চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে টানা ষষ্ঠ দিনেও অচলাবস্থা কাটেনি। শিক্ষার্থীদের সর্বাত্মক শাটডাউন, ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন এবং শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পূর্ণ কর্মবিরতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। সংকট নিরসনে অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
রোববার সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে অবস্থান ও সর্বাত্মক শাটডাউনের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এতে ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত উপাচার্য ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে কর্মবিরতি পালন করেন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
দুপুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে ‘৫৬?’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে প্রতীকী প্রশ্নযাত্রা বের করেন শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি স্বাধীনতা চত্বর প্রদক্ষিণ করে আবার শহীদ মিনারে ফিরে আসে। মাত্র ৫৬ দিনের দায়িত্ব পালনের পর অধ্যাপক সায়েমকে কেন উপাচার্যের পদ থেকে সরানো হলো— প্রশ্নযাত্রার মাধ্যমে সেই প্রশ্নই সামনে আনেন তাঁরা।
পরে শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত হয় পথনাট্য ও ‘৫৬ কর্নার’ কর্মসূচি। ‘৫৬ কর্নারে’ অধ্যাপক সায়েমের দায়িত্বকালে শিক্ষা, গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন শিক্ষার্থীরা। পথনাট্যে উপাচার্য পরিবর্তন ও নতুন উপাচার্যের অনলাইনে যোগদানের ঘটনাও ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করা হয়।
বিকেল ৪টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর অধ্যাপক সায়েম আন্তর্জাতিক কোলাবোরেশন অফিস, রিসার্চ হাব, বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি, ল্যাঙ্গুয়েজ সেন্টার, বিদেশি শিক্ষক ও গবেষকদের অ্যাডজাংক্ট ফ্যাকাল্টি হিসেবে যুক্ত করা এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এসব উদ্যোগের কার্যকর মূল্যায়নের জন্য তাঁকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।
শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’ চুয়েট পরিবারের উদ্বেগ, দেশ-বিদেশের অ্যালামনাইদের সংহতি এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক মহলের সমর্থন বিবেচনায় নিয়ে উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান তাঁরা।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলেন, তাঁদের কর্মসূচি কোনো সরকারবিরোধী আন্দোলন নয় এবং নতুন উপাচার্যের বিরুদ্ধেও ব্যক্তিগত কোনো অবস্থান নেই। তাঁদের একমাত্র দাবি অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহাল করা। ২১ সেপ্টেম্বর উপাচার্য পরিবর্তনের প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকে বিক্ষোভ, শাটডাউন, গণস্বাক্ষর, মানববন্ধন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি, স্মারকলিপি, মশাল মিছিল, রেড কার্ড প্রদর্শন ও প্রতিবাদী গ্রাফিতিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন তাঁরা।
শিক্ষার্থীদের দাবি, তাঁদের আন্দোলনের প্রতি চুয়েট অ্যালামনাই ইউএসএ, জার্মানি, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও ইটিপি মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন অ্যালামনাই চ্যাপ্টার সংহতি জানিয়েছে। পাশাপাশি পাঁচ দেশের ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ জন শিক্ষক অধ্যাপক সায়েমের সমর্থনে বিবৃতি দিয়েছেন বলেও জানান তাঁরা।
শিক্ষক প্রতিনিধি সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ মাসরুর আহম্মদ বলেন, অচলাবস্থার কারণে শিক্ষকরা মানসিক চাপে রয়েছেন এবং শিক্ষার্থীরা একাডেমিকভাবে পিছিয়ে পড়ছেন। সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও একাডেমিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। চুয়েট স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়োতোষ চক্রবর্তী বলেন, অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত তাঁদের কর্মবিরতি চলবে।
এদিকে নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম বলেছেন, অনলাইনে প্রাথমিক দায়িত্ব গ্রহণ কোনো দূরত্ব বজায় রাখার উদ্যোগ ছিল না; প্রশাসনিক শূন্যতা নিরসন এবং চুয়েটের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কাঠামোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই এটি ছিল প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি প্রয়োজনীয়তা। খুব শিগগিরই তিনি সশরীরে ক্যাম্পাসে উপস্থিত হয়ে আন্দোলনরত ও সংক্ষুব্ধ সব পক্ষের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসার কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘নিঃশর্ত সংলাপ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই যেকোনো সংকটের সবচেয়ে শক্তিশালী সমাধান।’ আন্দোলনরত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে অনতিবিলম্বে সরাসরি ও খোলামেলা আলোচনায় বসা তাঁর প্রশাসনিক অগ্রাধিকার হবে বলেও জানান তিনি। যুক্তিসঙ্গত দাবিগুলোর দ্রুত, বাস্তবমুখী ও টেকসই সমাধানের মাধ্যমে ক্লাসরুম ও ল্যাবরেটরিতে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই তাঁর মূল লক্ষ্য।
নবনিযুক্ত উপাচার্য আরও বলেন, চুয়েটেরই একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি তাঁর গভীর অনুভূতি ও দায়বদ্ধতা রয়েছে। পারস্পরিক সম্মান, ন্যায়সংগত অধিকার ও মেধার সমন্বয়ে চুয়েটের বর্তমান অচলাবস্থা দূর হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
টানা ছয় দিনের আন্দোলনে চুয়েটের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা সায়েমকে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত শাটডাউন এবং শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মবিরতি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে দ্রুত সমাধান না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।














