৩০ মার্চ ২০২৬

অসচেতনতায় সৈকতে ‘লাশ’ হয় পর্যটক

সায়ীদ আলমগীর, কক্সবাজার »

চলছে পর্যটন মৌসুম। প্রতিদিনই কক্সবাজার বেড়াতে আসছেন অগণিত ভ্রমন পিপাসু আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা। সৈকতের বালিয়াড়িতে এসে সাগর জলের সান্নিধ্য নিতে উন্মুখ হচ্ছেন সববয়সী পর্যটক। কিন্তু সাগরের আচরণ না বুঝে বা সাগর সম্পর্কিত নির্দেশনা না মেনে ঢেউয়ের ছোঁয়া নিতে গিয়ে অথৈ জলে হারিয়ে লাশ হচ্ছে অনেকে। এতে বিষাদে পরিণত হচ্ছে আনন্দ ভ্রমণ। তাই লাইফগার্ড, বিচকর্মীর নজরদারি লাগানো পয়েন্ট ছাড়া অন্যস্থানে অনায়াসে গোসলে না নামতে নির্দেশনা দেয় বিচ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টরা।

তবে, পর্যটন উন্নয়নে সাগরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে দক্ষ উদ্ধারকর্মী, সী-নেটিং ব্যবস্থা, ভ্রাম্যমান চিকিৎসা সেবা, রেসকিউ টাওয়ার স্থাপনে পরামর্শ দিয়েছেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (পর্যটন সেল) মুসা নাসের চৌধুরী বলেন, সাগরের আচরণ সবসময় পাল্টায়। জোয়ারের সময় যেস্থানে সমতল, ভাটার সময় সেখানে খাদের সৃষ্টি হতে পারে। ঘূর্ণিপাকে হঠাৎ সৃষ্টি চোরাবালির। তাই সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্ট যেখানে লাইফগার্ড ও বিচকর্মী দায়িত্বপালন করে সেখানে ছাড়া, সিগাল, ডায়াবেটিস হাসপাতাল পয়েন্টে গোসলে নামা অনিরাপদ। একইভাবে হিমছড়ি, ইনানী, পেঁচারদ্বীপ, টেকনাফ ও সেন্টমার্টিন সাগরে গোসল করতেও সতর্কতা অবলম্বন জরুরী। এসব স্থানে নজরদারি রেখে উদ্ধারকর্মী দেয়ার মতো পর্যাপ্ত জনবল প্রশাসনের নেই। তাই সৈকত জুড়ে লাল নিশানা উড়ানো স্থানে গোসলে না নামা উচিত।

তাঁর কথার সমর্থন জানিয়ে আন্তর্জাতিক ড্রাউনিং রিসার্চ সেন্টার-বাংলাদেশ (আইডিআরসি-বি)’র সী-সেইফ প্রজেক্ট ম্যানেজার ইমতিয়াজ আহমদ বলেন, পর্যটকদের সতর্ক করতেই লাল নিশানা উড়ানো হয়। ভাটায় গোসলে নামা নিষেধ। কিন্তু অনেকে এসব নির্দেশনা না মেনে যখন-তখন যেখান সেখান দিয়ে সৈকতে গোসল করতে নেমে যায়। এভাবে অসতর্কতায় গত ২০১৯ সালেই সাগরের পানিতে ডুবে মারা গেছেন ৯ জন। এসময় বিপদাপন্নভাবে ৫৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করে ১১ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। ২০১৮ সালে মারাযান ১৩ পর্যটক। সে হিসেবে মৃতের সংখ্যা ধীরে কমে আসছে। ২০১৪ সাল হতে ২০১৯ পর্যন্ত সময়ে উদ্ধার ২৭৬ বিপদাপন্নের মাঝে ৫৮ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হয়েছে। আর গত এক দশকে গোসলে নেমে অসতর্কতায় ভেসে গিয়ে প্রাণ হারান শতাধিত পর্যটক। এদের বেশিরভাগ সাগরের পানিতে নামার নির্দেশনা না মেনে বা গুপ্তখালে পড়ে ভেসে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।

