২৩ মার্চ ২০২৬

গ্রাম পুলিশকে পেটানোর পর হত্যার হুমকি, বিএনপি সভাপতির বিরুদ্ধে জিডি

জেলা প্রতিনিধি, কক্সবাজার»

কক্সবাজারের রামুতে এক গ্রাম পুলিশকে (চৌকিদার) বেধড়ক পিটিয়েছে উপজেলা বিএনপির সভাপতি। দু’দফা মারধরের পাশাপাশি পরবর্তীতে প্রাণে মারার হুমকি দেয়ায় নিরাপত্তাহীনতার কথা উল্লেখ করে রামু থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ সদস্য ফরিদুল আলম (৪৫)। তিনি দক্ষিণ মিঠাছড়ির চেইন্দা কাইম্যারঘোনা এলাকার মৃত ফজল আহম্মদের ছেলে।

১৪ এপ্রিল জিডি (৫৭২/২০২২) লিপিবদ্ধ হবার পর ১৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় কাইম্যারঘোনা এলাকায় প্রধান সড়ক দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তাকে আবারও চড়-থাপ্পড় দেয়ার পর পুনরায় মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। এ বিষয়টি থানার ওসিকে জানানো হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন ফরিদ।

অভিযুক্ত মোকতার আহমেদ (৫৫) দক্ষিণ মিঠাছড়ির চেইন্দা কাইম্যারঘোনা এলাকার মৃত আফজল আহমদের ছেলে। তিনি উপজেলা বিএনপি সভাপতির দায়িত্বপালন করছেন

গ্রাম পুলিশ সদস্য ফরিদুল আলম তার জিডিতে উল্লেখ করেন, মোকতার আহমেদের দু’ছেলে যুবদল নেতা জাবেদ ইকবাল ও আবছার কামালের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, জমি দখল, মারামারিসহ একাধিক মামলার আসামী। তাদের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি (ওয়ারেন্ট) করেছেন। সেই সূত্রে প্রায় রাতে তাদের গ্রেফতারে পুলিশ অভিযুক্ত মোকতারের বাসায় হানা দেয়। স্থানীয় গ্রাম পুলিশ হিসেবে অভিযান চালানো থানা পুলিশ টিমকে সহযোগিতা করা আমার পেশাগত দায়িত্ব।

ফরিদুল আলম বলেন, শৃংখলা বাহিনীকে সহযোগিতা করায় মোকতার আমার উপর ক্ষিপ্ত। গত ১৪ এপ্রিল বিকেলে সাদেরপাড়া বাজারে জনৈক নুরুল ইসলামের দোকানে ইফতার সামগ্রী কিনতে গেলে মুখোমুখি হয় মোক্তার আহম্মদের। বার বার পুলিশ আসায় ক্ষিপ্ত হয়ে অকস্মাৎ প্রকাশ্যে বেধড়ক মারধর শুরু করে আমায়। প্রহার শেষে হত্যারও হুমকি দেন। রিবারের লোকজনকে গুম করারও হুমকি দেন মোকতার আহমেদ।

চৌকিদার ফরিদ জানান, এর দুই দিন পর ১৬ এপ্রিল (শনিবার) বিকেলে একই এলাকা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় রাস্তা গতিরোধ করে ফের চড় থাপ্পড় দিয়ে পুনরায় হত্যার হুমকি দেয়। আবার যদি তার বাড়িতে পুলিশ আসে তাহলে আমার বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হবে বলে হুশিয়ারী দিয়েছেন তিনি।

