৩ এপ্রিল ২০২৬

জামিন পেয়েও ফিরছে না মুক্তি, অরাজনৈতিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে পাঁচ মামলা!

চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধে কর্ণফুলী জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) মো. জামাল উদ্দিন চৌধুরীর কাছে সালিশে গিয়ে তাঁর রোষানলে পড়ে গত সাড়ে তিন মাস ধরে বিনা অপরাধে কারাগারে আছেন মো. সালা উদ্দিন (৩৮)। এমন অভিযোগে কর্ণফুলীজুড়ে সমালোচনা চলছে।

জমি নিয়ে বিরোধ, সালিশ বৈঠকে ‘চাপ’

কারণ, এসি জামালের কাছে গিয়ে জমিজমার সালিশ বিচারে জমি ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ অমান্য করায় ক্ষমতার অপব্যবহার ও আইনের অপপ্রয়োগ করে ওই ব্যক্তিকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে আটক করা হয়। পরে কর্ণফুলী থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি রাজনৈতিক মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে জেলে পাঠিয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ সাধারণ মানুষের বিবেকে নাড়া দিয়েছে।

জানা গেছে, সালা উদ্দিনকে গত ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর কর্ণফুলী থানার রাজনৈতিক মামলা (নম্বর-০৩) সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯ (সংশোধিত ২০১৩)-এর ৬(২), ৮, ৯ ও ১০ ধারায় গ্রেপ্তার দেখান কর্ণফুলী থানার তৎকালীন ওসি মো. জাহেদুল ইসলাম।

পরপর পাঁচ মামলা, শ্যোন অ্যারেস্টের ‘জটলা’

পরে মো. সালা উদ্দিন (৩৮) চট্টগ্রাম জজকোর্ট ও হাইকোর্ট থেকে জামিন পেলেও সিএমপির বিভিন্ন থানায় পরপর আরও চারটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখাতে শ্যোন অ্যারেস্ট পাঠাতে মুখ্য ভূমিকা পালনের অভিযোগও কর্ণফুলী জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনারের বিরুদ্ধে।

অথচ গ্রেপ্তার মো. সালা উদ্দিনের (৩৮) কোনো রাজনৈতিক পদ-পদবি নেই। তিনি রাজনীতি করেন না, যা কর্ণফুলী থানা পুলিশও কোনো মামলায় উল্লেখ করতে পারেনি। এমনকি কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ বা এর কোনো অঙ্গসংগঠনের পদধারীও নন তিনি। জানা গেছে, সালা উদ্দিন কর্ণফুলী উপজেলার চরলক্ষ্যা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের অলি আহমদ বাড়ির আব্দুর রহিমের ছেলে।

আরও জানা গেছে, তৎকালীন ওসি মো. জাহেদুল ইসলাম আদালতে জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর সালা উদ্দিনকে সোপর্দপূর্বক প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ৯ নভেম্বর কর্ণফুলী থানাধীন মইজ্জারটেক এলাকায় অবস্থানকালে একই বছরের ২০ অক্টোবর রাত ৩টার সময় জানতে পারেন, নিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র ও নাশকতার উদ্দেশ্যে চরলক্ষ্যার সৈন্যারটেক তাজ রিজেন্সি হলে মিছিল করছে।

পরে ঘটনাস্থলে গেলে আসামিরা পালিয়ে যায়। স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদ ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় এজাহারনামীয় ১-৫ নম্বর আসামির নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করা গেলেও অজ্ঞাতনামা ৬০/৭০ জনের নাম-ঠিকানা পাওয়া যায়নি।

এসআই মাহিন সরওয়ারসহ সঙ্গীয় ফোর্স চরলক্ষ্যা এলাকা থেকে সালা উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছুটিতে থাকায় ওসি নিজেই আসামিকে আদালতে প্রেরণ করেন।

