কাউছার আলম, পটিয়া »
বিশ্ববাসী এমন রুপ কখনো দেখেনি। পৃথিবীর সকল যুদ্ধকে হার মানিয়েছে এ যুদ্ধ। এ যেন এক অন্যরকম যুদ্ধ। অস্ত্র আর বুলেট ছাড়াও যে যুদ্ধ করতে হয় তা আজ দেখছে বিশ্ববাসী। এই যুদ্ধ কোন প্রতিপক্ষের সাথে নয়, নয় ক্ষমতার জন্য। এযুদ্ধ কেবলই একটি ভাইরাস থেকে বাঁচার যুদ্ধ। সারাবিশ্ব আজ থমকে গেছে মহামারি করোনা ভাইরাসে। যাতায়াত বিচ্ছিন্ন প্রায় সবদেশ।
প্রতিনিয়ত লক্ষ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত এবং হাজার হাজার মানুষ মুহুর্তেই মৃত্যুবরণ করছে। ইতিমধ্যে মৃতের সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের বড় বড় বিজ্ঞানীরা এই মহামারি রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কারে দিন-রাত প্রাণপন চেষ্টা চালিয়ে গেলেও আজও তার কোন সঠিক প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়নি। মানুষ যখন এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে তখন সব দেশের সরকার জনগণকে এই মহামারি ভাইরাস থেকে বাঁচতে ঘরে থাকার নির্দেশ দিচ্ছে। বলছে সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখতে।
যে সমস্ত স্থানে এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি পাওয়া যাচ্ছে ঐ সমস্ত স্থান লকডাউন করে দেয়া হচ্ছে। গৃহবন্দি হয়েই পড়েছে জনসাধারণ। এতে করে বিপাকে পড়েছে খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষেরা।

অপরদিকে সাধারণ মানুষদেরকে ঘরে থাকতে বললেও কিছু মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিনরাত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এই মহামারি থেকে মানুষদের বাঁচানোর চেষ্টায়। সকাল থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত ক্লান্তিহীনভাবে এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছুটে চলতে চলতে কখন যে দুপুর গড়িয়ে রাত হয়ে আঁধার নেমে আসে তা বুঝতেই পারেনা। ভুলে যায় সঠিক সময়ে খাবারের কথা। অনেক সময়তো অভিযান চলাকালে পথ চলতে চলতে গাড়িতেই সেরে নিতে হয় দুপুর কিংবা রাতের খাবার। এভাবেই কাটছে প্রতিটি মুহুর্ত। সবশেষে বাসায় গিয়ে সারাদিনের ক্লান্তি শেষে একটু বিশ্রাম নেয়া। এরমাঝেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও খেয়াল রাখছে সারাক্ষণ। আর এই মহীয়সী নারীটি হলেন পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানা জাহান উপমা।
প্রতিদিন উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের অলি গলি চায়ের দোকান থেকে শুরু করে হাট-বাজার, রাস্তা-ঘাট সর্বক্ষণ পাহারাদারের মতো করে ঘুরে ঘুরে পটিয়াবাসির নিরাপত্তায় নিজেদের জীবনের শ্রেষ্ঠ মূহুর্তগুলি অতিবাহিত করছেন। যে কোন স্থান থেকে সমস্যার খবর পেয়ে মুহুর্তে ছুটে গিয়ে সমাধান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

সরকারি কর্মকর্তাদের এমন তৎপর কর্মকান্ডে খুশি পটিয়ার জনগণ। সর্বত্র প্রশংসিত হচ্ছেন সকলের কাছে। ইতিমধ্যে যাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে বিভিন্ন ব্যক্তি তাদের প্রশংসা করে পোষ্ট দিয়েছেন। তারা তাদের পোষ্টের মাধ্যমে বিরামহীন পথচলার এই নারীকে তার কর্মের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। অনেকে তাকে যুদ্ধা বলেও অবহিত করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানা জাহান উপমা বাংলাধারাকে বলেন, পটিয়ার জনসাধারণ আমার পরিবারের মতো। এখানে আসার পর থেকে মানুষকে সঠিকভাবে সেবা দিয়ে আসছি। সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে জাতীয় সংসদের হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর সহযোগীতা ও দিক-নির্দেশনা ও জেলা প্রশাসক স্যার ইলিয়াস হোসেন এর মতো আমরা মানুষের সেবায় সর্বক্ষণ কাজ করে যাচ্ছি। মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভার থেকে জনগণকে সচেতন করা আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য। তবে আমরা যে যুদ্ধে নেমেছি সে যুদ্ধে জয়ী হতে হলে জনগণকেও সচেতন হতে হবে। সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখতে হবে। অপ্রয়োজনে ঘরের বাইরে বের হওয়া যাবে না।

