২৬ মার্চ ২০২৬

১৪ বছর ধরে বৈধ স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ

মাকসুদ আহম্মদ, বিশেষ প্রতিবেদক»

চট্টগ্রামের ফতেয়াবাদে আবাসিক স্থাপনা নির্মাণ অনুমোদন বন্ধ প্রায় ১৪ বছর। এতে বেকায়দায় ভূমি মালিকরা। শহরের মধ্যে ছোট্ট শহর করা হবে হাটহাজারীর ফতেয়াবাদকে এমন প্রচেষ্টা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের। উপশহর হবে হাটহাজারী। আরো কতো স্বপ্নের বুলি দিয়ে আটকে রেখেছে উন্নয়ন। স্বপ্নমুখী ও আকাশচুম্বি প্রকল্পের দোহাই দিয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) হাটহাজারীর ফতেয়াবাদবাসিকে স্থাপনা নির্মাণে বাধা দিয়ে রেখেছে । দীর্ঘ প্রায় ১৪ বছর ধরে নক্সা অনুমোদন না পেয়ে এলাকার প্রায় ৫ হাজার পরিবার অবৈধ স্থাপনা গড়তে বাধ্য হয়েছে। মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু না পেয়ে অনেকে পরিবার পরিজন নিয়ে চট্টগ্রাম শহরে ভাড়া বাসায় থাকতে বাধ্য হচ্ছে।

জানা গেছে, চউকের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা ওই এলাকার জনগণকে কোনঠাসা করে রেখেছে। অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের পরামর্শ দেয়ার মত অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর এবং ২০১৬ সালের ৯ জানুয়ারী শনিবার ফতেয়াবাদ কলেজ সড়ক এলাকায় মানববন্ধন করাসহ প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছে আতঙ্কগ্রস্থ ৫ হাজার পরিবারের সদস্যরা। সর্বশেষ গত ৮ নভেম্বর সোমবার চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে কমিটির পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, চউক এ প্রকল্পের অনুমোদন পায়নি দীর্ঘ ১৪ বছরেও। অথচ, প্রকল্পের বাজেট প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করে গণপূর্ত মন্ত্রনালয়ে প্রেরণ করেছে অনুমোদনের জন্য। প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে প্রকল্পই অনুমোদন পায়নি সেখানে বাজেট অনুমোদন নিয়ে চউক কেন পাঁয়তারা করছে। চউকের এ প্রকল্প অনুমোদন পেলে ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রায় সাড়ে ৫ হাজার একর জায়গা চউকের আওতায় চলে যাবার আশঙ্কা রয়েছে। চউকের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হলেও তা মৌজা রেট অনুযায়ী জমির মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা শতভাগ। যেখানে রয়েছে পুকুর, খাল, বিল ও উর্বর ধানি জমি। এসবকে মাড়িয়ে দিয়ে এবং পরিবেশগত ক্ষতি করে চউক প্রকল্প বাস্তবায়ন করার অপচেষ্টা করছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ১নং দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডে তথা ফতেয়াবাদে প্রায় ৫ হাজার পরিবারে ১ লাখ লোকের বসবাস। হত দরিদ্র থেকে শুরু করে বিত্তশালী পর্যন্ত সকলেই এখন রয়েছে ভূমি হারানোর আতঙ্কে। ২০০৭ সালে চউকের পক্ষ থেকে ‘ডেভেলপমেন্ট অব ফতেয়াবাদ নিউ টাউন’ নামের আবাসিক প্রকল্পের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এ প্রকল্পে ভূমির পরিমাণ প্রথম দফায় ছিল প্রায় ৪ হাজার ৭শ একর। দ্বিতীয় দফায় এ ভূমি ৭ হাজার একরে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে চউক। প্রথম পর্যায়ে ৩শ একর ভূমি অধিগ্রহণ করার প্রস্তাব রয়েছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে। ২০১৪ সালে আড়াই হাজার কোটি টাকা ডেভেলপমেন্ট প্রকিউরমেন্ট প্রজেক্ট (ডিপিপি) এর আওতায় বরাদ্দ চেয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে।

