২৯ মার্চ ২০২৬

বিশ্বব্যাংকের ৪৩ কোটি টাকার বাণিজ্যিক ভবন

চসিকের চুক্তি শর্ত ভঙ্গ করেছে ফারজানা ফ্যাশন

চসিকের এমন বাণিজ্য জানেন না মেয়র!

চট্টগ্রাম নগরীর ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা দক্ষিণ আগ্রাবাদ সিডিএ ২৩ নম্বর। মূল সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কাঁচঘেরা দৃষ্টিনন্দন তিনতলা ভবনটি প্রথম দেখায় যেকোনো আধুনিক কর্পোরেট অফিস বলেই মনে হয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। নীরবে, কোনো সাইনবোর্ড ছাড়াই সেখানে চলছে একটি পূর্ণাঙ্গ গার্মেন্টস কারখানা। আর এই নীরবতাই যেন লুকিয়ে রেখেছে একাধিক অনিয়ম ও চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ।

এই ভবনটির মালিক চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। এটি একটি মাল্টিস্টোরিড কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স (বহুতল বাণিজ্যিক ভবন), যা বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে। ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর এই ভবনটি সিটি কর্পোরেশন থেকে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য ভাড়া নেন ‘ফারজানা ফ্যাশন ওয়ার্ল্ড লিমিটেড’ নামে একটি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সেলিম। কিন্তু বাণিজ্যিক ব্যবহারের নামে ভাড়া নিয়ে তিনি সেখানে গার্মেন্টস কারখানা গড়ে তুলেছেন। এই ‘জোচ্চুরির’ কারণে তিনি ভবনটির বাইরে কারখানাটির নামের কোনো সাইনবোর্ড স্থাপন করেননি।

জানা গেছে, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ মিউনিসিপ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের (বিএমডিএফ) মাধ্যমে এই মাল্টিস্টোরিড কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য ৪৩ কোটি ১৬ লাখ টাকার অর্থসহায়তা প্রদান করে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকার আধুনিকায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং কর্পোরেশনের নিজস্ব আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংক এই কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স নির্মাণ করে দেয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান বিএমডিএফের তত্ত্বাবধানে ২০১৯ সালে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। ৩২ শতক জায়গার ওপর নির্মিত বেইসমেন্ট ও গ্রাউন্ড ফ্লোরসহ তিনতলা বিশিষ্ট কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সটি ২০২১ সালের ২৭ জুন উদ্বোধন করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উদ্বোধনের পর এই কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সে সিটি কর্পোরেশনের ২৭ নম্বর দক্ষিণ আগ্রাবাদ ওয়ার্ড কার্যালয় স্থাপন করা হয়। কিন্তু দুই বছরের মাথায় সেখান থেকে ওয়ার্ড কার্যালয়টি আগ্রাবাদ এক্সেস রোডে বেপারিপাড়া সিটি কর্পোরেশন মার্কেটে স্থানান্তর করা হয়। এরপর কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সটি ‘ফারজানা ফ্যাশন ওয়ার্ল্ড লিমিটেড’ নামে একটি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেয় সিটি কর্পোরেশন।

কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সটির ভাড়া নিয়ে ফারজানা ফ্যাশন ওয়ার্ল্ড লিমিটেডের সঙ্গে চসিকের যে চুক্তিপত্র হয়েছে, সেটার কপি এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।

