একসময় জোয়ার-ভাটার টানে মুখর থাকত খালটি। শহর থেকে নৌকায় আসত ব্যবসায়ীদের পণ্য, কৃষকরা ব্যবহার করতেন সেচের পানির উৎস হিসেবে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজা-পার্বণেরও ছিল অন্যতম কেন্দ্র। অথচ সময়ের ব্যবধানে সেই ঐতিহ্যবাহী শ্রীমতি খাল আজ পরিণত হয়েছে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে। বাজারের বর্জ্য, গৃহস্থালির আবর্জনা, গরুর খামার ও পোল্ট্রি ফার্মের বর্জ্যে পানিপ্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে খালটি এখন হারাচ্ছে তার অস্তিত্ব।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বটতলী ইউনিয়নের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ শ্রীমতি খাল বর্তমানে ভয়াবহ দূষণ ও ভরাটের কবলে পড়েছে। দেয়াঙ পাহাড় থেকে নেমে আসা এই খালটি চাপাতলী, কুলালপাড়া, জয়নগরপাড়া, মমতাজপাড়া ও হলদিয়াপাড়া অতিক্রম করে শঙ্খ নদীতে মিলিত হয়েছে। পাশাপাশি মোহছেন আউলিয়া খালের সঙ্গেও এর সংযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মোহছেন আউলিয়া সড়কের কালভার্টের নিচে খালের দুই তীরে নিয়মিত ফেলা হচ্ছে উপজেলা প্রশাসনের ইজারাকৃত রুস্তমহাট বাজারের বর্জ্য। খালের এক পাশে গড়ে তোলা হয়েছে বাজারের জলদা খানা। চারদিকে আগাছা, প্লাস্টিক ও পচনশীল-অপচনশীল বর্জ্যের স্তূপে খালটি অনেকটা মৃত জলাশয়ের রূপ নিয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে খনন না হওয়ায় ৩০ থেকে ৩৫ ফুট প্রশস্ত খালটি অনেক জায়গায় ১০ ফুটেরও কমে নেমে এসেছে। কোথাও কোথাও প্রভাবশালীরা খালের জমি দখল করে ব্যবহার করছেন। ফলে বর্ষাকালেও খালের অধিকাংশ অংশে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নেই। এতে জলাবদ্ধতা বাড়ছে, কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে এবং পরিবেশগত ভারসাম্যও হুমকির মুখে পড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা নুর হোসেন বলেন, ‘একসময় এই খালের পানি আমরা খেতাম। খালটি ছিল অনেক গভীর ও প্রশস্ত। জোয়ার-ভাটা চলত, নৌকায় মালামাল আসত। এখন চোখের সামনে খালটি মরে যাচ্ছে। পরীর বিল, রুস্তমহাটসহ অন্তত ১০টি এলাকার পানি এই খালে পড়ে। সংযোগ অংশ খনন হলেও মূল শ্রীমতি খাল খনন না করায় কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু বাজারের বর্জ্য নয়, আশপাশের গরুর খামার, পোল্ট্রি ফার্ম, স-মিল এবং গৃহস্থালির আবর্জনাও প্রতিদিন খালে ফেলা হচ্ছে। ফলে দুর্গন্ধে আশপাশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে এবং রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
রুস্তমহাট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির (একাংশ) সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম বলেন, ‘শুধু ব্যবসায়ীদের নয়, পুরো বাজার এবং আশপাশের গৃহস্থালির ময়লাও সেখানে ফেলা হয়। এতে খালের ক্ষতি হলে আমরা ময়লা ফেলা বন্ধের উদ্যোগ নেব।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য মোহাম্মদ হারুন বলেন, ‘১০-১৫ বছর আগেও এই খালে সব ধরনের দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও বর্জ্যের কারণে খালটি নষ্ট হয়ে গেছে।’
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) আনোয়ারা উপজেলার উপ-সহকারী প্রকৌশলী আজমানুর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির আওতায় শ্রীমতি খাল খননের প্রকল্প তালিকাভুক্ত হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত খননকাজ শুরু হবে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রীমতি খালকে বাঁচাতে শুধু খনন করলেই হবে না; খালে বর্জ্য ফেলা বন্ধ, নদীর সঙ্গে অবাধ সংযোগ নিশ্চিত এবং দখল-দূষণের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় কয়েক বছরের মধ্যেই খালটির অস্তিত্ব পুরোপুরি বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি প্রকল্পের আওতায় খালটি খনন ও দুই পাড় সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আগে বাজারের বর্জ্য খালে ফেলা বন্ধে ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।