সূত্র মতে, গত ২৫ ডিসেম্বর কক্সবাজারে বেড়াতে এসে পেঁচারদ্বীপ সৈকতে গোসলে নেমে ভেসে গিয়ে প্রাণ হারান খুলনা সোনাডাঙ্গার আওয়ামীলীগ নেতা সাব্বির আহমদের ছেলে স্কুল শিক্ষার্থী রেদওয়ান আহমেদ দেলোয়ার (১৪)। দেলোয়ারের মামা ও ঢাকার ব্যবসায়ী আবু সাদাত মোহাম্মদ লাভলুর মালিকানাধীন পেঁচারদ্বীপ এলাকার রিসোর্টে তারা উঠেছিলেন। নিখোঁজের একদিন পর তার মরদেহ উদ্ধার করে কক্সবাজারের ট্যুরিস্ট পুলিশ। আনন্দকে বিষাদে রূপদিয়ে চোখের জলে কক্সবাজার ত্যাগ করেন নিহত দেলোয়ারের পরিবার। শুধু দেলোয়ারের পরিবার নয়, এভাবেই সাগরে গোসল করতে নেমে স্বজন হারিয়ে বুকচাপড়ান অনেকে। শুধু দূরের পর্যটক নয়, স্থানীয় অনেকেও অনাকাঙ্খিত ভাবে ভেসে গিয়ে লাশ হয়েছে অহরহ। এদের অনেকে ছেলেবেলা থেকেই নোনা জলে সাঁতরিয়ে বড় হয়েছেন।

ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের পুলিশ সুপার মো. জিল্লুর রহমান বলেন, কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকদের জন্য সাগরে সতর্কতামুলক বিভিন্ন নির্দেশনা থাকে। সচেতনতার জন্য এসব নির্দেশনা মাইকে এবং বিভিন্নভাবে প্রচার করা হয় নিয়মিত। কিন্তু, অনেকেই এসব মানেন না। না মানা পর্যটকদের বেশিরভাগ সাগরে গোসল করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল কর্মকর্তা সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ও হোয়াইট অর্কিড হোটেলের জিএম রিয়াদ ইফতেখার বলেন, পুরো সৈকত জুড়ে পানির নিচে সাগরের বালি নরম থাকে। ঢেউয়ে পানি উপরের দিকে ঠেললেও পানি নিচে নামার সময় সাগরের দিকে স্রোতের টান বেশী। এ-টান সামলাতে না পেরে অনেক পর্যটক ভেসে যায়। এছাড়া প্রাকৃতিক নিয়মে সাগরে একেক সময় একেক পয়েন্টে গুপ্তখাল সৃষ্টি হয়। গুপ্তখালে আটকে বা সাগরের অথৈ পানিতে ভেসে গিয়ে অনেকে মারা যান।

তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসের পরিচালক আবদুল কাদের মিশুর মতে, সৈকতে গোসলে গিয়ে মৃত্যুর হার কমাতে প্রশাসনের পাশাপাশি হোটেল-মোটেলসহ পর্যটন সংশ্লিষ্টদেরও সচেতনতা মূলক প্রচারণা চালাতে হবে। প্রতিটি হোটেল-মোটেলে লিফলেট তৈরীসহ সাগরে নামার বিষয়ে সতর্ক করতে হবে বুকিং সময়ে। এছাড়াও সী-নেটিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে এ সমস্যা অনেকাংশে কমতো।

কক্সবাজারের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. আশরাফুল আফসার বলেন, পর্যটক সেবায় জেলা প্রশাসন থেকে ৪০জন বিচকর্মী ও ৩০ জন লাইফগার্ড সদস্য কাজ করছে। সুগন্ধা, লাবণীসহ বিভিন্ন পয়েন্টে খোলা হয়েছে তথ্য কেন্দ্র (হেল্প ডেস্ক)। বেড়াতে আসা পর্যটকদের সচেতনতায় সৈকত জুড়ে মাইকিংসহ প্রচারণা নিয়মিত চালানো হয়। ফলে সৈকতে ডুবে প্রাণহানির সংখ্যা কমে এসেছে। সী-নেটিং ব্যবস্থা অনেক ব্যয়বহুল। এরপরও পিপিপি বা অন্য কোন উপায়ে তা করা যায় কিনা সে পরিকল্পনায় এগুচ্ছে সরকার।

বাংলাধারা/এফএস/টিএম

আরও পড়ুন