হাটহাজারী থানাধীন অথচ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সর্বপ্রথম ওয়ার্ড (১নং) এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, চউকের প্রস্তাবিত ভূমির প্রায় ৮০ শতাংশই ব্যক্তি মালিকানার। পাহাড় থেকে শুরু করে সমতল ভূমি পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৫ হাজার একর জায়গা ৫ হাজার পরিবারের মালিকানায় রয়েছে। প্রস্তাবিত ভূমির পশ্চিমে পাহাড়, পূর্বে চট্টগ্রাম-হাটহাজারী মহাসড়ক। দক্ষিণে চট্টগ্রাম সেনানিবাস ও উত্তরে রয়েছে প্রায় সাড়ে ১২শ একর জমির উপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। চট্টগ্রাম-হাটহাজারী মহাসড়কের বটতল বাজারের সীমানা থেকে শুরু করে প্রায় ৭ হাজার একর জায়গা প্রস্তাবিত নিউ টাউনের জন্য অধিগ্রহণ করতে চায় চউক।

অভিযোগ রয়েছে, আরএস, পিএস ও বিএস জরিপ অনুযায়ী এলাকাবাসি প্রতি বছরের চৈত্র-বৈশাখে খাজনা পরিশোধ করেন। গত ২০০৭ সাল থেকে চউকে এলাকাবাসির অনেকেই ভূমি উন্নয়নের জন্য স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি চেয়ে নক্সা অনুমোদনের আবেদন করা হয়। কিন্তু চউক তাতে প্রকল্পের দোহাই দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। বন্ধ রেখেছে ভূমি উন্নয়নে স্থাপনা নির্মাণে নক্সা অনুমোদন। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এলাকাবাসি। কারণ, চউকের প্রতিবন্ধকতার কারণে এলাকার হত দরিদ্র পরিবারগুলোর মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু হারানোর আশঙ্কা রয়েছে, তেমনি বিত্তশালীরাও সেমিপাকা ঘর করে মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করেছে। এরপরও এলাকায় প্রায় তিন শতাধিক স্থাপনা রয়েছে দ্বিতল থেকে পাঁচতলা পর্যন্ত। কোটি কোটি টাকা খরচে স্থাপনা নির্মাণ করলেও বৈধতা পাচ্ছেনা চউকের সিদ্ধান্তহীনতায়।

চউকের পক্ষ থেকে জানা গেছে, প্রকল্পটি ২০০৭সালে গ্রহণ করা হলেও ২০১৪ সালে প্রকল্পের বাজেট প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকার। ডিপিপির আওতায় এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রায় তিনশ একর ভূমি নিয়ে প্রথম পর্যায়ে কাজ শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় চউকের অনুমোদিত আবাসন প্রকল্প ১৮টি। ব্যক্তি মালিকানাধীন এবং সরকারি মালিকানায় এসব প্রকল্প চউকের পক্ষ থেকে অনুমোদিত। তবে এ পর্যন্ত ব্যাক্তি মালিকানাধীন চারটি প্রকল্পের অনুমোদন দেয়নি চউক। এরমধ্যে একটি প্রকল্পের মালিক পক্ষ উচ্চ আদালতে চউকের বিরুদ্ধে রীট মামলা দায়ের করেছে।

এ ব্যাপারে চউকের এক প্রকৌশলী জানিয়েছেন, প্রকল্পের অনুমোদন যেহেতু হয়নি সেহেতু নক্সা অনুমোদন বন্ধ রাখা যৌক্তিক নয়। ব্যক্তি মালিকানাধীন ভূমিতে মালিকদের অস্মতি থাকলে সরকারি দাফতরিক স্থাপনা নির্মান সম্ভব ভূমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে। কিন্তু আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার কোন বিধান নেই।

এ ব্যাপারে ফতেয়াবাদ বসতভিটা রক্ষা কমিটির সদস্য গাজী মঈনউদ্দিন বাংলাধারাকে বলেন, ফতেয়াবাদকে উন্নয়ন বিমুখ করে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। ২০১৫ সালের ১২ নবেম্বর এবং ২০১৬ সালের ৯ জানুয়ারী চউকের এ আবাসন প্রকল্প বন্ধের দাবিতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রেরণ করা হয়েছে কমিটির পক্ষ থেকে। অল্প কয়েকদিনের মধ্যে আবারো প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনায় মানববন্ধনের আয়োজন করা হচ্ছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এলাকার মানুষ ভিটেমাটি হারা হবে। পুনরায় বাস্তবায়িত প্রকল্প বরাদ্দ নিয়ে অন্য এলাকার বিত্তশালীরা এ এলাকায় মাথা গোঁজার ঠাই পাবে। এছাড়াও ব্যক্তি মালিকানাধীন এসব জায়গার খাজনাও বকেয়া নেই সরকারের কাছে। তবুও কেন অননুমোদিত প্রকল্পের দোহাই দিয়ে ভূমি অধিগ্রহণের পাঁয়তারা চলছে তা রহস্যজনক।

বাংলাধারা/এফএস/এফএস

আরও পড়ুন