৩ অক্টোবর ২০২৬

৬০ হাজার টাকা আদায়, গ্রেপ্তার ৪ কিশোর

সাগরে ডুবে কিশোরের মৃত্যু, লাশ গোপন রেখে অপহরণের নাটক

চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে বন্ধুদের সঙ্গে গোসল করতে নেমে সায়েদ মুনিফ আহমেদ শান (১৫) নামে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, শান সাগরে ডুবে যাওয়ার পর বিষয়টি গোপন করে বাড়ি ফিরে যায় তার চার বন্ধু। পরে শানকে অপহরণ করা হয়েছে জানিয়ে পরিবারের কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হয়।

গত ১৫ আগস্টের এ ঘটনায় শানের চার বন্ধুকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার তাদের চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাদের কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। গ্রেপ্তার চারজনই হালিশহরের চট্টগ্রাম মডার্ন স্কুলের শিক্ষার্থী। নিহত শান সন্দ্বীপের মগধারা এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের ছেলে।

পুলিশ, পরিবার ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ আগস্ট সকাল ১১টার দিকে স্কুলের কোচিং পরীক্ষায় অংশ নিতে বাসা থেকে বের হয় শান। পরীক্ষা শেষে দুপুর ১২টার দিকে চার বন্ধুর সঙ্গে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে যায় সে। সেখানে গোসল করতে নামার পর স্রোতের টানে শান ভেসে যায় বলে পুলিশকে জানিয়েছে তার বন্ধুরা।

তবে শানের মৃত্যুর বিষয়টি পরিবারকে না জানিয়ে চার কিশোর যার যার বাড়িতে চলে যায়। সন্ধ্যার পরও ছেলে বাড়ি না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। স্কুল ও বন্ধুদের কাছে খোঁজ করেও শানের সন্ধান না পেয়ে তারা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান।

পরদিন সকালে শানের বাবার মোবাইল ফোনে অজ্ঞাত একটি নম্বর থেকে কল আসে। ফোনে জানানো হয়, শানকে অপহরণ করে আটকে রাখা হয়েছে এবং তাকে মারধর করা হচ্ছে। ছেলেকে জীবিত ফেরত দেওয়ার বিনিময়ে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।

পরে পরিবারের পক্ষ থেকে একটি বিকাশ নম্বরে ৬০ হাজার টাকা পাঠানো হয়। কিন্তু এরপরও শানকে ছেড়ে দেওয়া হয়নি। বরং আরও টাকা দাবি করা হয় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার পর শানের বাবা হালিশহর থানায় প্রথমে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং পরে মামলা করেন। পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবে শানের চার বন্ধুকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে।

জিজ্ঞাসাবাদে চার কিশোর পুলিশকে জানায়, তারা সবাই ১৫ আগস্ট পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে গিয়েছিল। সেখানে গোসল করতে নামার পর স্রোতের টানে শান ভেসে যায়। বিষয়টি জানাজানি হলে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে—এমন আশঙ্কায় তারা কাউকে কিছু না জানিয়ে বাড়ি ফিরে যায়।

তবে অপহরণের নাটক সাজিয়ে পরিবারের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ তারা অস্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এদিকে হালিশহর থানা পুলিশ পতেঙ্গা থানায় যোগাযোগ করলে জানতে পারে, ১৫ আগস্ট সমুদ্রসৈকত থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় মরদেহটি আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামে হস্তান্তরের প্রস্তুতি চলছিল। পরে শানের পরিবারের সদস্যরা পতেঙ্গা থানায় গিয়ে মরদেহটি শনাক্ত করেন।

হালিশহর থানার এসআই মোশাররফ হোসেন বলেন, সমুদ্রসৈকতে গোসল করতে গিয়ে পানির স্রোতে শান ভেসে যায় বলে তার চার বন্ধু জানিয়েছে। ভয়ে তারা বিষয়টি কাউকে না জানিয়ে বাড়ি চলে যায়। পরে অপহরণের নাটক সাজিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে বলে পুলিশ জানতে পেরেছে।

তিনি বলেন, ‘শানকে হত্যা করা হয়েছে, নাকি এটি নিছক দুর্ঘটনা—ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।’ অপহরণ মামলায় চার কিশোরকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

শানের বাবা মাহবুবুর রহমান বলেন, ছেলে বাড়ি না ফেরায় তার বন্ধুদের ফোন করা হয়। স্কুলেও গিয়ে খোঁজ নেওয়া হয়। শান বন্ধুদের সঙ্গে পতেঙ্গায় যাবে, সেটিও বাসায় জানায়নি।

তিনি বলেন, ‘তাকে খুন করা হয়েছে, নাকি অন্য কিছু ঘটেছে, তা বলতে পারছি না। অপহরণের কথা বলে বিকাশে মুক্তিপণও নেওয়া হয়েছে। পুলিশ তদন্ত করছে। চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। আসল সত্য বের হয়ে আসুক, এটাই চাই।’

আরও পড়ুন