১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

চট্টগ্রামে সিটি ব্যাংক কর্মকর্তার কারসাজিতে গ্রাহকের প্রায় ১২ কোটি টাকা আত্মসাৎ

চট্টগ্রামে সিটি ব্যাংক পিএলসির আগ্রাবাদ কর্পোরেট ডিভিশনে এক চাঞ্চল্যকর আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছে। গ্রাহকের প্রায় ১১ কোটি ৮৪ লাখ ১০ হাজার ৯০০ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় ব্যাংকের এক সিনিয়র কর্মকর্তাসহ মোট চারজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়। দীর্ঘ প্রায় তিন বছর ধরে পরিকল্পিতভাবে এই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুদক সূত্র জানায়, অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন ব্যাংকের সিনিয়র কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম। তাঁর সঙ্গে আরও তিনজন ব্যক্তি যোগসাজশে এই অর্থ আত্মসাতে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম দুদকের সহকারী পরিচালক সুবেল আহমেদ।

জাল কাগজপত্র, এফডিআর ও ট্রান্সফারের মাধ্যমে অর্থ সরানো 

দুদকের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, আসামিরা পরস্পরের সহযোগিতায় চট্টগ্রামের স্বনামধন্য পোশাক তৈরি প্রতিষ্ঠান ফোর এইচ গ্রুপের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব থেকে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করেন। তারা ভুয়া ও জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে একাধিক এফডিআর (ফিক্সড ডিপোজিট রসিদ) তৈরি ও ভাঙানোর মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর করেন। পাশাপাশি ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে অর্থ নিজেদের বা স্বজনদের নামে বিভিন্ন হিসাবে সরিয়ে নেওয়া হয়।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল সুপরিকল্পিত। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে ধাপে ধাপে অর্থ সরানো হয়েছে, যাতে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি নজরে না আসে। ২০২৩ সালের ২৩ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে এই অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ রয়েছে।

বাড়তে পারে আত্মসাতের পরিমাণ

দুদক জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে আত্মসাতের পরিমাণ ধরা হয়েছে ১১ কোটি ৮৪ লাখ ১০ হাজার ৯০০ টাকা। তবে তদন্ত চলমান থাকায় এই অঙ্ক আরও বাড়তে পারে। সংশ্লিষ্ট অন্যান্য হিসাব ও লেনদেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে মামলায় নতুন আসামি সংযুক্ত করা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে তদন্ত সংস্থা।

যেসব ধারায় মামলা

মামলায় দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর প্রতারণা, জালিয়াতি ও বিশ্বাসভঙ্গ সংক্রান্ত একাধিক ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব ধারায় দোষী সাব্যস্ত হলে আসামিদের বিরুদ্ধে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

উপসহকারী পরিচালক মুহাম্মদ হামেদ রেজা বলেন, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে আসামিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে অর্থ উদ্ধারের বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে।

ব্যাংকের অবস্থান

এ বিষয়ে জানতে সিটি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে দায়িত্বশীল এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি ব্যাংকের নজরে আসার পর অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং আইনগত প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। তিনি বলেন, “অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তদন্তে আমরা পূর্ণ সহযোগিতা করছি।” ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকের আমানত ফেরতের বিষয়ে তিনি জানান, সিটি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ও ফোর এইচ গ্রুপ কর্তৃপক্ষের মধ্যে শিগগিরই আলোচনায় বসা হবে। গ্রাহকের স্বার্থ সুরক্ষায় ব্যাংক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও দাবি করেন তিনি।

আস্থার সংকটের শঙ্কা

ব্যাংকিং খাতে একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় গ্রাহকদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে কর্পোরেট শাখায় এমন অনিয়ম বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুরো ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট না হলেও, এই ঘটনায় ব্যাংকিং ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

দুদক জানিয়েছে, মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে। একই সঙ্গে আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধারে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