১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মাস্টারপ্ল্যানে কর্ণফুলী কেন নেই— ব্যাখ্যা দিলেন সিডিএ চেয়ারম্যান

মাস্টারপ্ল্যানে পাঁচ উপজেলা, বাদ কর্ণফুলী— সিডিএর সিদ্ধান্তে ক্ষোভ

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ২০২৫-২০৫০ মেয়াদি খসড়া মহাপরিকল্পনায় (মাস্টারপ্ল্যান) পটিয়া, বোয়ালখালী, আনোয়ারা, হাটহাজারী ও রাউজানকে অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হলেও শহরের একেবারে লাগোয়া কর্ণফুলী উপজেলাকে পৃথক পরিকল্পনা এলাকার বাইরে রাখায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে সমালোচনা। স্থানীয়দের প্রশ্ন— কর্ণফুলী টানেল, শিল্পায়ন ও দ্রুত নগরায়ণের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া সত্ত্বেও কেন কর্ণফুলীকে পরিকল্পনায় দৃশ্যমানভাবে স্থান দেওয়া হয়নি?

গত শনিবার (১ আগস্ট) সিডিএ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. বেলায়েত হোসেন জানান, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান (২০২৫-২০৫০)-এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। আগামী ২ আগস্ট থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬০ দিন নাগরিকদের মতামত ও আপত্তি গ্রহণের পর পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নতুন মহাপরিকল্পনায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ডসহ প্রায় এক হাজার ২৫৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে ভূমি ব্যবহার, পরিবহন, জলাবদ্ধতা নিরসন, পরিবেশ সংরক্ষণ, আবাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ ১৯টি খাতে ২৭৬টি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৫৮৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। বর্তমানে পরিকল্পনার ভৌত অগ্রগতি প্রায় ৯০ শতাংশ বলে জানিয়েছে সিডিএ।

কর্ণফুলী নিয়ে প্রশ্ন
সংবাদ সম্মেলনের পর সিডিএ চেয়ারম্যানের কাছে কর্ণফুলী উপজেলাকে পৃথকভাবে অন্তর্ভুক্ত না করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কর্ণফুলীর বিষয়টি গণশুনানিতে অংশ নিয়ে কর্ণফুলীবাসী তুলে ধরতে পারবেন।” পরে প্রশ্ন করা হয়, পটিয়া ও আনোয়ারার বাসিন্দারাও কি একইভাবে গণশুনানিতে অংশ নিয়ে পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন? জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, “কর্ণফুলী আগে থেকেই মাস্টারপ্ল্যানের সম্পৃক্ত এলাকায় রয়েছে।’

তবে এ বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, যদি কর্ণফুলী আগে থেকেই মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় থাকে, তাহলে নতুন পরিকল্পনায় আনোয়ারার মতো কর্ণফুলীর জন্যও পৃথক অ্যাকশন এরিয়া বা উন্নয়ন কৌশল থাকা উচিত ছিল।

কর্ণফুলীতে সিডিএর দীর্ঘ ইতিহাস
সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে প্রায় ৫০-৫১ একর জমির ওপর কর্ণফুলী আবাসিক প্রকল্প গ্রহণ করে সিডিএ। ১৯৯৪ সালে সেখানে ৫১৯টি আবাসিক প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু তিন দশক পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।

পরে ওই প্রকল্পের একাংশ জমি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও বাংলাদেশ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আবাসিক এলাকার খেলার মাঠ হিসেবে নির্ধারিত জমির অংশে পিডিবির উপকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে বলে প্লট মালিকদের মালিক। পুলিশের জন্য বরাদ্দকৃত জমিতে দীর্ঘদিন কোনো স্থাপনা না হলেও সম্প্রতি থানা ভবন নির্মাণের টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে।

দখল, জলাবদ্ধতা ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ
সিডিএর নির্মাণ বিভাগ-১ সূত্রে জানা গেছে, ব্রিজঘাট থেকে মইজ্জ্যারটেক পর্যন্ত সিডিএ সড়কের (সাড়ে তিন কিলোমিটার) দুই পাশে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা একাধিকবার উচ্ছেদ করা হলেও পুনরায় দখল হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কের দুই পাশের ড্রেন ও নালা ভরাট করে রাতারাতি গড়ে উঠছে দোকানপাট, ভবন ও বিভিন্ন স্থাপনা।
এতে বর্ষা মৌসুমে চরপাথরঘাটা ও চরলক্ষ্যা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধতায় ডুবে যায়। দীর্ঘদিন ধরে এসব অনিয়ম চললেও কার্যকর নজরদারি নেই বলে অভিযোগ তাদের।

চউকের নথি অনুযায়ী, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) কর্তৃক বাস্তবায়িত ব্রিজঘাট হতে মইজ্জ্যারটেকের ডিসি রোড (বর্তমান আক্তারুজ্জামান চত্বর) পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় এলএ মামলা নং–১২/৬৭–৬৮ এবং ১৫৪/৬৭–৬৮ মূলে চরপাথরঘাটা মৌজার আরএস ৩৩৫ ও ৩৫৩ দাগের অধীন বিএস দাগ নং–৬৬ ও ৮৪ অধিগ্রহণ করা হয়। অধিগৃহীত জমিতে সড়ক নির্মাণের পর অবশিষ্ট অংশ ভবিষ্যতে সড়ক সম্প্রসারণের জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। এলএ মামলা ও বিএস খতিয়ান অনুযায়ী জমিটি চউকের দখল ও মালিকানাধীন।

