্ত্রকদের কাছে। তবে জেলা প্রশাসনের হিসেব অনুযায়ী, ছিন্নমূল বস্তিতে রযেছে ৮ হাজার ৯৫০ পরিবার আর আলী নগর বস্তিতে রয়েছে আরো প্রায় ২ হাজার পরিবার। জিওলজিক্যাাল সার্ভে অনুযায়ী, কাটা পাহাড়ে অতিবৃষ্টির কারণে মাটিধসের ঘটনা ঘটতে পারে।

স্থানীয় লোকজন যারা সেখানে বসবাস করেন ও দোকানিদের তথ্য অনুযায়ী, মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানাও রয়েছে সেখানে। রয়েছে এতিমদের জন্য তিনটি এতিমখানা, নামাজ আদায়ের জন্য রয়েছে ১২টি মসািজদ, পড়ালেখার জন্য কিন্ডার গার্টেন ও স্কুলসহ ৭টি প্রতিষ্ঠান। ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করতে রয়েছে ৪টি মাদ্রাসা। ছোটবড় ৬টি কবরস্থান ছাড়াও মন্দির, গীর্জা, কেয়াং ও শ্মশানও রয়েছে। ফলে একমাত্র হাসাপাতাল ছাড়া এই এলাকার মানুষ অনেকটা অন্যদের ওপর নির্ভরশীল নয়।

২০০৪ সাল থেকে দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছরে মানুষের আধিক্য বাড়লেও ২০১০ সালে সমাজের নিয়ন্ত্রক ও সন্ত্রাসী আক্কাসের মৃত্যুর পর থেকে অস্থিতিশীলতা বেড়েছে। এসব জায়গা একদিকে পাহাড়ি হলেও অন্যদিকে ক্রয় বা দখল ক্ষমতা হাতের নাগালে হবার কারণে জনসংখ্যা বাড়ছে। ২০০৬ সালে এসব সরকারি পাহাড়ি ভূমি মালিকানায় নিতে আবেদন করা হয়েছিল সমিতির পক্ষ থেকে। এই ভূমি নিজেদের নামে বরাদ্দ নিতে সমিতির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে সংবাদ সম্মেলনও করা হয়েছে চেরাগী পাহাড় সংলগ্ন লুসাই ভবনে। তখন আক্কাস বাহিনী ট্রাকে ট্রাকে হাজারো সদস্য নিয়ে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব এলাকায় শোডাউনও করেছে। এরপর চট্টগ্রাম আদালত ভবনে থাকা জেলা প্রশাসকের কাছেও স্মারকলিপি প্রদান করেছে। এরপর সরকারের টনক নড়লে সীতাকুণ্ড উপজেলা ভূমি অফিসের পক্ষ থেকে সার্ভেও করা হয়।

এদিকে, পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস না করতে দফায় দফায় মাইকিং করা হয়। এমনকি এলাকাভিত্তিক মসজিদেও মাইকিং করা হয়। সীতাকুণ্ড থেকে কোনভাবেই ছিন্নমূলের নামে গড়া পাহাড়ি ভূমিতে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। তবে বায়েজিদের বাংলাবাজার হয়ে শুধু বর্ষায় নয়, বছরের বিভিন্ন সময়ে পাহাড়ে বসবাস না করতে নিরুৎসাহিত করেছে জেলা প্রশাসন। মাইকিং করতে গিয়েও প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হয়েছে।

আরও পড়ুন