সবচেয়ে বড় অভিযোগ, এ মামলা থেকে সালা উদ্দিন জামিন পেলেও কর্ণফুলী জোনের এসি তার প্রতি এতটাই ক্ষিপ্ত হন যে কারাগার থেকে মুক্তির আগেই তাকে কর্ণফুলী থানার আরেকটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখান। মামলাটি কর্ণফুলী থানা মামলা নম্বর-২৭(৫)২৫।

এ মামলা থেকেও সালা উদ্দিন জামিন পেলে পরে সিএমপির আকবর শাহ থানার ২৭(৫)২৫ সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় আবারও তাকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়। পরে এ মামলা থেকেও ২৫ মার্চ হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে মুক্তি পাওয়ার আগেই কর্ণফুলী জোনের এসি জামাল উদ্দিন চৌধুরী ও সিএমপি বন্দর জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) আমিরুল ইসলামসহ মিলে পুনরায় তাকে মামলা দিতে ওসিকে বারবার চাপ প্রয়োগ করেন বলে সূত্রের দাবি।

পরবর্তী সময়ে বিনাদোষে সাড়ে তিন মাস কারাভোগের পর সালা উদ্দিনকে আবারও কর্ণফুলী থানা পুলিশ চতুর্থবারের মতো সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা ২৫ নম্বর মামলায় (তারিখ ২৫-০৭-২০২৫) শ্যোন অ্যারেস্ট দেখায়। ওই মামলায় আবেদন করেন কর্ণফুলী থানার এসআই মো. রেজাউল হোসাইন।

একই দিন রাতে সিএমপি বন্দর জোনের ডিসি ও দক্ষিণ জোনের ডিসির নির্দেশে কোতোয়ালী থানা পুলিশ হত্যাচেষ্টা মামলায় (নম্বর-০৪, তারিখ ০৪-১১-২০২৪) পুনরায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখায়। এ মামলায় আবেদন করেন কোতোয়ালী থানার এসআই নিবির আহমেদ।

এক ব্যক্তিকে প্রথম মামলার পর পরপর চারটি মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে বিনা বিচারে কারাগারে বন্দি করে রাখা এসি জামাল উদ্দিন চৌধুরীর ক্ষমতার অপব্যবহার ও আইনের অপপ্রয়োগ কিনা—এ প্রশ্ন উঠেছে কর্ণফুলীর সচেতন মহলে।

এক্ষেত্রে বন্দর জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার ও অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনারও এ কাণ্ডে জড়িত বলে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ। বিষয়টি জানতে পেরে আইন ও সালিশ কেন্দ্র, ভুক্তভোগীর আইনজীবী (হাইকোর্ট) আফরোজা বেগম ও চট্টগ্রাম জজকোর্টের আইনজীবী নীলু কান্তি দাশ উদ্বেগ জানিয়েছেন।

আইনের ব্যাখ্যা, পুলিশের ‘এখতিয়ার বহির্ভূত’ কর্মকাণ্ড ও তদন্তের দাবি

একজন ব্যক্তিকে বিনাদোষে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পরপর চারটি মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে কারাগারে আটকে রাখা অমানবিক বলেও মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী পরিবার সিএমপি কমিশনার, সিটি স্পেশাল ব্রাঞ্চ ও বাংলাদেশ পুলিশের কেন্দ্রীয় তথ্য কর্মকর্তাসহ পুলিশ মহাপরিদর্শকের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন। তদন্ত করে সত্যতা নিশ্চিত করে বিভাগীয় ব্যবস্থার কথাও জানান তারা।

প্রতিবেদকের অনুসন্ধান যা বলছে

ঘটনার অনুসন্ধান ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বিগত ২০২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর ভুক্তভোগী মো. সালা উদ্দিন বাদী হয়ে মারধর, হত্যাচেষ্টা ও চুরির অভিযোগে কর্ণফুলী থানায় একটি মামলা (নম্বর-২১/৪৩৮) করেন। এ ঘটনায় সালা উদ্দিনের পরিবারের তিন সদস্য গুরুতর আহত হন।

