চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া ও চান্দগাঁও এলাকায় ‘হিজড়া পরিচয়ে’ দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি, অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগে আলোচিত ছৈয়দ মোহাম্মদ হোসেন প্রকাশ ইলুর বিরুদ্ধে মানব পাচার আইনে নতুন মামলা হয়েছে।
একের পর এক মামলা ও গ্রেপ্তার সত্ত্বেও তার গড়ে তোলা নেটওয়ার্ক নগরজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে চলেছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী ও হিজড়া সম্প্রদায়ের।
মানব পাচার আইনে নতুন মামলা
তথ্যসূত্রে জানা গেছে, গত ১১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের বাকলিয়া থানায় মামলা নম্বর–১৩/২৬ দায়ের করা হয়। মামলাটি করা হয়েছে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২-এর আওতায়।
মামলার বাদী বাবু শিখা মিলন (৩১), পিতা– মো. শাহাজাহান, বর্তমানে বাকলিয়া থানাধীন রাজাখালী এলাকার মোনাফ হাজির বাড়ির ভাড়াটিয়া।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, বাকলিয়া থানাধীন রাজাখালী ফায়ার সার্ভিস-সংলগ্ন মেঘনা গলির খতিজা ভিলার ৫ম তলার একটি কক্ষে শোষণ ও জোরজবরদস্তির মাধ্যমে গুরুতর অঙ্গহানির ঘটনা ঘটানো হয়। মামলায় প্রধান অভিযুক্ত করা হয়েছে ছৈয়দ মোহাম্মদ হোসেন প্রকাশ ইলুকে।
চান্দগাঁও থানার চাঞ্চল্যকর মামলা
এর আগে চান্দগাঁও থানায় মামলা নম্বর–৩০/২৫ দায়ের করা হয় মাহিন হিজড়ার করা অভিযোগের ভিত্তিতে। মামলার বাদী মো. মাহিন হিজড়া (২৫), পিতা– ইউসুপ, মাতা– সুফিয়া। ঠিকানা: কসাইপাড়া, আরাকান রোড, কবির সওদাগরের বাড়ি, চান্দগাঁও, চট্টগ্রাম।
চান্দগাঁও থানার তৎকালীন ওসি জসিম উদ্দিন ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমির হোসেন মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। গত ১১ জানুয়ারি মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আবুল মনসুরের আদালত ইলুর জামিন নামঞ্জুর করেন।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন ধরে মাহিন হিজড়া ও তার সহযোগীদের কাছ থেকে মাসিক ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিল। টাকা না দিলে চট্টগ্রাম শহরে থাকতে দেবে না বলে হুমকি দেওয়া হয়।
অপহরণ, নির্যাতন ও লুটপাটের অভিযোগ
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, গত ২৭ ডিসেম্বর দুপুর ১টা ২০ মিনিটে চান্দগাঁও থানাধীন এক কিলোমিটার এলাকায় সাবানা গার্মেন্টসের সামনে বাদী ও তার সঙ্গীদের ওপর হামলা চালানো হয়।
অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্তরা বে-আইনি জনতাবদ্ধ হয়ে কিল-ঘুষি, লাথি মেরে জখম করে, ঝাঁঝালো স্প্রে ব্যবহার করে এবং একটি সিলভার রঙের নোহা গাড়িতে তুলে অপহরণ করে বাকলিয়া থানাধীন কল্পলোক আবাসিক এলাকার একটি বাসায় আটকে রাখে।
সেখানে হকিস্টিক, এসএস পাইপ ও লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মোবাইল ফোন, নগদ টাকা ও আনুমানিক ২ ভরি স্বর্ণালংকার লুটের অভিযোগও রয়েছে। আহতদের কয়েকজন বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ইলুর বিরুদ্ধে নগরীতে একাধিক থানায় মামলা
