ইফতেখার হোসেন »
করোনাকালে শিশুদের নিত্যদিনের চিত্রটা এখন বদলে গেছে। ঘরের চার দেয়ালে বন্দি জীবন কাটাতে কাটাতে শিশুদের বাড়ছে অস্থিরতা। কোনভাবেই যেন তারা আর ঘরে থাকতে চাইছেনা। ঘরবন্দি জীবনে অধিকাংশ শিশুরা এখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।
সারাদেশে করোনার ভয়াবহতা বৃদ্ধি পাওয়ায়, সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে গত ১৮ মার্চ থেকে সরকারি নির্দেশনায় বন্ধ করে দেওয়া হয় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এরপর থেকে শুরু হয় শিশুদের ঘরবন্দি জীবন। একঘেয়েমী জীবনে শিশুদের মেধাবিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এমনটাই মনে করছেন অভিভাবক ও শিশু বিশেষজ্ঞরা।
এ প্রসঙ্গে কথা হলে চট্টগ্রাম মহানগরীর এফ এম ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক ফাতেমা পারভীন নওরিন বলেন, ঘরবন্দি জীবনে শিশুরা মানসিকভাবে ভালো থাকবে না এটাই স্বাভাবিক। দেশব্যাপী এমন দুর্যোগে তাদের ভেতরেও অবশ্যই ভয়ভীতি কাজ করে। তাই শিশুদের সঙ্গে বেশি কড়া শাসন করা যাবেনা। তাদের বুঝিয়ে ঘরে রাখতে হবে। তাছাড়া তাদের জন্যে পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি খেলার সামগ্রী যেমন ছোট ছোট বল, রং পেন্সিল, ছবি আকার খাতা, শিশুতোষ গল্প, কার্টুন কিংবা কমিক্সের বই উপহার দেওয়া যেতে পারে।
মূলত দেখা গেছে, যে শিশুরা স্কুল থেকে এসে গোসল সেরে দুপুরের খাবার খেত, খাবার শেষে ঘুম। ঘুম থেকে উঠেই সোজা পাড়ার মাঠে গিয়ে কোলাহলে মেতে উঠতো। সেই শিশুদের নিত্যদিনের চিত্রটা এখন বদলে গেছে। স্কুল নেই, হাউজ টিউটর নেই। নেই বিকেল বেলায় পাড়ার ওলিগলিতে শিশু-কিশোরদের হৈচৈ আর কোলাহল। তাদের সময় কাটছে ঘরে, বারান্দায় ও আকাশের দিকে তাকিয়ে।
করোনাভীতি ও ঘরবন্দি জীবনে অধিকাংশ শিশুরা এখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। যাদের ঘরে টেলিভিশন আছে, তাদের শিশুরা হয়তো কার্টুন দেখে খেলার সময় কাটাচ্ছে। আবার দীর্ঘ সময় ঘর থাকাতে টিভির প্রোগ্রাম দেখতেও এখন অনেকটাই বিরক্ত তারা। আর গ্রামাঞ্চলের যেসব শিশুদের ঘরে টেলিভিশন নেই, সেসব শিশুদের নিয়ে বিপাকে তাদের বাবা-মা। তাছাড়া করোনা ভয়াবহতার খবরেও অনেক শিশুই ভুগছে আতঙ্কে। আবার বিভিন্ন পেশাজীবী বাবা-মাকে অতি জরুরি প্রয়োজনে ঘরের বাইরে বের হতে হচ্ছে। এতে শিশুদের জন্যে বাড়ছে করোনা সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি।
নগরীর ঈদগাঁ বৌ বাজার আমতল এলাকার গৃহিণী তাহমিনা আক্তার তান্নি বলেন, তাঁর এক মেয়ে ও এক ছেলে। দুইজনের বয়স যথাক্রমে ১০ এবং ৬। মেয়েটিকে ঘরে রাখতে পারলেও ছেলেটি সুযোগ পেলেই বাইরে বের হতে চায়। বাইরে বের না হওয়ার জন্য তাদেরকে কড়া শাসনে রাখতে হচ্ছে। অন্যদিকে মেয়েটি তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। কিন্তু স্কুল ও হাউজ টিউটরের কাছে যাওয়া বন্ধ থাকাতে খুব চিন্তায় পড়েছি। এমন পরিস্থিতিতে ঘরে থাকাতে দিন দিন শিশুরা বিরক্তও হয়ে পড়ছে। আর পড়াশোনাতেও অনীহা সৃষ্টি হয়েছে।
নগরীর বাওয়া স্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া স্নেহা জানায়, আগে প্রতিদিন সকাল ছয়টায় উঠে প্রাইভেটে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতাম। তারপর প্রাইভেট থেকে স্কুল। বিকেলে স্কুল শেষে বাসায়। তারপর একটু বিশ্রাম নিয়ে বন্ধুদের সাথে পায়চারি ও গল্প করতাম। কিন্তু প্রায় তিনমাস ঘরে থেকে আমাদের সকল রুটিনের পরিবর্তন হয়েছে। তাছাড়া সারাদিন বাসায় বসে পড়াশোনা করতেও ভাল লাগেনা। যখন ঘরের ভেতর অস্থির লাগে, তখন বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করি, আর খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবি, আবার কবে সব আগের মতন হবে।
বাংলাধারা/এফএস/টিএম/এএ












