২৯ এপ্রিল ২০২৬

আজ সেই ভয়াল ২৯ এপ্রিল: আনোয়ারায় ৩৫ বছরেও সুরক্ষিত হয়নি উপকূলীয় বেড়িবাঁধ

সেই ভয়াল ২৯ এপ্রিল, ১৯৯১ সালের এই দিনে ঘূর্ণিঝড় এবং অতিরিক্ত জলোচ্ছ্বাসে চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা, সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, সন্দ্বীপসহ উপকূলীয় এলাকার ব্যাপক ক্ষতি হয়।

এই ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ প্রাণ হারান এবং উপকূলীয় অঞ্চলের একেকটি পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। প্রায় এক কোটি মানুষ তাদের সর্বস্ব হারান। প্রলয়ংকরী এই তাণ্ডবের ৩৫ বছর পরও উপকূলীয় এলাকার কিছু অংশ এখনো অরক্ষিত।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, আনোয়ারা উপকূল সুরক্ষায় ২০১৬ সালে ৪২টি প্যাকেজের ২৮০ কোটি টাকার প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে কয়েক ধাপে এ প্রকল্পের বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭৭ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে, যা এখনো দৃশ্যমান নয়। যেসব কাজ হয়েছিল, সেগুলো দেবে যাওয়ায় পুরোনো ব্লক সরিয়ে নতুন করে কাজ করা হচ্ছে।

এছাড়া আনোয়ারা উপজেলায় টেকসই বেড়িবাঁধ নিশ্চিত করতে ২০২৪ সালের ২৭ মে নতুন করে ৩৪৬ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। প্রকল্পটির কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। নতুন এই বরাদ্দে রায়পুর উপকূলীয় এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে চার প্যাকেজে ১৯৬ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব বরাদ্দে ‘প্রপার্টিজ ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড’-এর অধীনে দুই প্যাকেজে ৭৫ কোটি টাকা মূল্যের ৬০০ মিটার করে ১২০০ মিটার কাজ চলমান রয়েছে।

শেখ এমদাদুল হক আল মামুন দুই প্যাকেজে ৮০ কোটি টাকা মূল্যের ৯৭০ মিটার কাজ করছেন। এছাড়া ৪১ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘তাহের ব্রাদার্স’-এর ৫৩০ মিটার কাজ চলমান রয়েছে। এই তিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি কাজ বাস্তবায়ন করছে ‘এম এস এম অ্যান্ড জামিল ইকবাল’। প্রকল্পটির আওতাধীন উপকূলের সাঙ্গু নদী অংশে ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে চারটি প্যাকেজের কাজ বাস্তবায়ন হচ্ছে। কাজের নিয়ম অনুযায়ী, সাগর উপকূলের বেড়িবাঁধ ৭.৫ মিটার উচ্চতা ও শোল্ডারসহ ৪.৩ মিটার চওড়া এবং নদী উপকূলে ৬.৫ মিটার উচ্চতা ও ৪.৩ মিটার চওড়া হবে বলে জানান পাউবোর কর্মকর্তারা।

দেখা যায়, বেড়িবাঁধ নির্মাণে একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে। বর্ষার আগেই যদি কাজ সম্পন্ন না হয়, তাহলে আবারও প্লাবিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে উপজেলার পারকি এবং পরুয়াপাড়ার একাংশে বেড়িবাঁধে কোনো ব্লক স্থাপন করতে দেখা যায়নি। জিও ব্যাগ দিয়ে কোনো রকম কাজ চলছে। রায়পুর দক্ষিণ গহিরার কয়েকটি ওয়ার্ডে এখনো অনেক স্থানে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ হয়নি। বিশেষ করে উঠান মাঝিরঘাট এবং বাইঘ্যারোঘাট এলাকার বেড়িবাঁধ এখনো অদৃশ্যমান। যেখানে পুরোটাই বেড়িবাঁধের আওতায় থাকার কথা, সেখানে বেড়িবাঁধের নিচে থাকা মসজিদ ও কবরস্থানসহ সবকিছু বিলীন হওয়ার পথে।

স্থানীয়রা জানান, পুরো উপকূল স্থায়ী বেড়িবাঁধের আওতায় না আসায় আমরা উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দারা এখনো ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের খবর শুনলেই আতঙ্কিত হয়ে নির্ঘুম রাত পার করি। জলোচ্ছ্বাস অথবা ঘূর্ণিঝড়ের আভাস পেলেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা এবং এলাকার জনপ্রতিনিধিরা আমাদের দেখতে আসলেও এবার জনপ্রতিনিধিদের কোনো খবর নেই। অনেক সময় বেড়িবাঁধের কোনো অংশ দিয়ে উত্তাল সাগরের পানি ঢুকে গেলে আমাদের চাষাবাদ, পশুপালন, ঘরবাড়ি সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে। আমরা টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ চাই।

উল্লেখ্য, এই দিনেই ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল কক্সবাজার, মহেশখালী, চকরিয়া, বাঁশখালী, আনোয়ারা, সন্দ্বীপ, হাতিয়া, সীতাকুণ্ড, পতেঙ্গাসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলীয় এলাকা। বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২৫০ কিলোমিটার (১৫৫ মাইল/ঘণ্টা) এবং এর সঙ্গে ছিল ৬ মিটার (২০ ফুট) উঁচু জলোচ্ছ্বাস। এই ঝড়ে মৃত্যুবরণ করেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৮২ জন মানুষ এবং তার চেয়েও বেশি মানুষ আহত হন। আশ্রয়হীন হয়েছিল কোটি মানুষ। ক্ষয়ক্ষতির বিচারে এই ঘূর্ণিঝড় বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় হিসেবে পরিচিত।

মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বঙ্গোপসাগরে গভীর নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়েছিল ২২ এপ্রিল থেকেই। ২৪ এপ্রিল নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয় এবং ধীরে ধীরে শক্তিশালী হতে থাকে। ২৮ ও ২৯ এপ্রিল তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়ে রাতে আঘাত হানে এবং এর গতিবেগ পৌঁছে ঘণ্টায় ১৬০ মাইলে। সেই রাতে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কক্সবাজার-চট্টগ্রাম উপকূলে আঘাত হানা ওই ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২৪০ থেকে ২৫০ কিলোমিটার। এ কারণে সৃষ্ট ৬ মিটার বা ২০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৮ হাজার ২৪২ জন। তবে বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা আরও বেশি। সেই ঘূর্ণিঝড়ে মারা যায় প্রায় ২০ লাখ গবাদিপশু।

আরও পড়ুন