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ইলুর বিরুদ্ধে এর আগে চান্দগাঁও থানা মামলা নং–৩০/২৫, পাঁচলাইশ মডেল থানা মামলা নং–০৫/২৬, চকবাজার থানা মামলা নং–১২/২০ এবং ২০১২ সালের কাদের হত্যা মামলা, হত্যাচেষ্টা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, গুরুতর জখমসহ একাধিক অভিযোগে মামলা রয়েছে। তিনি ২০১২ সালের আলোচিত কাদের হত্যা মামলারও চার্জশিটভুক্ত প্রধান আসামি।
প্রযোজ্য আইনি ধারা
ইলুসহ একাধিক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে,মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ (শোষণ ও জোরপূর্বক অঙ্গহানি), দণ্ডবিধি ৩২৬ ধারা (বিপজ্জনক অস্ত্র দ্বারা গুরুতর জখম), দণ্ডবিধি ৩৬৫ ধারা (অপহরণ), দণ্ডবিধি ৩৪২ ধারা (বেআইনি আটক), দণ্ডবিধি ৩৮৫ ধারা (চাঁদাবাজি), দণ্ডবিধি ৩০৭ ধারা (হত্যাচেষ্টা) এ একাধিক মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
ছৈয়দ মোহাম্মদ হোসেন প্রকাশ ইলু প্রায় ১৯ বছর ধরে সাধারণ হিজড়াদের ওপর একক আধিপত্য কায়েম করেছেন। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, তারা যা আয় করেন তার সিংহভাগ ইলুকে দিতে বাধ্য থাকেন। বাধ্যতা না মানলে শারীরিকভাবে মারধর করা হয় এবং মাথার চুল কেটে দেওয়া হয়। মারধরের পর লিখিত স্ট্যাম্প নেওয়া হয়, যা ইলুর ভয়ংকর নিয়ন্ত্রণের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এ ছাড়া, ইলুর বিরুদ্ধে মুখ খুললেই নানারকম মামলা ও আইনি হুমকির ভয় দেখানো হয়, ফলে ভুক্তভোগীরা এক ধরনের সামাজিক ও মানসিক বন্দিত্বের মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য হন।
ফরেনসিক ও সার্জনের বক্তব্য
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ মোশাররফ হোসেন বলেন,
“জোরপূর্বক অঙ্গহানি মানব পাচারের চরম রূপ। এতে ভুক্তভোগীর শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের স্থায়ী ক্ষতি হয়।”
চট্টগ্রামের অভিজ্ঞ সার্জন শেফায়েত উল্লাহ জানান,
“এ ধরনের আঘাতে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়। চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল হয়ে পড়ে, অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ী পুনর্বাসন প্রয়োজন হয়।”
প্রকৃত হিজড়া সম্প্রদায়ের ক্ষোভ
হিজড়া সম্প্রদায়ের সুসমিতাসহ একাধিক সদস্য অভিযোগ করেন, ইলু নিজে হিজড়া না হয়েও দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে হিজড়া সেজে বাকলিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেন। এতে প্রকৃত হিজড়ারা সামাজিকভাবে লাঞ্ছিত ও নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ছেন।
পুলিশ ও প্রশাসনের বক্তব্য
বাকলিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ সোলাইমান বলেন,
“তার বিরুদ্ধে মানব পাচার আইনে মামলা হয়েছে। অভিযোগ গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। অপরাধী যেই হোক, আইনের আওতায় আনা হবে।”
গঠনমূলক পর্যবেক্ষণ ও আইনজীবীর মতামত
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে নেটওয়ার্কভিত্তিক তদন্ত, ভুক্তভোগী সুরক্ষা ও সাক্ষী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রকৃত হিজড়া সম্প্রদায়ের সুরক্ষা ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জোরদার করার দাবি উঠেছে।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন (বিএইচআরএফ)-এর মহাসচিব, কলামিস্ট ও অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, “জোর করে অঙ্গহানি করে মানুষের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রয়োজন।”