চুক্তিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সটি ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে পাঁচ বছরের জন্য ফারজানা ফ্যাশন ওয়ার্ল্ড লিমিটেডকে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি চসিককে দরপত্রের জামানত বাবদ ১ কোটি ৪৬ লাখ টাকা প্রদান করে। মাসিক ভাড়া নির্ধারিত হয় ৬ লাখ টাকা। ফারজানা ফ্যাশন ওয়ার্ল্ড লিমিটেডের পক্ষে চুক্তি করেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সেলিম। তিনি নগরীর পাহাড়তলী গ্রিনভিউ আবাসিক এলাকায় বসবাস করেন।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, কাগজ-কলমে চুক্তি হলেও সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে এই বাণিজ্যিক ভবনে ‘দি শাহাজালাল গ্লোবাল অ্যাপারেলস লিমিটেড’ নামে একটি গার্মেন্টস কারখানা গড়ে তোলেন মোহাম্মদ সেলিম। কিন্তু এই গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চসিকের কোনো চুক্তিই হয়নি। চসিকের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে ফারজানা ফ্যাশন ওয়ার্ল্ড লিমিটেডের। এই গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের কারখানা হলো নগরীর দেওয়ানহাট ডি টি রোড সংলগ্ন আসকারাবাদ এলাকায়।

চুক্তিপত্রে শর্ত ছিল, ফারজানা ফ্যাশন ওয়ার্ল্ড লিমিটেড এই কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের নিকট হস্তান্তর করতে পারবে না। কিন্তু কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সটিতে আরেকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছেন মোহাম্মদ সেলিম।

জানা গেছে, কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সটিতে গার্মেন্টস কারখানা স্থাপনের বিষয়টি অবগত আছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। প্রতিষ্ঠানটির এস্টেট বিভাগের কর্মকর্তারা প্রতিমাসে গার্মেন্টস কারখানায় গিয়ে ভাড়া আদায় করে থাকেন।

গত ২৭ জানুয়ারি দুপুরে আগ্রাবাদ সিডিএ ২৩ নম্বরে মাল্টিস্টোরিড কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সটিতে সরেজমিন পরিদর্শনে যান এই প্রতিবেদক। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ভবনটিতে ‘দি শাহাজালাল গ্লোবাল অ্যাপারেলস লিমিটেড’ নামে একটি গার্মেন্টস কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে কারখানাটির কার্যক্রম চালু হয়। এটি একটি নিট গার্মেন্টস (সুতা থেকে কাপড় এবং কাপড় থেকে পোশাক তৈরি হয়)। এই গার্মেন্টস কারখানায় ৩০০ জন শ্রমিক কাজ করেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, গার্মেন্টস কারখানাটি থেকে দুপুরে লাঞ্চ বিরতিতে কর্মীরা বাইরে বের হয়ে আসেন।

এ সময় শরীফ মিয়া নামের গার্মেন্টস কারখানাটির সুইং অপারেটর এই প্রতিবেদককে জানান, তিনি ২০২৫ সালের ৪ অক্টোবর এই গার্মেন্টসে যোগদান করেন।

সেদিন গার্মেন্টস কারখানাটিতে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মোহাম্মদ সেলিমকে পাওয়া যায়নি। এরপর নগরীর দেওয়ানহাট আসকারাবাদ এলাকায় তার আরেক প্রতিষ্ঠান ফারজানা ফ্যাশন ওয়ার্ল্ড লিমিটেডের কার্যালয়ে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। মোহাম্মদ সেলিমের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।

এরপর ফারজানা ফ্যাশন ওয়ার্ল্ড লিমিটেডের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক ইকবাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘সিটি কর্পোরেশনের এস্টেট বিভাগের কর্মকর্তারা প্রতিমাসে যখন ভাড়া আদায় করতে আসেন, তারা কি দেখেন না এটা যে গার্মেন্টস কারখানা? তারা তো আমাদের এ নিয়ে কিছু বলছেন না। আপনি (প্রতিবেদক) কেন এটা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন?’

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের এস্টেট কর্মকর্তা অভিষেক দাশ বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। তবে আমি একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসারকে বিষয়টি তদন্ত করার জন্য দায়িত্ব দেব। এরপর তদন্ত রিপোর্ট মেয়রের কাছে উপস্থাপন করব। তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে মেয়র এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।’

তথ্য সূত্র: রাজনীতি সংবাদ ডটকম।

আরও পড়ুন