মাকসুদ আহমদ, বিশেষ প্রতিবেদক »
বৈশাখ আসছে। বৈশাখের আগমনি বার্তাকে ঘিরেই তিন পার্বত্যাঞ্চলে শুরু হয়েছে বৈসাবী উৎসব। এ বৈসাবী উৎসবের একটি অংশ হচ্ছে জলকেলি খেলা। পাহাড়িদের অকৃত্রিম এ উৎসব দেখতে শহর থেকে পাহাড়ে ছুটে যেতে হয় প্রতিবছর। পুরাতন বছরকে বিদায় আর বাংলা নববর্ষকে বরণ করতে এবং অতীতের গ্লানি মুছে দিতে এ জলকেলি খেলা খেলে পাহাড়িরা। তরুন তরুণীরাই হলো এ আয়োজনের অন্যতম উপসর্গ। বিশেষ করে পাহাড়ি মেয়ে এবং ছেলেদের মধ্যে যারা একটু চটপটে ও আনন্দ উৎসবে মেতে উঠতে আগ্রহী তাদের মধ্যেই এ ধরনের উৎসাহ জেগে ওঠে। এ উৎসাহের বহির্প্রকাশ চলে জলকেলির মাধ্যমে।
জানা গেছে, খাগড়াছড়ির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কুতিক ইনিস্টিটিউট’র পক্ষ থেকে গত ৭ এপ্রিল বৈসাবি মেলার উদ্বোধন করা হয়। এসময় চলে সাংস্কুতিক অনুষ্ঠান। শুক্রবার শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে শুরু হয় ৮ এপ্রিলের কার্যক্রম। বিকেল ৫টায় মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পানি খেলার আয়োজন হয়। আজ ৯ এপ্রিল এই প্রাঙ্গণে শুরু হবে পাজন রান্না প্রতিযোগিতা। এছাড়া ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী গড়াইয়া নৃত্য আজকের মূল আকর্ষণ। কাল ১০ এপ্রিল গত ৩ দিনে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া বিজয়ী সাংস্কৃতিক শিল্পীদের পুরষ্কার বিতরণ করা হবে।
আগামী ১৩ এপ্রিল চৈত্রের বিদায় লগ্নে জলকেলী খেলার আয়োজন করা হবে তিন পার্বত্য জেলায়। আর ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ ১৪২৯ এর প্রথম দিন, অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ। পুরনো স্মৃতি ভুলে গিয়ে নতুনের কুশল বিনিময়ের মধ্য দিয়ে শুরু হবে প্রতিবছরের ন্যায় এ বছরের বর্ষবরণ। বাংলা বছরের প্রথম মাসেই আসে বৌদ্ধ পূর্ণিমা। বৌদ্ধ পূর্ণিমার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এ ধর্মাবলম্বীরা এগিয়ে চলে। বাংলাদেশ রাখাইন স্টুডেন্টস এসোসিয়েসন চট্টগ্রাম শাখার উদ্যোগে ১০ এপ্রিল আয়োজন করা হবে রাখাইন নববর্ষ ১৩৮৪। মাহা সাংরেং পোয়ে নামের এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় এদিনে।

তিন পার্বত্য এলাকায় ভিন্ন চিত্র। তবে পাহাড়ী আমেজ সম্পূর্ণ ভিন্ন। পার্বত্য এলাকায় বিশেষ করে নদীর ধারে দুটি নৌকায় ছড়ে টিনেজ তরুণ তরুণীরা একে অপরের গায়ে পানি মেরে জলকেলি খেলায় মেতে উঠে। কিন্তু শহুরে হওয়ায় জলকেলি খেলার জন্য ড্রাম ভর্তি পানি আর হাতে মগ নিয়ে প্রস্তুত টিনেজরা। খেলার শুরুতেই উভয়ের মধ্যে ভাব বিনিময় হয়েছে। শেষ হয়েছে পরিচয়ের পালা। তরুণ-তরুণীরা একে অপরের গায়ে পানি মেরে আনন্দের সূচনা করে। একপর্যায়ে শেষলগ্নে এসে তা পরিপূর্ণ বর্ষায় কাকভেজা অবস্থায় পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ তরুণ তরুণীদের উভয় পক্ষই জলকেলি খেলায় গা ভিজিয়েছে একে-অপরের।
এদিকে, ২০১৫ সালেই প্রথম এ আয়োজন হয়েছিলো চট্টগ্রাম নগরীতেই। পাহাড়ী তরুণ তরুণীদের জলকেলি খেলা জমে উঠেছিল শহরের মাঝে। শত বছরের হিসেবে নেই এ আয়োজন শহুরে হওয়ার। প্রথমবারের মত রঙিন কাপড়ে নন্দিত হয়ে জলকেলি খেলায় অংশ নিয়েছিল আদিবাসি তরুণ তরুণীরা।

নগরীর প্রাণকেন্দ্রে এ আয়োজন প্রথমবারের মত করা হলেও বুঝে ওঠার উপায় ছিল না। তিন পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসিদের সমন্বয়ে টিনেজ তরুণ-তরুণীদের এ আয়োজন আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল নগরীর কাতালগঞ্জস্থ চট্টগ্রাম নবপণ্ডিত বিহারে। বাংলাদেশ রাখাইন স্টুডেন্টস এসোসিয়েসনের উদ্যোগে ২০১৫ সালের ১০ এপ্রিল শুক্রবার বিকেলে এ আয়োজনের উদ্বোধন করেছিলেন নবপন্ডিত বিহারের তৎকালীন আধ্যক্ষ ও সভাপতি অধ্যাপক উপানন্দ মহাথের।
চট্টগ্রামস্থ নবপণ্ডিত বিহার সূত্রে জানা গেছে, বাংলা নববর্ষ তথা বুদ্ধাব্ধ নববর্ষ শুভাগমনে সবাইকে আনন্দের ভাগাভাগি করার জন্যই এ ধরনের আয়োজন চলে। বাংলা বছর যেন বাঙালি জাতি সত্বার শেকড়। বুদ্ধাব্ধ সন বৌদ্ধ দর্শনে সংস্কৃতির শেকড়। প্রাচীন ঐতিহ্যের এ বর্ষবরণ শত শত বছর ধরে চলে আসছে। যদিও এ আয়োজন পাহাড়িদের মধ্যে হয়ে থাকে। কিন্তু আদিবাসিদের অবস্থান এখন বিভিন্ন শহরমুখী হওয়ায় বৌদ্ধদের এ বিশাল আয়োজনটি এবার শহরের প্রাণকেন্দ্রেই করা হয় শুধুমাত্র শহুরে টিনেজদের আয়োজনে।