মামলায় অভিযুক্ত আসামিরা হলেন—একই এলাকার মো. জসিম, মো. ইলিয়াস, মো. আব্দুর সবুর, ফারজানা আক্তার, ছমুদা খাতুন ও অজ্ঞাত আরও দুই-তিনজন। মামলাটি রেকর্ড করেন তৎকালীন ওসি মুহাম্মদ শরীফ এবং তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন এসআই হেলাল উদ্দিন।

এরপর গত ২০২৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সিএমপি কর্ণফুলী জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) জামাল উদ্দিন চৌধুরী তাঁর কার্যালয় থেকে ১৬৭১(১) স্মারকে এক নোটিশে কর্ণফুলী থানার এএসআই আনোয়ার হোসেনের মাধ্যমে সালা উদ্দিনের পিতা আব্দুর রহিম ও আব্দুর হককে একই মাসের ১৩ তারিখ সকাল ১১টায় হাজির হওয়ার জন্য বলেন।

ওই বৈঠকে আব্দুর রহিমের সঙ্গে তার ছেলে মো. সালা উদ্দিনও অংশ নেন, যেহেতু বিষয়টি জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ। কিন্তু বৈঠকে এসি জামাল উদ্দিন চৌধুরী জোরপূর্বক একতরফা সালিশ বিচার করে জমি ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে চাইলে সালা উদ্দিন কৌশলে এসি কার্যালয় থেকে চলে আসেন।

এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে এসি তার পিতাকে বসিয়ে রাখেন তাঁর কার্যালয়ে। এ ঘটনার পরই কর্ণফুলী জোনের এসির নির্দেশে কর্ণফুলী থানার পুলিশ কোনো কারণ ছাড়াই, কোনো মামলা ছাড়াই সালা উদ্দিনকে ‘ডেভিল’ আখ্যা দিয়ে রাজনৈতিক মামলায় জেলে পাঠিয়েছে বলে ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ।

পরে ২০২৬ সালের ২৪ মার্চ সিএমপি বন্দর জোনের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (এডিসি) নাজিম উদ্দিন অভিযোগ অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর কার্যালয় থেকে ৮২ নম্বর স্মারকে এএসআই রুহুল আমিনের মাধ্যমে আরেকটি নোটিশ ইস্যু করেন আব্দুর রহিম, হেলাল, পরান খাতুন ও শহিদুল ইসলামের জন্য। এ বৈঠকের ফলাফল এখনো মিলেনি।

তবে কর্ণফুলী জোনের এসি জামাল উদ্দিন চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালনকালে বারবার নিজ কার্যালয়ে জমিজমার সালিশ বিচার বসিয়ে অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা আদায় করছেন বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ছিল। বিষয়টি স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা একাধিকবার সিএমপি কমিশনারকে হোয়াটসঅ্যাপে জানিয়েছিলেন। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা তেমন চোখে পড়েনি।

উল্টো জমিজমার সালিশ বিচার নির্বিঘ্নে করতে তিনি কর্ণফুলী জোনের কার্যালয় নতুনব্রিজ সংলগ্ন দক্ষিণ পাড়ের শিকলবাহা থেকে সরিয়ে টানেলমুখের নীরব লোকেশনে নিয়ে গেছেন বলেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্ণফুলীর একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন।

অভিযোগ ও জবাবদিহির প্রশ্ন

অন্যদিকে, মো. সালা উদ্দিনের পরিবারের অভিযোগ, বিনাদোষে পরপর চারটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলা ও একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে সালা উদ্দিনকে। সালা উদ্দিন রাজনৈতিক কোনো সংগঠনের বড় নেতা বা পদধারী কোনো নেতা নন। তারপরও কীভাবে তাকে রাজনৈতিক পাঁচটি মামলায় কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছে—এ প্রশ্নের উত্তর অধরা।

অথচ এ বিষয়ে আইন একেবারেই স্পষ্ট। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৭(ক) ধারা অনুযায়ী, ইতোমধ্যে অন্য মামলায় আটক থাকা কোনো ব্যক্তিকে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখাতে হলে ম্যাজিস্ট্রেটকে অবশ্যই মামলার ডায়েরি পর্যালোচনা করে এবং শুনানির সুযোগ দিয়ে ‘যৌক্তিক কারণ’ সন্তোষজনক মনে হলে তবেই অনুমোদন দিতে হয়।

