২৩ অক্টোবর ২০২৬

চট্টগ্রাম বন্দর এখন রাষ্ট্রীয় সাইবার সুরক্ষার আওতায়

জাতীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরের ডিজিটাল অবকাঠামো এখন রাষ্ট্রীয় সাইবার সুরক্ষার আওতায় এসেছে। সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে (চবক) ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো’ (ক্রিটিক্যাল ইনফরমেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার—সিআইআই) হিসেবে ঘোষণা করেছে।

সোমবার (৩১ আগস্ট) জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর ধারা ১৫ অনুযায়ী এ ঘোষণা দেওয়া হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে।

বাংলাদেশে এতদিন ৩৬টি সংস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো (সিআইআই) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এ তালিকায় যুক্ত হওয়ায় বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল সিস্টেমগুলো এখন আরও উচ্চতর রাষ্ট্রীয় সাইবার সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আসবে।

বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, এ সুরক্ষা শুধু সাইবার নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। বন্দরের ডেটা সেন্টার, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ডেটাবেজ, অ্যাপ্লিকেশন পর্যায়ের যোগাযোগ এবং এপিআই হাবসহ সামগ্রিক তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এর আওতায় থাকবে। এর মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান আরও সুস্পষ্ট হয়েছে।

বন্দর সূত্র জানায়, দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কনটেইনার ব্যবস্থাপনা, জাহাজ চলাচল, শুল্ক ও রাজস্ব প্রক্রিয়াকরণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ডিজিটাল সিস্টেম বন্দরের কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব ব্যবস্থায় সাইবার হামলা বা বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে দেশের বাণিজ্য, শিল্পোৎপাদন ও জনজীবনে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।

এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বন্দরের ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তা জোরদারে সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সামগ্রিক কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যবহৃত ডিজিটাল সিস্টেমগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি নির্ধারিত মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ওই মূল্যায়নে উত্তীর্ণ হওয়ার পর চবক সিআইআই হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

সিআইআই ঘোষণার ফলে বন্দরের অগ্রাধিকারভুক্ত সিস্টেমগুলোতে উচ্চতর সাইবার নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ বাধ্যতামূলক হবে। এর মধ্যে নিজস্ব সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার (এসওসি) ও সাইবার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম (সিআইআরটি) পরিচালনা, ২৪ ঘণ্টা সাইবার নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা, ঝুঁকি নিরূপণ, দুর্বলতা মূল্যায়ন ও অনুপ্রবেশ পরীক্ষা অন্যতম।

এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের এনক্রিপটেড ও অফলাইন ব্যাকআপ, ব্যবসায়িক ধারাবাহিকতা পরিকল্পনা (বিসিপি), দুর্যোগ পুনরুদ্ধার (ডিআর) ব্যবস্থা এবং এসব ব্যবস্থার নিয়মিত পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সি ও জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা অপারেশন সেন্টারে নিয়মিত প্রতিবেদন এবং সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা রিপোর্টিংয়ের ব্যবস্থাও থাকবে।

সিআইআইর নিরাপত্তা বিধান লঙ্ঘন কিংবা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোয় অননুমোদিত প্রবেশ আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সির নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে ডেডিকেটেড সাইবার নিরাপত্তা টিম গঠন, তথ্য পরিকাঠামোর পূর্ণাঙ্গ ইনভেন্টরি তৈরি, নিরাপত্তা নীতিমালা হালনাগাদ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান বলেন, সরকারের এ সিদ্ধান্ত চট্টগ্রাম বন্দরের কৌশলগত ও জাতীয় গুরুত্বের একটি সুস্পষ্ট স্বীকৃতি। বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে বন্দরের নিরাপদ, নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল কার্যক্রম নিশ্চিত করা জাতীয় দায়িত্ব।

তিনি বলেন, বন্দরের ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল রূপান্তরের সঙ্গে সাইবার ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই সাইবার নিরাপত্তাকে শুধু তথ্যপ্রযুক্তিগত বিষয় হিসেবে নয়, বন্দরের অপারেশনাল ধারাবাহিকতা, জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামো ও ডিজিটাল সেবা সুরক্ষিত রাখতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ, নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং সাইবার হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতা আরও জোরদার করা হবে বলেও জানান তিনি।

বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, সিআইআই ঘোষণার ফলে আমদানি-রপ্তানিকারক, শিপিং এজেন্ট, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টসহ বন্দর ব্যবহারকারীরা আরও সুরক্ষিত ও নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল সেবা পাবেন। একই সঙ্গে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষায় এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আরও পড়ুন