পটিয়াকে লকডাউনের প্রয়োজন আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনো সেরকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি, যদি পরিস্থিতির অবনতি হয় তাহলে সেটা তখন উপরোস্থ কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ আলোচনা করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই ধরণের মহামারি আমি আমার জীবনে আগে কখনো দেখিনি। যদিওবা কাজ করতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি রয়েছে, পরিবারের সুরক্ষা নিয়ে চিন্তা রয়েছে তবুও দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করতে পারছি সেটাই জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া বলে মনে করি। জনগণকে সচেতন করতে ও মহামারি থেকে রক্ষার্থে সর্বদা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ইতিমধ্যে সরকারি নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এবং তা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য যে বেশিরভাগ মানুষ এখনো অবহেলা করে আড্ডা ঘুরাঘুরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। আমরা যখন যে স্থান দিয়ে অভিযানে যাই আমাদের দেখে তারা সটকে পড়ে। তারা মূলত আমাদের ভয় পাচ্ছে ভাইরাসকে নয়। আল্লাহ না করুক এই অবহেলা যেন কারো বিপদ হয়ে না দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, এসবের মধ্যেও দেশের প্রতি সম্মাণ রেখে জনগণের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। কেননা মানুষ মানুষের জন্য।

সর্বক্ষণ অভিযানের পরেও মানুষ অযথা বাইরে ঘুরাফেরা করার কারণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাধারণত একজন মানুষ কতক্ষণ ঘরে থাকতে পারে এটি অনেকেরই প্রশ্ন। তবে আমার মনে হয় আমাদের দেশে যদি উন্নত দেশগুলির মতো সকলের জন্য সুযোগ সুবিধা থাকতো যেমন স্বল্পমূল্যে ইন্টারনেট, ওয়াইফাই এবং সামাজিক বিনোদনের ব্যবস্থা করা যেত তাহলে হয়তো কিছুটা হলেও ঘরে থাকার চেষ্টা করতো।
তিনি আরো বলেন, আমাদের বাংলাদেশের মানুষ বেশি আবেগী। কোন একটা ঘটনা ঘটলেই সবাই ভিড় জমায়। আমরা একসময় দেখতাম সবাই পাড়া মহল্লায় মুরব্বিদের কথা শুনতো, তাদের মানতো, কিন্তু এখন অনেকেই মুরব্বিদের তেমন মানতে চায় না, যে যার যার মতো করে চলে। আরো একটি বিষয় হচ্ছে আমাদের দেশে নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের সংখ্যায় বেশি যার ফলে তারা কর্মহীন হয়ে পড়াতে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে কাজের সন্ধানে বের হচ্ছে। তবুও আমরা চেষ্টা করি তাদের বুঝানোর জন্য। আমি সকলের কাছে আবারো অনুরোধ করবো একটু কষ্ট হলেও অহেতুক ঘুরাফেরা না করে ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন, নিরাপদ থাকুন, আপনাদের সেবায় আমরা সর্বাত্বক কাজ করে যাচ্ছি।।
পটিয়ার সাধারণ জনগন মনে করছে, উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্ব পাওয়ার পর হতে ইউএনও তার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে সকলের মন জয় করে চলছেন। উপজেলা পরিষদটিকে যেভাবে কর্ম ও দক্ষতার মাধ্যমে পরিচালিত করছেন তা সত্যি প্রশংসনীয়।
উপজেলা পরিষদটিকে যেভাবে কর্ম ও দক্ষতার মাধ্যমে পরিচালিত করছেন তা সত্যি প্রশংসনীয়। তিনি একের পর এক অতুলনীয় কাজ করে যাচ্ছেন যা দেখে মুগ্ধ না হওয়ার উপায় নেই। দেশের এই ক্লান্তিলগ্নে যেভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তা সত্যি প্রশংসার দাবিদার। পটিয়াবাসি তার এই সহযোগীতা আজীবন মনে রাখবে। সকলেই ওনর সর্বাত্বক মঙ্গল কামনা করেন।
তিনি সৎ নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে প্রশাসনের কাজসমূহ করে যাচ্ছেন। প্রশাসনের প্রতিটি কাজে সহযোগীতা পেয়ে যাচ্ছেন একেবারে তৃনমুল পর্যায়ের ব্যক্তিরাও।
এছাড়াও প্রশাসনকে পটিয়া থানা পুলিশ এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী টিম সর্বক্ষণ সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। বিশ্ব আজ থমকে গেছে, অর্থনৈতিক কার্যক্রম এক প্রকার বন্ধ বললেই চলে। বিশ্ববাসি এই মহামারি থেকে কবে মুক্তি পাবে তা কারো জানা নেই। অপরদিকে মানুষ সৃষ্টিকর্তার প্রতি দুহাত তুলে প্রার্থনা করছেন, তিনি বিশ্ববাসিকে এই মহামারি থেকে রক্ষা করে আবারো আলোর পথ দেখাবেন এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।
এক নজরে ইউএনও ফারহানা জাহান উপমা
ফারহানা জাহান উপমার জন্ম ঢাকায়। তিনি ঢাকা মিরপুরে গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি স্কুল এন্ড ইন্সটিটিউট, কলেজ এস ও এস হারম্যান মেইনার কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ইন্সটিটিউট অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন (আই বি এ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মাস্টার্স উইথ ডিস্টিংশন University of Manchester থেকে পড়াশোনা করেছেন। ইউএনও হিসাবে এটাই তার প্রথম চাকরি।
বাংলাধারা/এফএস/টিএম












