৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ভোটের মাঠেও অপ্রতিরোধ্য গিয়াস কাদের, প্রচারণায় পিছিয়ে নেই নূরী ও মঞ্জু

রাউজান নামটি ব্রিটিশ শাসনামল থেকে নানা কারণে বহুল আলোচিত। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ সূর্যসেনের জন্মস্থানের পাশাপাশি তদানীন্তন পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও স্পিকার মরহুম ফজলুল কাদের চৌধুরীর জন্মস্থান এবং নির্বাচনী এলাকাও এটি। এছাড়া এই রাউজান থেকেই স্বাধীনতা-পরবর্তী অনেক জাতীয় রাজনীতিবিদের উত্থান ঘটে, যারা বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে দাপটের সঙ্গে রাজনীতি করার পাশাপাশি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনীতিতেও ব্যাপক প্রভাব রেখেছিলেন।

৫ আগস্ট পরবর্তীতে নানা ঘটনাপ্রবাহের কারণে রাউজান নামটি দেশের মানুষের কাছে আরও অধিক পরিচিতি পায়। বিএনপির দুই গ্রুপের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হামলা, সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। শুধু তাই নয়, বিএনপির মনোনয়ন প্রাপ্তিকে কেন্দ্র করে নানা নাটকীয় ঘটনা রাউজানকে নিয়ে আলোচনার খোরাক যোগায় বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতি ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনীতিতে।

ভোটের রাজনীতিতেও আলোচনায় পিছিয়ে নেই রাউজান উপজেলা। এই আসনে মোট প্রার্থী চারজন। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী সাবেক এমপি গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের জামায়াতের শাহজাহান মঞ্জু, সুন্নি জোট সমর্থিত ইসলামী ফ্রন্টের মোমবাতি প্রতীকের অধ্যক্ষ আল্লামা মো. ইলিয়াস নূরী এবং মাথাল প্রতীক নিয়ে গণসংহতির নাসির উদ্দিন তালুকদার। নির্বাচনী প্রচারণায় প্রায় সকল প্রার্থী সন্ত্রাস নির্মূল ও উন্নয়নের পাশাপাশি রাউজানের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে দিতে হয় মনোনয়ন পরীক্ষা। দেশজুড়ে বহুল আলোচিত এই পরীক্ষায় বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী দুই নেতা বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও রাউজান-রাঙ্গুনিয়ার সাবেক সংসদ সদস্য এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খন্দকারের মধ্যে নাটকীয় ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন গিয়াস কাদের চৌধুরী, যা ছিল “টক অব দ্য কান্ট্রি”।

রাউজান উপজেলার বিভিন্ন এলাকার জনসাধারণের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মনোনয়ন পরীক্ষার ন্যায় ভোটের মাঠেও অপ্রতিরোধ্য বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী গিয়াস কাদের। পারিবারিক ঐতিহ্য, ব্যাপক জনসমর্থন, সাংগঠনিক দক্ষতা ও সাবেক এমপি হওয়ার সুবাদে সমগ্র রাউজানজুড়ে গিয়াস কাদেরের রয়েছে বিশাল কর্মীবাহিনী।

দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্তির পর থেকেই এই বিশাল কর্মীবাহিনী নিয়ে সমগ্র রাউজানজুড়ে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নিজে উপস্থিত থেকে প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে উঠান বৈঠক ও সমাবেশ করেছেন গিয়াস কাদের। তালিকা করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন বিএনপির কর্মী-সমর্থকেরা।

উরকিরচর ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহরিয়ার বলেন,
“বিএনপির প্রার্থী ও সাবেক এমপি গিয়াস সাহেব আমাদের এলাকায় এসেছিলেন এবং ভোট প্রার্থনা করেছেন। ৫ আগস্টের পর তাঁর ১৩ জন কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। শান্তির রাউজান প্রতিষ্ঠা করতে হলে তাঁর বিকল্প নেই বলে আমি মনে করি। তাঁর নির্বাচনী বক্তব্যকে আমি ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি।”

রাউজান উপজেলা যুবদলের সভাপতি এম. শাহাজান সাহিল বলেন, “রাউজানের মানুষ ধানের শীষের প্রার্থী গিয়াস ভাইজানকে ভোট দিতে উন্মুখ হয়ে আছে। ইনশাআল্লাহ, ১২ ফেব্রুয়ারি ভাইজানকে বিপুল ভোটে জয়ী করে রাউজানের মানুষ সংসদে পাঠাবে।”

প্রচারণায় পিছিয়ে নেই জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শাহজাহান মঞ্জু। উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের ব্যানার ও ফেস্টুন ছিল চোখে পড়ার মতো। সদর ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “এই প্রথম রাউজানে দাঁড়িপাল্লার ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা দেখতে পেয়েছি। নির্বাচনে তারা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট পেতে পারে।”

সমগ্র রাউজান উপজেলাজুড়ে ধানের শীষের পাশাপাশি ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন মোমবাতি প্রতীকের ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী অধ্যক্ষ আল্লামা মো. ইলিয়াস নূরী। সাধারণ ভোটারদের ধারণা, নির্বাচনে গিয়াস কাদের চৌধুরীর জন্য “ভাইটাল ফ্যাক্টর” হতে পারে মোমবাতি প্রতীকের ইলিয়াস নূরী।

ইলিয়াস নূরীর সমর্থক ইরফান বিল্লাহ বলেন, “সুষ্ঠু নির্বাচন হলে মোমবাতির বিজয় কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।”

তবে “মাথাল” প্রতীক নিয়ে গণসংহতির প্রার্থী নাসির উদ্দিন তালুকদারের প্রচারণা তেমন একটা চোখে পড়েনি।

ভোটারদের মাঝে রয়েছে উৎসাহ, রয়েছে শঙ্কাও রাউজানে ভোটারদের মাঝে উৎসাহের পাশাপাশি রয়েছে কিছুটা শঙ্কাও।

কলেজছাত্রী সুপ্রিয়া চৌধুরী বলেন, “এই প্রথম ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে যাব। এ নিয়ে মনের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ কাজ করছে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিয়ে বাড়ি ফিরতে পারব বলে আশা করছি।”

স্কুলশিক্ষক পরিমল আচার্য বলেন, “এখন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে রাউজানে। ভোটের দিন যেন সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় থাকে, সে ব্যাপারে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”

রাউজান উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, “শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে রাউজানে ভোটগ্রহণের জন্য প্রশাসন ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে এবং সে অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছে। সেনাবাহিনী ও পুলিশের নিয়মিত টহলের পাশাপাশি রাউজানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নির্বাচনের দিন বিশেষ স্ট্রাইকিং ফোর্সও কাজ করবে।”

উল্লেখ্য, ১৪টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা (যেখানে রয়েছে ৯টি ওয়ার্ড) নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৬ রাউজান আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩,৩৯,৯৮৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১,৭৮,৯৭১ জন এবং নারী ভোটার ১,৬১,০৬৭ জন। এই আসনে ভোটকেন্দ্র ৯৫টি এবং ভোটকক্ষ রয়েছে ৬৩৯টি।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