তারেক মাহমুদ »
বিশ্বজুড়ে থাবা বসানোর পর অবশেষে নানা মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশ করে আপন শক্তি দেখাতে শুরু করেছে প্রাণঘাতি করোনাভাইরাস। ফলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছেন। ভিটামিন সি যুক্ত খাবার গ্রহণেও আগ্রহ বেড়েছে মানুষের। গত দুই-তিন সপ্তাহ থেকে প্রায় সব ধরনের অরেঞ্জের (মাল্টা, কমলা ও ক্যানুলা) দাম অতিরিক্ত বেড়েছে। তবে ব্যবসায়ী একটি সিন্ডিকেট এসব দাম বাড়িয়ে নানা কৌশলে মাত্রাতিরিক্ত লাভ করছে বলে জানা গেছে।
আমদানিকারকরা জানায়, আর্ন্তজাতিক বাজারে বুকিং দর বেড়ে যাওয়ায় দেশীয় বাজারেও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ আমদানিকৃত সব ফলের অস্বাভাবিক দাম বেড়েছে।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, আগে প্রতি কেজি মাল্টা বিক্রি হতো ৯০-১১০ টাকার মধ্যে। দুই সপ্তাহ ধরে দফায় দফায় বেড়ে একই মাল্টা কেজি প্রতি ১৩০-১৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আগে প্রতি ডজন কমলা বিক্রি হতো ১৫০-১৮০ টাকায়। যা এখন ২০০-২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে কেনুলাসহ প্রায় সব ফলের দাম ধীরে ধীরে বাড়ছে।
বিআরটিসি ফলমন্ডিতে পাইকারি পর্যায়ে মিশর থেকে আমদানিকৃত প্রতি কার্টন (১৫ কেজি) মাল্টা বিক্রি হচ্ছে ১৬০০-১৭০০ টাকার মধ্যে। সাধারণ ছুটি ঘোষণার আগের দিন পর্যন্ত বাজারে একই মানের মাল্টা বিক্রি হয়েছে মাত্র ১২০০-০১৩০০ টাকার মধ্যে। সেই হিসেবে প্রতি কার্টন মাল্টার দাম বেড়েছে কমপক্ষে ৪০০ টাকা।
চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আব্দুল মালেক খান বলেন, করোনায় চাহিদা বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক বাজারে অরেঞ্জ জাতীয় ফলের বুকিং দর আগের যেকোনো রেকর্ড ছাড়িয়েছে। এতে দেশীয় বাজারে ফলের দাম বেড়েছে। গত কয়েক দিনে বন্দরে পণ্যের জট লেগে আছে। তাছাড়া আমদানি পণ্যের ডেলিভারি ব্যাহত হওয়ায় ফলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বহু পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। তবে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের খালাসে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, আপেল, কমলা, মাল্টা, খেজুরসহ বিভিন্ন ধরনের ফলমূল; বিভিন্ন ধরনের শিশুখাদ্য; ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামাল, চিকিৎসাসামগ্রী; মাছ, আদা-রসুন ও পেঁয়াজ আমদানি হয় রেফার (শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত) কনটেইনারে। ইয়ার্ডে নামানোর পরও নির্দিষ্ট স্থানে বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে হয়। ফলে এ ধরনের ২ হাজারের বেশি কনটেইনার রাখার সুযোগ নেই বন্দরে। এরই মধ্যে শতভাগ ব্যবহার হয়ে গেছে। রেডিয়েশন ও কোয়ারেন্টিন পরীক্ষা বন্ধ থাকায় আমদানিকারকরা চাইলেও গুরুত্বপূর্ণ এসব পণ্য খালাস করতে পারছেন না। এতে বন্দরে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের গত তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে অরেঞ্জ জাতীয় ফল (মাল্টা, কমলা ও ক্যানুলা) আমদানি হয়েছে ৬৪ হাজার ১২৫ মেট্টিক টন। গত বছর একই সময়ে অরেঞ্জ আমদানির পরিমাণ ছিল ৭৫ হাজার ৭৮৫ মেট্টিক টন। সেই হিসাবে, গত বছরের চেয়ে এবারে অরেঞ্জ আমদানি কমেছে প্রায় ১২ হাজার মেট্টিক টন।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (পরিবহন) মো. এনামুল করিম বলেন, ‘বন্ধের মধ্যেই জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানামার কাজ পুরোপুরি স্বাভাবিক। তবে সবকিছু বন্ধ থাকায় সাধারণ ডেলিভারি কমে গেছে। ফল, শিশুখাদ্য এবং ওষুধবাহী রেফার কনটেইনার খালাস হচ্ছে না। রেডিয়েশন ও কোয়ারেন্টিন পরীক্ষা বন্ধ থাকায় ডেলিভারি দেওয়া যাচ্ছে না। রেফার কনটেইনার রাখার আর জায়গাও নেই।’
চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ‘বন্দর থেকে আমদানিকৃত ভোগ্যপণ্য, বিভিন্ন ফলমূল ছাড় করতে এসবের মধ্যে জীবাণু আছে কিনা, তা জানতে কোয়ারেন্টিন এবং রেডিয়েশন পরীক্ষা করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে এসব পরীক্ষা চালু না থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানিকৃত বিপুল পরিমাণ পণ্য আটকে আছে। তাই বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এসব পরীক্ষা সম্পন্ন করে বন্দর থেকে ছাড়ে সহায়তা প্রয়োজন।’
বাংলাধারা/এফএস/টিএম












