কাগজে-কলমে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন। সরকারি নথিতে দেখানো হয়েছে বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থাপন, লাইট বসানো এবং প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সংযোগের কাজ শেষ হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পরিদর্শন ও প্রত্যয়ন শেষে ঠিকাদারকে পরিশোধ করা হয়েছে পুরো বিল। তবে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। নির্ধারিত স্থানে অধিকাংশ কাজই তখনো সম্পন্ন হয়নি; কোথাও কোথাও কাজ শুরু হয়েছে মাত্র।
এমন অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের একটি উন্নয়ন প্রকল্পকে ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাহাড়তলীতে অবস্থিত রেলওয়ে সেল ডিপো ও সিসিএস দপ্তরে ২৬টি বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থাপন, লাইট বসানো এবং আনুষঙ্গিক কাজের জন্য রহমান এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১৮ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সহযোগিতায় পুরো বিল উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পে ২৬টি বৈদ্যুতিক পিলারের জন্য মোট প্রায় ১৮ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। সে হিসাবে প্রতিটি পিলারের গড় ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৭০ হাজার টাকা। অথচ একই ধরনের একটি বৈদ্যুতিক পিলারের বাজারমূল্য সাধারণত ২৩ থেকে ২৫ হাজার টাকার মধ্যে। এতে বাজারদরের তুলনায় অনেক বেশি মূল্য দেখিয়ে সরকারি অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও উঠেছে।
রেলওয়ের প্রচলিত বিধি অনুযায়ী, কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সরেজমিনে পরিদর্শন ও যাচাই শেষে চূড়ান্ত বিল অনুমোদন করেন। কাজ আংশিক শেষ হলে নির্ধারিত নিয়মে আংশিক বিল দেওয়া গেলেও যথাযথ যাচাই ছাড়া পুরো বিল পরিশোধের সুযোগ নেই। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, গত ২৩ জুন প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ না হয়েই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রহমান এন্টারপ্রাইজ পুরো অর্থ উত্তোলন করেছে।
অভিযোগের তীর উঠেছে বিভাগীয় বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলামের দিকেও। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রয়োজনীয় সরেজমিন যাচাই ছাড়াই তিনি বিল অনুমোদনে ভূমিকা রেখেছেন। একই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সিআরবির গোয়ালপাড়াসহ আরও কয়েকটি প্রকল্পেও কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই ঠিকাদারদের বিল পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে রেলওয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দ্রুত কাজ শুরু করে।
গত ৫ জুলাই সরেজমিনে সিসিএস দপ্তর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও লাইট স্থাপনের কাজ তখনো চলমান। পরে সেল ডিপো এলাকায় গিয়েও একই ধরনের কাজ অসম্পূর্ণ অবস্থায় দেখা যায়।
কাজের দায়িত্বে থাকা কবির নামের এক ব্যক্তি বলেন, “এটি কনক সাহেবের কাজ। আমরা কয়েক দিন আগে কাজ শুরু করেছি। বর্তমানে সিসিএস দপ্তরের লাইটিংয়ের কাজ করছি। এরপর সেল ডিপোতে খুঁটি স্থাপন ও তার টানার কাজ শেষ করব। কয়েক দিনের মধ্যেই পুরো কাজ শেষ হয়ে যাবে।”
এদিকে সিআরবির গোয়ালপাড়া এলাকাতেও সরেজমিনে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও লাইট স্থাপনের কোনো দৃশ্য দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই এলাকায় বৈদ্যুতিক খুঁটি ও লাইট স্থাপনের জন্য প্রায় ১৮ লাখ টাকার আরেকটি কার্যাদেশ পেয়েছে আজিজ ট্রেডার্স।
অভিযোগ রয়েছে, কাজ শুরুর আগেই ওই প্রকল্পের বিপরীতে প্রায় ৫ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে আজিজ ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. আজিজ বলেন, “আমি নিয়ম মেনেই টাকা তুলেছি। খুব শিগগিরই কাজ শুরু করে দ্রুত শেষ করব।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়ন যাচাই না করেই বিল পরিশোধ করা হলে সরকারি অর্থের অপচয়, নিম্নমানের কাজ গ্রহণ এবং জবাবদিহির সংকট তৈরি হয়। এতে সৎ ঠিকাদাররাও বৈষম্যের শিকার হন।
রেল বিশ্লেষক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি যাচাই না করে বিল ছাড় করা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, এটি সুশাসনের গুরুতর লঙ্ঘন। তাঁর মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে কালো তালিকাভুক্ত করা এবং দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিভাগীয় বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম, প্রধান বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী (পূর্ব) মুহাম্মদ শফিকুর রহমান এবং রহমান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী কনকের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীন বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। অভিযোগ সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর তিনি তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।