স্থানীয় একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলে, ’৮০ দশকে এরশাদ আমলে সরকার দলীয় (জাতীয় পার্টি) চৌধুরী নামে এক গুষ্ঠির লাঠিয়াল হয়ে কাজ করতেন মোকতার আহমেদের পরিবার। এরশাদ শাসন আমলের একনায়কতন্ত্রের স্থানীয় নেতাদের লুটতরাজে সেই সময়ের তরুণ মোকতার আহমেদ নেতৃত্ব দিয়ে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতেন। দখল, লুট, নারীদের নিপীড়ন, উচ্ছেদ সবকিছুতেই তাদের লাঠিয়ালিপনায় এলাকায় মোকতার বললেই ভয়ে কুঁকড়ে থাকতেন সবাই। এরশাদের শাসন পতনের পর ধীরে ধীরে সেই চৌধুরীদেরও জৌলুস ফুরিয়ে যায়। কিন্তু মোকতার আহমেদ নিজের ‘ভীতি সঞ্চার করা রূপ’ ধরে রাখতে ভোল পাল্টে হয়ে যান বিএনপি নেতা। হন জনপ্রতিনিধিও। ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকায় এরশাদ আমলের সেই চিরচেনা রূপ তিনি সবসময় ধরে রাখেন। বাবার চরিত্র রপ্ত করেন দু’সন্তান জাবেদ ও আবছার। বিগত সময়ে বিএনপি ঘরানার লোকজন চেয়ারম্যান-মেম্বার হওয়ায় তারাও এলাকায় দখল, লুটতরাজ ও চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু ২০১৬ সালে আওয়ামী লীগ নেতা ভুট্টো চেয়ারম্যান হবার পর একটু আড়ালে চলে যান পিতা মোকতার এবং ছেলে জাবেদ ও আবছার। তবে, সদ্য সমাপ্ত ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান হওয়া নৌকার প্রার্থী এরশাদ আমলের চৌধুরী পরিবারের বউ হওয়ায় আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছেন চৌধুরী পরিবারের এক সময়ের লাঠিয়াল মোকতার আহমেদ ও তার সন্তানরা। তারা অন্যের জমি দখল, পাহাড় ও বিলের মাটি বিক্রিসহ চৌকিদার পিটিয়ে এলাকায় সন্ত্রাসী কার্যকলাপের মাধ্যমে ত্রাস সৃষ্টি করছেন। কেউ মামলা করতে গেলে চেয়ারম্যানকে দিয়ে তদবির করান। পরিবারের পুরোনো অনুগত হওয়ায় আওয়ামী লীগের প্রতীকের চেয়ারম্যান হলেও মাথা দিয়ে বিএনপির পরিবারের অপরাধ প্রশ্রয় দিয়ে ফোনে কিংবা স্বশরীরে তদবির করছেন। বিনিময়ে মোকতার ও তার ছেলেদের অনৈতিক আয়ের একটি অংশ চেয়ারম্যানের ছোট ছেলেকে ভাগ হিসেবে দেয়া হচ্ছে বলে প্রচার রয়েছে। এসব কারণে বেশ কয়েকটি মামলা থাকা সত্তেও এলাকায় তারা বীরদর্পে বিচরণ করছে।

তবে, অভিযোগ অস্বীকার করে মোকতার আহমেদ বলেন, গ্রাম পুলিশ ফরিদ আমার জায়গায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বসতি গড়েছিলেন। এখন উঠে যেতে বলায় উল্টো আমার সাথে বিবাদে জড়াচ্ছে। আমি ও আমার ছেলেরা সন্ত্রাসী নয়, বিএনপির রাজনীতি করি বলে মিথ্যা অভিযোগ দেয়া হচ্ছে।

তবে, ছেলেদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে মামলা ও ফরিদ পৈত্রিক বসতিতে বসবাস করার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি কোন উত্তর না দিয়ে লাইন কেটে দেন।

অভিযোগ সম্পর্কে জানতে দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউপি চেয়ারম্যান খোদেস্তা বেগম রীণার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। বার বার রিং হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। বক্তব্য জানতে খুদে বার্তা পাঠানো হলে, তারও উত্তর করেননি তিনি।
রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আনোয়ারুল হোসেন জানান, ফরিদুল আলম নামে এক গ্রাম পুলিশকে হত্যার হুমকির অভিযোগে একটি সাধারণ ডায়েরী করা হয়েছে। এ ব্যাপারে পুলিশ কাজ করছে। ঘটনার প্রমাণ পেলে কঠোর আইনী ব্যবস্থা নেয়া হব।

আরও পড়ুন