অন্যদিকে, মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের রিট পিটিশন নম্বর ৩৩৪৩/২০১০-এর আদেশ ও ২০১৩ সালের ১২ জানুয়ারি পুলিশ হেডকোয়ার্টারের নম্বর-১৬০/৯৩ স্মারক আদেশের নির্দেশনা অনুযায়ী, অর্থ আদায়, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ, ফ্ল্যাট-প্লট তথা সিভিল বিষয়ে কার্যক্রম পুলিশের এখতিয়ার বহির্ভূত।

আইনজীবী যা বলছেন

চট্টগ্রাম জজকোর্টের আইনজীবী আবু তৈয়ব বলেন, ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’কে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের পথ বন্ধ করা দরকার। কিন্তু বাস্তবে সেটা প্রায় কখনোই প্রয়োগ করা হয় না। হাতেগোনা কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া জামিনের পর ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ মামলাগুলোর কোনো প্রমাণিক ভিত্তি দেখা যায় না।

তিনি আরও বলেন, এসব মামলা মূলত উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও যেন কেউ মুক্তি না পায়, সেই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। ফলে তাদের ইচ্ছামতো ও বেআইনিভাবে আটকে রাখা সম্ভব হয়। এতে জামিন কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। কিন্তু কোনো অরাজনৈতিক ব্যক্তি যদি এই ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’-এর ফাঁদে পড়েন, তাহলে তার পরিণতি হয় খুব অমানবিক।

ভুক্তভোগী পরিবারের বর্ণনা

কারাবন্দি সালা উদ্দিনের পিতা আব্দুর রহিম বলেন, ‘একটা নোটিশ পেয়ে আমরা কর্ণফুলী জোনের এসি জামাল উদ্দিন চৌধুরীর অফিসে গিয়ে দেখি জায়গা-জমির সালিশ বিচার করবেন তিনি। দুই পক্ষের কথা চলাকালে আমার ছেলে সালা উদ্দিন মুন্সীর সঙ্গে কথা বলতে গেলে তার ওপর ক্ষিপ্ত হন এসি জামাল উদ্দিন চৌধুরী। পরে অবস্থা বেগতিক দেখে কৌশলে আমার ছেলে চলে যায়। আর আমাকে বসিয়ে রাখেন। আমাকে বকাবকি করেন এসি। আমরা নাকি আওয়ামী লীগ করি। আমার ছেলে নাকি ডেভিল। আর জমি ছেড়ে না দিলে মামলা ও গ্রেপ্তারের ভয় দেখান। আর বলেন—সালিশ মানবে, নাকি মামলা নেবে?’

সালা উদ্দিনের জামিনে আইনি সহযোগিতাকারী হাইকোর্টের আইনজীবী আফরোজা বেগম ও চট্টগ্রাম জজকোর্টের আইনজীবী নীলু কান্তি দাশ এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্রয়োজনে বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে রিট করার কথাও ভাবছেন বলে জানা গেছে।

ওসি, কারাগারের জেলার, ডিআইজি প্রিজন, পুলিশ এসি, ডিসি ও হিউম্যান রাইটস যা বলছেন

কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহীনূর আলম বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমি কর্ণফুলীতে যোগদানের আগের ঘটনা এটি। তারপরেও খোঁজ নেব, নিরীহ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন।’

