২১ মার্চ ২০২৬

স্বরূপ বড়ুয়ার ‘নির্মল বায়ুর অপেক্ষায়’

মুহাম্মদ আব্দুল আলী »

বেশ কয়েকদিন আগে চেরাগী মোড় থেকে প্রেসক্লাব হয়ে জামাল খান মোড়ের দিকে যাচ্ছি। তখন সকাল প্রায় এগারোটা। ফেস্টুন হাতে নিয়ে একটা ব্যানার টাঙিয়ে মাটিতে একটি চাদর বিছিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাক্স বিতরণ করছেন। প্যান্ট পরা খালি গায়ে মানুষকে সচেতনমূলক স্লোগন ও মাক্স বিতরণ করছেন নিজস্ব অর্থে। ফেস্টুন ও ব্যানারে লিখা স্লোগানসহ আরো নানা সচেতনমূলক স্লোগান দিয়ে মানুষকে আহ্বান করছেন মাক্স নেয়ার জন্য। শুধু মাক্স বিতরণ নয় তার সামনে দাঁড়ানো ব্যক্তি কিংবা কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে তিনি আগ্রহের সাথে কথা বলছেন ঐ ব্যক্তির সাথে।

একই সাথে পথচারী নাগরিকদের আহ্বান জানাচ্ছেন যেন সবাই এ ধুলোবালির শহরে চলাচলে এ মাক্স ব্যবহার করে এবং জীবনকে নিরাপদ রাখে। এমনই একজন মানুষ প্রায় প্রতিদিন নগরীর অলি-গলিতে এভাবে নাগরবাসীর মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করে যাচ্ছেন। যা বর্তমান ব্যস্ত নগরীতে ব্যক্তিগত একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। বলছি স্বরূপ বড়ুয়ার কথা।

স্বরূপ বড়ুয়া। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায় তার বাড়ি। তিনি নিজস্ব অর্থে মাক্স বিতরণ করে আসছেন নগরীর মোড়ে মোড়ে। তিনি চান বাংলাদেশ বায়ু দূষণমুক্ত থাকুক, জীবন নিরাপদ হোক, সুস্থ থাকুক নগরবাসী ও তাদের সন্তানেরা। তিনি স্লোগানে স্লোগানে উচ্চারণ করছেন- ‘সুস্থ থাকার জন্য মাক্স পরিধান করুন, একটি মাক্স একটি নতুন জীবন, জগতের সকল প্রাণী সুখি হোক।’

ফেস্টুনে লিখা আছে, “বায়ু দূষণ থেকে মুক্ত থাকুন, মাক্স পড়ুন’, বাংলাদেশ কে বায়ু দূষিত দিল্লী বানাবেন না।’, A Mask is s new life, Use a mask to avoid air pollution’, এবং শরীরে সাদা কালিতে লিখা আছে “মাক্স পড়ুন, সুস্থ থাকুন”, ‘সবাই বাঁচতে চাই, নির্মল বায়ুর অপেক্ষায়।”

স্বরূপ বড়ুয়া দেশের বিভিন্ন সমস্যার ইস্যু নিয়ে নানা আঙ্গিকে এভাবে নিরব প্রতিবাদ করে যাচ্ছেন। এর আগে তাকে দেখা যায় শিশু ধর্ষণসহ সব ধরনের ধর্ষণের প্রতিবাদ ও ধর্ষকদের বিচার চেয়েছিলেন একি আঙ্গিকে ফেস্টুন ও খালি গায়ে স্লোগান লিখে নগরীর মোড়ে মোড়ে ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে।

ধর্ষণকারীদের বিচার চেয়ে নগরীর প্রেস ক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করছেন স্বরূপ বড়ুয়া

এর আগে তাকে নগরীর জামাল খানস্থ প্রেস ক্লাবের সামনে সন্ধ্যায় দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে দেখা যায়। ডান হাতে দু’টি ফেস্টুন ও বাম হাতের মশাল জ্বলছে। খালি গায়ে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। নিরবে যেন তীব্র প্রতিবাদ করে যাচ্ছেন তিনি। ফেস্টুনে লেখা আছে ‘মা-বোনকে বাঁচাতে হবে ধর্ষণকারীকে মিত্যুদণ্ড দিতে হবে’, ‘নতুন আইন করতে হবে ২ মাসের মধ্যে ধর্ষণকারীকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে’, আর বুকে সাদা কালিতে লেখা ছিল ‘মা-বোনকে রক্ষা কর, ধর্ষণকারীকে মৃত্যুদণ্ড দাও’।

পথচারী কিছুক্ষণের জন্য হলেও দাঁড়াচ্ছে, পড়ছে এ স্লোগানগুলো এবং কথাও বলছে তার সাথে এ বিষয় নিয়ে। অনেকে প্রশ্ন করছেন তাকে, প্রশ্নের উত্তরও দিচ্ছেন তিনি। সেই সুবাধে আমিও কথা বলা চেষ্টা করেছি তার সাথে। এ প্রতিবাদের বিষয়ে জিজ্ঞাস করলে স্বরূপ বড়ুয়া বলেন, ‘দেশজুড়ে যে ধর্ষণ, হত্যা চলছে এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই। আমি চাই মা-বোনদের যারা ধর্ষণ ও হত্যা করছে তাদের অতি দ্রুত বিচারের কাঠগড়ায় আনা হোক, মৃত্যুদণ্ড দেয়া হোক।’

তিনি বলেন, আমি প্রায় সপ্তাহ ধরে এ প্রতিবাদ করে যাচ্ছি। সাধারণ জনগণেরও এখন সময় এর প্রতিবাদে স্বতস্ফূর্তভাবে রাজ পথে নেমে আসা। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভয়মুক্ত, সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা।

স্বরূপ বড়ুয়া সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি চাই নতুন আইন করা হোক এবং অতি দ্রুত ধর্ষণকারীকে মৃত্যুদণ্ড হোক। যাতে এ ধর্ষণ পুনরাবৃত্তি না ঘটে। সরকারের কাছে আবেদন করছি, যেন দ্রুত এসব বিচার সম্পন্ন করেন।’

বায়ু দূষণে সচেতনতামূলক প্রচারণায় নগরীর আন্দরকিল্লা এলাকায় স্বরূপ বড়ুয়া

পরবর্তীতে এই স্বরূপ বড়ুয়াকে দেখা যায় সাম্প্রতিক নগরজুড়ে ধুলোবালি থেকে জনসাধারণ সচেতনমূলক প্রচারণায়। এই যে তার এ ধরনের প্রতিবাদের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও ছাড়িয়ে পড়ে। তিনি একাই প্রতিবাদ করছে ঠিকই কিন্তু তার এই প্রতিবিাদের সাথে, আবেগের সাথে সংহতি জানিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছে অনেকে।

তখন সারাদেশে চলমান ধর্ষণ নিয়ে প্রতিবাদী তার এ আন্দোলন নিয়ে অভিজিৎ বড়ুয়া জিকু নামে একজন স্বরূপ বড়ুয়ার আন্দোলনরত ছবি দিয়ে ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন “এই ব্যক্তি(স্বরূপ বড়ুয়া) একাই আন্দোলন করছেন প্রায় সাত দিন ধরে। ওনার আবেগের সাথে সংহতি জানাচ্ছি। ধর্ষক ও এদের আশ্রয়-প্রশ্রয়কারীদের বিরুদ্ধে জেগে উঠুক এক এক করে সকলেই।”

আভিলাষ মাহমুদ নামের একজন লিখেছেন, “একটি মাক্স একটি নতুন জীবন, নাম স্বরূপ বড়ুয়া, বাড়ি পটিয়া। তিনি গতো ২০ দিন ধরে নিজের অর্থ থেকে ২০ হাজর মার্ক্স বিতরণ করে আসছেন। ধুলো বালির কারণে কী পরিমান মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে তা আমরা বুঝতে পারছি না। চট্টগ্রাম ওয়াসায়ও লেখা আছে দৈনিক দু’বার রাস্তা/ সড়ক বা উঠোনে পানি দেয়া, শীতকালে ইট ভাটা বন্ধ রাখা।বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, দিল্লীর স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এ বায়ু দূষণের কারণে। তিনি (স্বরূপ বড়ুয়া) চান বাংলাদেশ বায়ু দূষণ মুক্ত থাকুক। সুস্থ থাকুক আপনার আমার সন্তানেরা। সুস্থ থাকার জন্য মাক্স পরিধান করুন। একটি মাক্স একটি নতুন জীবন। জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।”

Rahman Nayan নামের একজন লিখেছেন, “আজকে (৩ নভেম্বর) চট্টগ্রামের জিইসি মোড়ে, সেন্টালের পাশেই উনি সবাইকে মুখে মাস্ক পড়ার জন্যে নিজ উদ্দ্যেগে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
শরীরের সামনে ও পেছনে সাদ কালি দিয়ে “বাতাসে বিষ মাস্ক পড়ুন” লিখা। ❤ ব্যাপার টা খুব ভালো লেগেছে, সবাইকে সচেতন করবার জন্যে একাই লড়ে যাচ্ছেন। উনির নাম জানা হয় নি,কথা বলার সুযোগ ছিল না।”

ভিডিও দেখতে ক্লিক করুন…

https://www.facebook.com/iamrahmannayan/videos/pcb.1377651872398518/2654033351492127/?type=3&theater&ifg=1

আরেকজন লিখেছেন, “রাস্তার মাথা থেকে বহদ্দারহাট এর বায়ু দূষণ। দিল্লির চেয়ে বেশি।”

প্রতিদিন ক্রমেই বেড়ে চলেছে বায়ূ দূষণ। এমনি রাজধানী ঢাকা বিশ্বের দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় শুরুর দিকে রয়েছে। সাম্প্রতিক মাত্রাতিরিক্ত ধুলোবালির কারণে এ দূষণের মাত্র আরো বাড়ছে। রাস্তার বিভিন্ন স্থানে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে এই ধুলোই হয়ে উঠেছে নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী। এছাড়াও এ শীতের শুষ্ক হাওয়ায় ধুলোর কারণে এই দূষণের মাত্রা এখন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

পরিবেশবিজ্ঞানীদের ভষ্যমতে, মাত্রাতিরিক্ত ইটভাটা, যানবাহন, নির্মাণকাজ ও কলকারখানার ধোঁয়ার কারণে ঢাকাসহ দেশের প্রধান শহরের মানুষ আসলে এক অবিশ্বাস্য বিষাক্ত গ্যাসে বলয়ের মাঝে বাস করছে।

বাংলাধারা/এফএস/টিএম/এএ

আরও পড়ুন