সড়ক নির্মাণের পর অবশিষ্ট জমি ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের জন্য সংরক্ষণ করা হলেও বর্তমানে সেই জমির বিভিন্ন অংশ দখলের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব জমি রক্ষা এবং পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

এছাড়া সিডিএ নির্মাণ বিভাগ-১ সুত্রে জানা যায়, ‘চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) এর আওতাধীন এলাকা কর্ণফুলী নদীর বামতীর মইজ্জারটেক হতে ষ্টোর ইয়ার্ড ফর ফ্লোটিং ব্রীজ (ভাসমান সেতু) পর্যন্ত (পিসি রোড) সড়কের উভয় পার্শ্বে ভাসমান অবৈধ স্থাপনা/অবকাঠামো কয়েকবার উচ্ছেদ করা হয়েছে। ওই জমির শেষ প্রান্তে ব্রিজঘাট বাজারটির অবস্থান।

যেখানে বিগত চেয়ারম্যানগণ মার্কেট করার পরিকল্পনা নিয়েছিলো তবে এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। যদিও দীর্ঘ ৪০ বছরেও স্থায়ীভাবে চরপাথরঘাটা ব্রিজঘাটে কোন কাঁচাবাজার প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন বিংবা ইউনিয়ন পরিষদের কোন উদ্যোগ চোখে পড়েনি। ফলে, ব্যবসায়ীরা সিডিএ সড়ক দখল করে ব্যবসা করছেন দিনের পর দিন। স্থায়ী মার্কেট হলে ভোগান্তি কমতো।

‘ওয়ান সিটি, টু টাউন’, কিন্তু কর্ণফুলী কোথায়?
সিডিএ জানিয়েছে, কর্ণফুলী টানেলকে কেন্দ্র করে ‘ওয়ান সিটি, টু টাউন’ ধারণা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আনোয়ারার জন্য পৃথক অ্যাকশন এরিয়া প্ল্যান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পলিকেন্দ্রিক উন্নয়ন মডেলের মাধ্যমে নগরীর ওপর চাপ কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ঘোষণার পর কর্ণফুলীবাসীর প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। তাদের ভাষ্য, টানেলের উত্তর প্রান্ত, শহরের প্রবেশদ্বার এবং দ্রুত শিল্পায়ন ও নগরায়ণের অন্যতম কেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও কর্ণফুলীর জন্য আলাদা উন্নয়ন পরিকল্পনা না থাকায় ভবিষ্যতে অব্যবস্থাপনা আরও বাড়তে পারে।

মতামত দেওয়ার সুযোগ
সিডিএ জানিয়েছে, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নাগরিকরা সরাসরি সিডিএ কার্যালয় অথবা ওয়েব-জিআইএস প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে খসড়া মহাপরিকল্পনার ওপর মতামত ও আপত্তি জানাতে পারবেন। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কর্ণফুলীর উন্নয়ন, সড়ক, ড্রেনেজ, জলাবদ্ধতা নিরসন, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পিত নগরায়ণের দাবিগুলো তুলে ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি আলহাজ্ব এম মঈন উদ্দিন বলেন, কর্ণফুলী উপজেলা বর্তমানে চট্টগ্রামের দ্রুত বিকাশমান একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। কর্ণফুলী টানেল, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বন্দরসংলগ্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দ্রুত নগরায়ণের কারণে এ উপজেলার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। সে বিবেচনায় নতুন মহাপরিকল্পনায় কর্ণফুলীর উন্নয়নকে আরও সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে সড়ক, ড্রেনেজ, জলাবদ্ধতা নিরসন, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়ে আলাদা কর্মপরিকল্পনা থাকা উচিত। গণশুনানির মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের মতামত নিয়ে পরিকল্পনাটি আরও বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী করা হবে বলে আমরা আশা করি।

গত শনিবার (১ আগস্ট) বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. বেলায়েত হোসেন।

প্রকৌশলী মো. বেলায়েত হোসেন জানান, পরিকল্পিত, টেকসই ও আধুনিক মহানগরী হিসেবে চট্টগ্রামকে গড়ে তুলতে ‘চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান (২০২৫-২০৫০)’ এর খসড়ার চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। রোববার (২ আগস্ট) থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬০ দিন নাগরিকদের মতামত ও আপত্তি গ্রহণ শেষে পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করা হবে।

প্রকৌশলী মো. বেলায়েত হোসেন বলেন, ১৯৬১, ১৯৯৫ ও ২০০৮ সালের পর এটি চট্টগ্রামের চতুর্থ মহাপরিকল্পনা। একটি এলাকার সমস্যা সেই এলাকার মানুষই সবচেয়ে ভালো জানেন। তাই নাগরিকদের যৌক্তিক মতামত যাচাই-বাছাই করেই পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করা হবে।

তিনি বলেন, অতীতে উন্নয়নের নামে নগরীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পাহাড় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন থেকে নকশার বাইরে কোনো ভবন নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না। নতুন আইন অনুযায়ী নকশা লঙ্ঘনকারীদের বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে। এ জন্য স্বরাষ্ট্র, আইন ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

আরও পড়ুন