২১ মার্চ ২০২৬

আবরার হত্যা: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া

বাংলাধারা ডেস্ক »

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েটে) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের নিহতের ঘটনায় ফেসবুক ব্যবহারকারী  শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষেরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সোমবার (৭ অক্টোবর) সকালে আবরারের লাশ উদ্ধারের পর এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে সোচ্চার রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো।

আবরারকে কোথায় ডেকে নেওয়া হয়, কখন ডেকে নেয়, কারা ডেকে নিয়ে গিয়েছিল— সবকিছুই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেরিয়ে আসছে। আবরারের সহপাঠীদের দাবি— ‘ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক চুক্তি নিয়ে দেওয়া ফেসবুক স্ট্যাটাসই কাল হয়েছে তার। তাদের দাবি, এ হত্যার বিচার করতে হবে।’

আবরার হত্যার বিচার দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়া বিভিন্ন জনের স্ট্যাটাস হুবহু তুলে ধরা হলো-

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘বুয়েট ছাত্র আবরারের অপরাধটা কী? আমি তো বলবো আরেকটা বিশ্বজিতের ঘটনা ঘটলো। পার্থক্য হলো— বিশ্বজিতকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে, আর আবরারকে বুয়েটের হলে। এছাড়া তো আমি কোনো পার্থক্য দেখি না। দুজনকেই শিবির সন্দেহে বর্বরভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হলো। দুজনই সাধারণ গরিব পরিবার থেকে উঠে আসা। আচ্ছা, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে পিটিয়ে ছাত্রহত্যার অধিকার তো কেউ কাউকে দেয়নি। কারও অপরাধ থাকলে পুলিশ, প্রশাসন আছে কেন? আমি বিশ্বজিতের মতো আবরার হত্যারও বিচার চাই। কারা এই হামলাকারী খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তি দেয়া হোক।’

আবরারের পরিচিত বোস্টন সায়েন্টিফিকের প্রকৌশলী চমক হাসান ফেসবুকে লিখেছেন, ‘লাশ হয়ে গেলো বুয়েটের ছেলেটা। আবরার ফাহাদ। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ২০১৭ ব্যাচ। এবার দেশে গিয়ে পরিচয় হয়েছিল ওর সঙ্গে। বলেছিল, ভাইয়া আমি আপনার স্কুলে ছিলাম— কুষ্টিয়া জেলা স্কুলে, এখন আপনার ডিপার্টমেন্টে। আমার স্কুলের আমার বিভাগের সেই ছেলেটা খুন হয়েছে শেরে বাংলা হলে। সন্ধ্যা ৭-৮টার দিকে বুয়েট ছাত্রলীগের একদল ছাত্র* তাকে ডেকে নিয়ে গেছে। রাত দুইটার দিকে হলের সিড়িতে পড়ে থাকতে দেখা গেছে তার লাশ। সংবাদ মাধ্যমে কোনও উচ্চবাচ্য নেই। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনও স্পষ্ট বক্তব্য আসেনি। সিসিটিভির ফুটেজে নাকি সমস্যা আছে বলা হয়েছে। কেউ ধামাচাপা দেবার চেষ্টা করছে এইটুকু নিশ্চিত। আমি এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।’

ছাত্র ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক সাদিক রেজার স্ট্যাটাস— ‘বাংলাদেশ ও কাশ্মিরে ভারতের নানা আধিপত্যবাদী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ফেসবুকে সরব ছিলেন আবরার।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মীর্জা তাসলিমা সুলতানা লিখেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর টর্চার সেলের এবং ‘মজা করার’ নামে নানান কিসিমের টর্চারের অনুমোদন কি দিয়ে রাখিনি আমরা?!’

অলিউর রহমান লিখেছেন, বুয়েটের আবরার হত্যা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে হার মানালো। কলিজা ছিড়ে যাচ্ছে। যে কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা যায়না।

এস আই শাহেদ লিখেছেন, আবরার ফাহাদের বাবা-মা’র স্বপ্ন ঘুমিয়ে গেছে অন্যকোন এক বাবা-মা’র স্বপ্নের হাতে।

প্রবাসী ফারাবি মাহমুদ লিখেছেন— ‘আমি ছাত্র থাকা অবস্থায় স্ট্যাটাস দেয়ার কারণে মাইর খাওয়ার থ্রেট খাইছি। আমার ইমিডিয়েট জুনিয়র ব্যাচের ছাত্র স্ট্যাটাস দেয়ার কারণে মাইর খাইছে। আর আমার হলের ছয় বছরের জুনিয়রকে পিটিয়ে মেরেই ফেললো! জানি, বিচার নাই, তবুও বিচার চাই! চিৎকার করে বিচার চাই।’

রোববার দিবাগত রাত ৩টার দিকে বুয়েটের শের-ই বাংলা হলের নিচতলা থেকে ফাহাদের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

