মাকসুদ আহম্মদ, বিশেষ প্রতিবেদক»
২০২৪ সালে বিশ্বের দীর্ঘতম ১২০ কিলোমিটার সমুদ্র সৈকতের নগরী কক্সবাজার যাবে ট্রেন। ট্যুরিষ্ট কোচে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পর্যটকরা যাবে সমুদ্র সিটি কক্সবাজার। এরপর ট্রেন যাবে মায়ানমার ও বান্দবানের নাইক্ষ্যাংছড়ির গুনদুম। ১৩০ বছর আগের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে বঙ্গবন্ধু কন্যার হস্তক্ষেপে। সর্বপ্রথম ১৮৯০ সালে বার্মা (মায়ানমার) রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম হতে রামু ও কক্সবাজার হয়ে মায়ানমার পর্যন্ত রেলওয়ে লাইন নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয়।
ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের জন্য প্রথম সার্ভে ১৩০ বছর আগে করা হলেও দ্বিতীয় সার্ভে করা হয়েছিল প্রায় ১০০ বছর আগে। ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার রেল লাইন স্থাপনের জন্য অবকাঠামো নির্মাণের প্রায় ৪৭ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। ১৮ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত শতভাগ সম্পন্ন হবে এমন ধারণা থাকলেও তা পিছিয়ে গেছে। করোনাকালীন দুই মাস কাজ বন্ধ রাখাসহ পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণের সময় বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হচ্ছে বলে জানালেন প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মফিজুর রহমান।

প্রকল্প পরিচালকের দফতর সূত্রে জানা গেছে, বার্মা(মায়ানমার) রেলওয়ে ১৮৯০ সালে চট্টগ্রাম থেকে ট্রেন কক্সবাজার হয়ে মায়ানমারের গুনদুম পৌছানোর জন্য প্রথম ফিজিক্যাল সার্ভে করা হয়। ১৯০৮-১৯০৯ সালে পূর্ণাঙ্গ সার্ভে করে বার্মা রেলওয়ে। পরবর্তীতে চট্টগ্রামের সাথে আকিয়াবের (মায়ানমার) রেল যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে দোহাজারী হতে রামু হয়ে আকিয়াব পর্যন্ত ১৯১৭ হতে ১৯১৯ সালে পুনরায় সার্ভে করা হয়। মায়ানমার পর্যন্ত রেল লাইন চালু করতেই চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত মিটার গেজ রেল লাইন স্থাপন করা হয়। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত রেল লাইন নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। ১৯৫৮ সালে পূর্ব বাংলা রেলওয়ে চট্টগ্রামের দক্ষিন দিক থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেল লাইন সম্প্রসারণের জন্য সার্ভে করে। এই সার্ভের মূল উদ্দেশ্য ছিল চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলওয়ে সংযোগ স্থাপন করা। কিন্তু পদক্ষেপের অভাবে পর্যটন শিল্পের এই ধাপটি বাস্তবায়ন হয়নি।
এদিকে, জাপান রেলওয়ে টেকনিক্যাল সার্ভিস (জেআরটিএস) কর্তৃক ১৯৭১ সালে রেলওয়ে লাইনটির ট্রাফিক সম্ভাবনা যাচাইয়ের জন্য সম্ভাব্য সমীক্ষা পরিচালনা করে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে জাপানের জেআরটিএস ১৯৭৬-১৯৭৭ সালে ডাটা সংগ্রহের কাজ সম্পন্ন করে। ১৯৯২ সালের এপ্রিলে ইকোনমিক এন্ড স্যোসাল কমিশন ফর এমিয়া এন্ড দ্যা প্যাসিফিক (ইএসসিএপি) কমিশন অধিবেশনে সম্মতি প্রাপ্ত “এশিয়ান ল্যান্ড ট্রান্সপোর্ট ইনফ্রাস্ট্র্যাকচার ডেভেলপমেন্ট (আলটিড)” শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় সম্পাদিত সমীক্ষায় ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে (টিএআর) নেটওয়ার্কের তিনটি ইউরোপ-এশিয়া সংযোগ রোডের মধ্যে সাউদার্ন কোরিডোর অন্যতম রুট হিসেবে চিহ্নিত হয়। ১৯৯৫ সালে ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের জন্য সাউদার্ন কোরিডোর-১ এর উপর প্রাথমিক স্টাডি পরিচালনা করা হয়।

অপরদিকে, পরবর্তীতে দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হতে মায়ানমার সীমান্তের নিকটে গুনদুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন মিটারগেজ ট্র্যাক নির্মানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় মোট এক হাজার ৮৫২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এরমধ্যে সরকারী অর্থায়ন (জিওবি) ৬৭০ কোটি ৭ লাখ এবং প্রকল্প সাহায্য ১ হাজার ১৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ২০১০ সালের জুলাই মাসে। ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য ২০১০ সালের ৬ জুলাই একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা হতে অর্থায়নের বিষয়টি নিশ্চিত না হওয়ায় প্রকল্পের বাস্তবায়ন কার্যক্রম বিলম্বিত হতে থাকে। ২০১৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তারিখে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হতে মায়ানমারের নিকটে গুনদুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন মিটারগেজের পরিবর্তে ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণের নির্দেশনা প্রদান করা হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তরফ থেকে।
২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেলপথ মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হতে মায়ানমারের নিকটে গুনদুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ ট্র্যাক নির্মাণ এবং নতুন রেললাইন নির্মাণের ক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণের সময় ভবিষ্যতে ডাবল লাইন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমির সংস্থান রেখে ভূমি অধিগ্রহন করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়। সে অনুযায়ী পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রদত্ত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এডিবি কর্তৃক ২০১৬ সালের ৩১ জানুয়ারী থেকে ২০১৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত সময়ে অনুষ্ঠিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রকল্পে সংশোধিত প্রাক্কলন নির্ধারণ করা হয়।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী মফিজুর রহমান বাংলাধারা প্রতিবেদককে বলেন, দ্রুত গতিতে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে বঙ্গবন্ধু কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায়। ১৩০ বছর আগের পরিকল্পনা বাস্তুবায়ন হচ্ছে মাত্র ১০ বছরের অভিজ্ঞতায়। প্রকল্পের প্রায় ৬১ ভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে। ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে শতভাগ কাজ সম্পন্ন করেই ট্রেন চলাচল শুরু হবে।
বাংলাধারা/এফএস/এফএস












