৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

প্রকৃতির বাধা জয় করে সীমান্তবর্তী পাহাড়ভাঙ্গা পাড়ায় নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

গহীন পাহাড়, দুর্গম পথ আর পাহাড়ি ঝিরির প্রবল স্রোত কোনো বাধাই মানবিক দায়িত্ব পালনে অন্তরায় হতে পারেনি। আলীকদম জোনের সেনা সদস্যরা পায়ে হেঁটে পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে, ঝিরির ভেতর দিয়ে কোমরসমান পানিতে হেঁটে পৌঁছান মায়ানমার সীমান্তবর্তী পাহাড়ভাঙ্গা পাড়ায়।

সেখানেই মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় ‘সেনা মৈত্রী প্রাথমিক বিদ্যালয়’।

বিদ্যালয়টির শুভ উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বান্দরবান রিজিয়নের আওতাধীন আলীকদম জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোঃ আশিকুর রহমান আশিক, এসপিপি, পিএসসি। সেনাবাহিনীর কষ্টসাধ্য যাত্রা ও মানবিক উপস্থিতিতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষজন।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, আলীকদম উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক অর্থায়নে নির্মিত এই বিদ্যালয়টি সেনাবাহিনী ও বেসামরিক প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। দুর্গম পাহাড়ি জনপদে শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে পিছিয়ে পড়া শিশুদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে এই প্রতিষ্ঠান।

আলীকদম উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে এবং মায়ানমার সীমান্ত থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার ভেতরে অবস্থিত পাহাড়ভাঙ্গা পাড়া। ঝুঁকিপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতার কারণে ফাতরাপাড়া, মাসখুম পাড়া ও তরণী পাড়ার শিশুরা দীর্ঘদিন ধরে ন্যূনতম শিক্ষা সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল।

স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে আলীকদম জোন ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে এখানে ‘সেনা মৈত্রী প্রাথমিক বিদ্যালয়’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। উদ্বোধন শেষে শিক্ষার্থীদের মাঝে স্কুলব্যাগ, বেঞ্চ, পাঠ্যবই ও প্রয়োজনীয় স্টেশনারি সামগ্রী বিতরণ করা হয়।

শুধু শিক্ষা নয়, জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ মেডিকেল টিম দুই দিনব্যাপী ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করে। এতে ৯৫ জন পুরুষ, ১৭৫ জন নারী ও ৪৫ জন শিশুসহ মোট ৩১৫ জন স্থানীয় বাসিন্দাকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রদান করা হয়। পাশাপাশি শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষায় ১১৩টি পরিবারের মাঝে কম্বল বিতরণ এবং আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়।

অনুষ্ঠানে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোঃ আশিকুর রহমান আশিক বলেন, দুর্গম পথ কিংবা প্রাকৃতিক বাধা কখনোই মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে অন্তরায় হতে পারে না। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনমান উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় নির্মিত এই বিদ্যালয় দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিশুদের জন্য আশার আলো হয়ে উঠবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলম, মেজর মোঃ পাভেল মাহমুদ রাসেল, বিএসপি, আলীকদম জোনের জোনাল স্টাফ অফিসার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ আলী তাওহীদ এবং লামা সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোঃ মাসুম সরদার।

এছাড়া কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, স্থানীয় কার্বারি, জনপ্রতিনিধি এবং প্রায় পাঁচ শতাধিক স্থানীয় বাসিন্দা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিকূল প্রকৃতি, ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত বাস্তবতা ও কষ্টসাধ্য যোগাযোগ ব্যবস্থার মুখোমুখি হয়েও সেনাবাহিনী মানবিক দায়িত্ব থেকে কখনো পিছপা হয়নি।

পাহাড়ি ঝিরির স্রোত পেরিয়ে বিদ্যালয় উদ্বোধনে পৌঁছানো স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

সেনাবাহিনী ও উপজেলা প্রশাসনের এই মানবিক ও সমন্বিত উদ্যোগে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠী। তাঁদের মতে, ‘সেনা মৈত্রী প্রাথমিক বিদ্যালয়’ শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয় এটি দুর্গম পাহাড়ি জনপদে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের একটি শক্ত ভিত্তি হয়ে থাকবে।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