পরিবার ও সহপাঠীদের অভিযোগ, ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সহপাঠীরা বলছেন, রাত ৮টার দিকে শেরেবাংলা হলের এক হাজার ১১ নম্বর কক্ষ থেকে কয়েকজন ফাহাদকে ডেকে নিয়ে যায়। এর পর রাত ২টা পর্যন্ত তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

তাদের ধারণা, ২ হাজার ১১ নম্বর রুমে নিয়ে তাকে পেটানো হয়। পরে শেরেবাংলা হলের একতলা ও দুই তলার মাঝখানের সিঁড়ি থেকে ফাহাদের লাশ উদ্ধার করা হয়।

ফাহাদের এক সহপাঠী জানান, যারা ফাহাদকে ডেকে নিয়ে যায় তাদের আমরা চিনি। কিন্তু এ মুহূর্তে তাদের নাম বলতে চাচ্ছি না। তবে কে বা কারা তাকে হত্যা করেছে, এ বিষয়ে এখনও কিছু জানাতে পারেনি পুলিশ। এদিকে এ বিষয়ে বুয়েট কর্তৃপক্ষও এখনও কিছু বলেনি।

পুলিশ ও তার পরিবার বলছে, ফাহাদের গায়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল। শরীরের পেছনে, বাম হাতে ও কোমর থেকে পায়ের নিচ পর্যন্ত আঘাতের কালো দাগ ছিল।

ফাহাদ বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের লেভেল-২ এর টার্ম ১-এর ছাত্র ছিলেন। তিনি শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষে থাকতেন। তার বাড়ি কুষ্টিয়া শহরে। বাবা বরকত উল্লাহ এনজিও কর্মী। আর মা রোকেয়া বেগম কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতা করেন। দুই ভাইয়ের মধ্যে আবরার বড়। তার ছোট ভাই ঢাকা কলেজে পড়ে।

ফাহাদের অপর মামাতো ভাই জহিরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ফাহাদের সঙ্গে কারও কোনো শত্রুতা ছিল না। সে কুষ্টিয়ায় গিয়েছিল। গতকালকেই বিকালে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় এসে হলে ওঠে। তার পর মধ্যরাতে খবর পাই ভাই মারা গেছে।

চকবাজার থানার এসআই দেলোয়ার হোসেন বলেন, রাত পৌনে ৩টার দিকে বুয়েট কর্তৃপক্ষ আমাদের ফোন করে বিষয়টি জানায়। পরে আমরা গিয়ে শেরেবাংলা হলের বাইরে নিচতলা থেকে লাশ উদ্ধার করে ঢামেকে নিয়ে আসি।

ফাহাদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে উল্লেখ করে পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, আঘাত কোনো অস্ত্রের নয়। কোনো কিছু দিয়ে বাড়ি দেয়া হয়েছে। কেন এত রাতে সে বাইরে গিয়েছিল, তা কেউ বলতে পারেনি।

বুয়েটের শেরেবাংলা হলের চার বেডের রুম ১০১১-এ থাকতেন আবরার। ওই রুমে সব মিলিয়ে ৮-১০ শিক্ষার্থী থাকেন। ওই কক্ষে ছাত্রলীগের তিন নেতাও থাকতেন, এরা ঘটনার পর থেকে পলাতক। এ ঘটনার পর থেকে ওই কক্ষের অন্য শিক্ষার্থীরা ভয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলছেন না।

আবরার যে ফ্লোরে থাকতেন সেই ফ্লোরের একটি রুমের এক আবাসিক শিক্ষার্থী বলেন, রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে দুটো ছেলে এসে আবরারকে ডেকে নিয়ে যায়। ঘণ্টা দুয়েক পর ওরা আবরারের জামাকাপড় নিতে আসে। এর কিছুক্ষণ পর আমি ওই রুমে গিয়ে দেখি বাকি রুমমেটরা কান্নাকাটি করছে।’

আরেক রুমের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘রবিবার রাত ২টার দিকে দোতলার সিঁড়িতে পানি আনতে গিয়ে দেখি সিঁড়িতে তোশকের ওপর আবরারকে ফেলে রাখা হয়েছে। তখন সেখানে আরও তিনজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। ওরা সবাই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এ অবস্থা দেখে ট্রমাটাইজ হয়ে আমি রুমে চলে আসি। পরে আবার গিয়ে দেখি সেখানে দুজন দাঁড়িয়ে আছে। তখন আবরার প্রায় মৃত। পরে আমরা ডাক্তার ডাকি। এর পর অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে চাইলে ডাক্তার বলেন, ও তো মারা গেছে, অ্যাম্বুলেন্স ডেকে কী করবা। পরে পুলিশ এসে লাশ নিয়ে যায়।’

হলের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, ২০১১ নম্বর রুমে আবরারকে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে।

বাংলাধারা/এফএস/এমআর/টিএম

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