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার সৈয়দ শাহ্ শরীফ বলেন, ‘গত ২৫ তারিখ কর্ণফুলী উপজেলার সালা উদ্দিন পূর্বের মামলায় জামিন পেলে পরে কোতোয়ালী থানা থেকে ৪(১১)২৪ নম্বরের একটি মামলা আসে। কর্ণফুলী থেকেও একটি আসে। পরে বাতিল হয়—সম্ভবত এটি। বর্তমানে তিনি আটক আছেন কারাগারে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কারাগারে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা সাবেক এক ডিআইজি প্রিজন বলেন, ‘কাউকে পুলিশ পুনরায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখালে জেলখানা কর্তৃপক্ষের করার কিছু থাকে না। যদিও আইনে ক্ষমতার অপব্যবহার করা উচিত নয়। বর্তমান সময়ে দৈনিক কার জামিন হয়, তার বিস্তারিত তথ্য জানে প্রসিকিউশন। তবে আমার মতে, মামলার ধার্য তারিখে আদালতে আসামি হাজির করা হয়। যদি জামিন হয়, তখন উচিত আদালত থেকেই মুক্তি দেওয়া।’

যার বিরুদ্ধে সালা উদ্দিনের পরিবারের মূল অভিযোগ, সেই কর্ণফুলী জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) জামাল উদ্দিন চৌধুরীর কাছে পুরো ঘটনাটি উপস্থাপন করে কেন তাকে পরপর বিভিন্ন থানা থেকে পাঁচটি মামলা দেওয়া হচ্ছে—বা অভিযোগের তীর তাঁর দিকে কেন, জানতে চাইলে তিনি সর্বৈব অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি কী সব থানার ওসি? আমি এ ধরনের কোনো ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই। আমাকে কেন দোষারোপ করা হচ্ছে, আমি জানি না। তবে কোনো অভিযোগ পেলে আমরা বাদী-বিবাদীকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করি, এতটুকুই। তাদের সঙ্গে আমার কোনো শত্রুতা নেই। আর আকবর শাহ বা কোতোয়ালী থানায় কি আমার কোনো ক্ষমতা আছে? এটা ভুল তথ্য। আমি আদৌ এ বিষয়ে কিছুই জানি না। আর যেসব অফিসার শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়েছেন, বিষয়টি তাদের জিজ্ঞাসা করুন। কোনো কাগজে আমার ফরওয়ার্ডিং বা স্বাক্ষর আছে কি না, দেখুন। আদৌ আমি এসব কিছুই জানি না।’

সিএমপি বন্দর জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি যতটুকু জানি, সালা উদ্দিন কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক। আর পাঁচটি মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানোর বিষয়টি খোঁজখবর নেব, আপনি যেহেতু জানিয়েছেন।’

অন্যদিকে, চরলক্ষ্যা গ্রামের একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা ও বিএনপির নেতারাও জানিয়েছেন, সালা উদ্দিন কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন। তার কোনো পদ-পদবি নেই। তিনি ভালো মানুষ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন (বিএইচআরএফ)-এর মহাসচিব কলামিস্ট অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, ‘পুলিশ সিআরপিসি ও পুলিশ রেগুলেশন অনুসরণ করবেন। তাঁরা জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ বা সিভিল বিষয়ে সালিশ বিচার করবেন না—তা আইনের এখতিয়ার বহির্ভূত। এটি ফৌজদারি কার্যবিধি ও হাইকোর্টের নির্দেশনারও স্পষ্ট লঙ্ঘন। আরও অভিযোগ উঠেছে, ওই সালিশে বিরূপ মনোভাবের কারণে একজন নাগরিককে পরপর পাঁচটি মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে, যা সুস্পষ্ট ক্ষমতার অপব্যবহার। এ ধরনের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে সাধারণ মানুষ আইনের প্রতি আস্থা হারাবে; এতে পুলিশ প্রশাসনেরও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাই।’

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের জামিনে মুক্তির পরই অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশনা দিয়ে দাপ্তরিক আদেশ জারি করা পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ শাহজাহানকে আইনি নোটিশ দিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র।

গত সোমবার আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পক্ষে আইনজীবী সৈয়দা নাসরিন ও শাহীনুজ্জামান যৌথভাবে ডিআইজিকে এ নোটিশ পাঠান। নোটিশে সাত দিনের মধ্যে ডিআইজির দেওয়া নির্দেশনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যথায় এ বিষয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হবে বলেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন