পটিয়া প্রতিনিধি »
চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের চরকানাই, হুলাইন, পাচুরিয়া এবং হাবিলাসদ্বীপ গ্রামবাসীকে অব্যাহতভাবে সুপেয় পানি সরবরাহের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি বেলার করা এক রিটে জারি করা রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে মঙ্গলবার বিচারপতি তারিক উল হাকিম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ারদীর হাইকোর্ট বেঞ্চ কয়েকটি নির্দেশনা দিয়ে এ রায় দেন।
রায়ে ভুক্তভোগী চার গ্রামের মানুষের অব্যাহতভাবে সুপেয় পানি সরবরাহ করতে পানিসম্পদ, স্বাস্থ্য, কৃষি, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও পটিয়া উপজেলা চেয়ারম্যানের প্রতি এ নির্দেশ দেওয়া হয়।
আদালত পানি আইন ২০১৩-এ ধারা (১৭)-এর অধীনে চরকানাই, হুলাইন, পাচুরিয়া এবং হাবিলাসদ্বীপ গ্রামগুলোকে পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণার বিষয়ে আগামী তিন মাসের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছেন। একইসঙ্গে বিবাদী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন থেকে বিরত থাকতে ও নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং জেলা প্রশাসককে আদালতে আটিটি শিল্প প্রতিষ্ঠান কর্তৃক করা দূষণের পরিমাণ যাচাই করে তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।
এছাড়াও ভবিষ্যতে এই চারটি গ্রামে বিকল্প পানির ব্যবস্থা না করে ভূ-গর্ভস্থপানির উপর নির্ভর করে কোনো লাল বা কমলা- খ শ্রেণির শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হতে পারবে না। পটিয়া উপজেলায় পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া এবং কার্যকরী বর্জ্যশোধনাগার প্ল্যান ছাড়া কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান যেন পরিচালিত হতে না পারে তা নিশ্চিত করতে পরিবেশ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশ প্রতিপালন বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে মেমো প্রস্তুত করে আদালতে দাখিলে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বেলা’র পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন সিনিয়র আইনজীবী ফিদা এম কামাল, আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, মিনহাজুল হক চৌধুরী, আলী মুস্তফা খান এবং সাঈদ আহমেদ কবীর।
জানা যায়, হাবিলাসদ্বীপ এলাকায় আটটি শিল্প প্রতিষ্ঠান ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে উপজেলার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের চরকানাই, হুলাইন, পাচুরিয়া এবং হাবিলাসদ্বীপ গ্রামে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের স্থাপতি ৩৫০টি টিউবওয়েল বিকল হয়ে পড়লে গ্রামগুলোর প্রায় ৩০ হাজারের ও বেশি মানুষ সুপেয় পানির তীব্র সংকটে পড়ে। যে আটটি শিল্প প্রতিষ্ঠানকর্তৃক ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে গ্রামগুলো এ পানি শূন্যতায় ভোগে তাদের মধ্যে ছয়টির পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই এবং বেশিরভাগই বর্জ্য শোধনাগার প্ল্যান ছাড়া পরিচালিত হয়ে আসছে । প্রতিনিয়ত তাদের সৃষ্ট দূষণে পার্শ্ববর্তী বোয়লখালী খাল, গরুলুটা খাল ও আলমডাঙা খালের পানি দূষিত হয়ে পড়লে গ্রামবাসী সুপেয় পানির পাশাপাশি চাষাবাদের পানির ও তীব্র সংকটে পড়ে।মাঝে মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর এ তিনটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করলেও প্রতিষ্ঠানগুলো আইন অমান্য করে এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে জরিমানাও প্রদান না করে কার্যক্রম অব্যাহত রাখে।
পটিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী জানান, এ মামলা এবং রায় সম্পর্কে আমি অবগত নই।আমি আপনার মাধ্যমে জানলাম। তবে হাইকোর্টের নির্দেশনার রায়ের কপি আমি হাতে পেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করব।
এ ব্যাপারে হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ শফিকুল ইসলাম জানান, মহামান্য হাইকোর্টের এ নির্দেশনাকে আমি আমার ও এলাকাবাসীর পক্ষ হতে সাধুবাদ জানাচ্ছি। এখন ব্যাপার হলো স্হানীয় সরকার, উপজেলা, পানি উন্নয়ন বোর্ড তারা কিভাবে ব্যাপারটিকে গুরুত্ব সহকারে নিয়ে সুপেয় পানির ব্যাবস্হা করে তা দেখার বিষয়। তবে আমি বলব গভীর নলকূপ স্হাপন না করে এলাকায় একটি ওয়াটার প্লান্ট স্হাপন করে খাল হতে পানি এনে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সুপেয় পানির ব্যাবস্হা করলে এ সংকট থেকে মুক্তি মিলবে বলে মনে করি।
পরিবেশবাদী সংঘঠন পিপলস ভয়েসের সভাপতি শরীফ চৌহান বলেন, নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। আদালতের এ নির্দেশনার মধ্যদিয়ে এলাকাবাসীর দীর্ঘ দিনের দাবী পূরনের বাস্তবায়ন হবে এবং সুপেয় পানির হাহাকার সহসাই সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের যথাযথ উদ্যোগের মাধ্যমে মিটবে বলে মনে করেন তিনি।
হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের পাচুরিয়া গন্ধকুটি বিহার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক দোলন কান্তি বড়ুয়া বলেন, হাইকোর্ট কতৃক হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের চারটি গ্রামের প্রায় ত্রিশ হাজারের ও বেশি মানুষের সুপেয় পানি সরবরাহের নির্দেশনা দৃষ্টান্ত স্হাপন করলেন। আমি মনে করি এলাকার মানুষের মধ্যে সুপেয় পানির যে সংকট এতোদিন ছিল তা এ নির্দেশনার ফলে দ্রুত বাস্তবায়নে প্রদক্ষেপ নিলে এলাকার মানুষের নানা ধরনের রোগব্যাধীর হাত হতে ও রক্ষা পাবে।
হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের দক্ষিণ হুলাইন নিমতল এলাকার বাসিন্দা কে, এম শাহজাহান বলেন, পটিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ৫ নং হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়টি ইতিহাস সমৃদ্ধ ও বহুজ্ঞানীগুনি ব্যক্তির জন্ম এই ইউনিয়নে, হুলাইন, পাচুরিয়া, চরকানাই ও হাবিলাসদ্বীপ এই চারটি গ্রাম ও মৌজা নিয়ে এই ইউনিয়নের অবস্হান প্রায় ৩০ হাজারের অধিক লোকের বসবাস এই গ্রামগুলোতে আজকের মহামান্য হাইকোটের যে রায় তা অবশ্যই যুগান্তকারী হাইকোট যাদের উদ্দেশ্য এই বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে জনস্বার্থ বিবেচনায় অতি দ্রুত ব্যবস্হা গ্রহন করবে বলে আশা রাখি, এই এলাকার একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে মনেকরি, অতীতে জনপ্রতিনিধি ও এলাকার কিছু স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি হাসিলের জন্য ফ্যাক্টরি মালিকদের কাছ থেকে সুবিধাভোগ করে এহেন গর্হিত কাজে উৎসাহিত করে এলাকাবাসীকে সুপেয় পানির দুর্ভোগে ভোগতে হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। তাই আমি বলব আমরা বা আমি বা এলাকার জনসাধার শিল্পায়নের বিপক্ষে নয় শিল্পায়ন যদি করতে হয় যথাযথ কতৃপক্ষের অনুমতি ও নিয়ম নীতির আলোকে বাস্তবায়ন হবে বলে মনে করছি।
জানা যায়, ২০১৪ সালের ৩০ জুন একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনের সূত্র ধরে হাইকোর্টে রিট করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। ওই রিটের শুনানি নিয়ে আদালত এর আগে রুল জারি করেছিলেন। আজ সেই রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে এ রায় ঘোষণা করা হয়।
বাংলাধারা/এফএস/টিএম












