সায়ীদ আলমগীর, কক্সবাজার »
কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (সিবিআইইউ) ফান্ডের প্রায় তিন কোটি টাকা নানা অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগে ট্রাস্টি বোর্ডের সচিবসহ একাধিক জনের বিরুদ্ধে মামলার সপ্তাহ পার না হতেই আরেক অনিয়মের সূত্রপাত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার ও ভারপ্রাপ্ত ভিসি প্রফেসর আবদুল হামিদ।
কোন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়াই অফিস আদেশে তিনি রেজিষ্টারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে রাতারাতি নিয়োগ দিয়েছেন। এ পদে অবৈধভাবে নিয়োগ পেয়েছেন নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে ময়মনসিংহের কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে বহিষ্কার হওয়া খন্দকার এহেসান হাবিব নামে এক ব্যক্তি।
ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যের স্বাক্ষরকরা অফিস আদেশটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট ও ফেসবুকগ্রুপ হয়ে প্রকাশ্যে আসায় নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে তোলপাড় ও সচেতন মহলসহ পুরো জেলাজুড়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। জেলার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে নিয়োগ পরীক্ষা ছাড়া ‘রেজিষ্টার’র মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে গোপনে নিয়োগ দেয়ায় পুরো ট্রাস্টি বোর্ডের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সবাই। অবৈধ এ নিয়োগের খবর সিবিআইইউর শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ও অভিভাবকদের মাঝে জানাজানি হলে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় মন্জুরি কমিশন সূত্র জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা কর্মকর্তা, কর্মচারি যা-ই নিয়োগ দেয়ার প্রয়োজন পড়ুক প্রথম সারির জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ আবশ্যক। ঘোষিত তারিখে সংশ্লিষ্ট পদে লিখিত পরীক্ষার আয়োজন করে উত্তীর্ণদের যথাযথ নিয়মে সর্বশেষ ধাপ পেরিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে। এর বাইরের যেকোন নিয়োগ অবৈধ বা যথাযথ নয় বলে প্রতিয়মান হবে।

আর সেই নিয়মে জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করেই ‘নিয়োগ পরীক্ষা বিহীন’ অবৈধ উপায়ে ‘রেজিষ্টার’ পদে খন্দকার এহেসান হাবিব নামে একজনকে নিয়োগ দিয়েছে সিবিআইইউ উপাচার্য। গত ৩ জুন ২০২০ ইংরেজী তারিখ ইউনিভার্সিটির প্যাডে ট্রেজারার ও ভারপ্রাপ্ত ভিসি প্রফেসর আবদুল হামিদ তার স্বাক্ষরিত একটি ‘অফিস আদেশ’ এর মাধ্যমে খন্দকার এহেসান হাবিব ‘রেজিষ্টার’ পদে যোগদান করেছেন মর্মে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মরত শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে অবগত করেছেন। সেখানে উল্লেখ করেন, ১ জুন খন্দকার এহেসান হাবিবের যোগদান পত্র গৃহিত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যানের নির্দেশে তিনি এ অফিস আদেশ দিয়েছেন। প্রতিটি বিভাগের প্রধান ও সংশ্লিষ্টদের নবাগত রেজিস্ট্রারকে সহযোগিতার অনুরোধও করা হয় পত্রে।
কিন্তু বিজ্ঞপ্তি ছাড়া ‘নিয়োগ পরীক্ষা বিহীন’ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্টানে রেজিষ্টার পদে রাতারাতি নিয়োগ দেয়ার খবর জেনে ক্ষোভে ফুঁসছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও কক্সবাজারের শিক্ষানুরাগীরা। তাদের মতে, বেসরকারি হলেও জেলার সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিক্ষাপাগল মধ্যবিত্ত পরিবার ও সচেতন মহলে আশার সঞ্চার করেছিল সিবিআইইউ । কিন্তু সম্প্রতি ফান্ডের প্রায় তিন কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলার ঘটনা সবাইকে হতবাক করেছে। এর রেশ না কাটতেই অনৈতিক পন্থায় রেজিস্ট্রার নিয়োগের ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়টি নিয়ে চরম ষড়যন্ত্রের আবাস মিলছে। কোন দুর্বিসন্ধি মাথায় নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে এসব অপকর্ম করা হচ্ছে বলে অভিমত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের।
বিজ্ঞপ্তি ও নিয়োগ পরীক্ষাবিহীন রেজিষ্টার পদে নিয়োগের বিষয়ে জানতে কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভারপ্রাপ্ত ভিসি ও ট্রেজারার প্রফেসর আবদুল হামিদের মুঠোফোনে সোমবার সন্ধ্যা ও মঙ্গলবার দিনের বেলা বেশ কয়েকবার কল করা হয়। রিং হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরিচয় জানিয়ে বিষয়টি উল্লেখ করে ‘ক্ষুদে বার্তাও’ পাঠানো হয়। এরপরও তিনি কল রিসিভ বা বেক করেননি এবং এসএমএসের উত্তরও দেননি।
এদিকে, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে তথ্যানুসন্ধান ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের ‘গরু’ বলার অপরাধে খন্দকার এহেসান হাবিবকে সহকারী রেজিষ্টার পদ থেকে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ময়মনসিংহের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ‘গরু’ বলার পর সমালোচনা ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মূখে খন্দকার এহসান হাবিবকে প্রথমে সাময়িক এবং পরে তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে স্থায়ী বরখাস্ত করা হয়।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে ৫ ফেব্রুয়ারি (রোববার) জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণসংযোগ কর্মকর্তা এসএম হাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, ৪ ফেব্রেয়ারী (শনিবার) ২০১৭ ইংরেজী বিকালে ঢাকার শ্যামলীতে অবস্থিত জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লিয়াজোঁ অফিসে সিন্ডিকেটের ৫৫ তম সভায় সহকারী রেজিষ্টার খন্দকার এহসান হাবিবকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল।
ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে কমিটিতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে দক্ষ আরো দুজনকে সম্পৃক্ত করা হয়। এছাড়াও আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে মন্তব্য ও প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তি করায় তথ্যপ্রযুক্তি আইনেও দুটি মামলা হয় তার বিরুদ্ধে।
কমিটির তদন্ত রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএইচএম মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ২০১৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সিন্ডিকেট সভায় খন্দকার এহেসান হাবিবকে স্থায়ীভাবে কবি নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করা হয়।
কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. হুমায়ুন কবীর গত রোববার (৭ জুন) জানান, শিক্ষার্থীদের ‘গরু’ বলে আখ্যায়িত করা, প্রধানমন্ত্রী ও রাজনীতিবিদদের নিয়ে কটূক্তি করার পর খন্দকার এহেসান হাবিবের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি এবং মামলার প্রতিবেদনে অভিযোগের প্রমাণ মিলে। এ কারণেই এহসান হাবীবকে স্থায়ীভাবে বহিস্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট।
২০১৭ সালের ৩১ জানুয়ারি সকাল ৮টা ২৪ মিনিটে এহেসান হাবিব তার ফেইসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লেখেন, “পাবলিকের অনেক গরু প্রতিদিন আমি আমার বাড়ির মাঠে ঘাস খেতে দেখেছি।” এরপর ৮টা ৪০ মিনিটে তিনি আরেকটি স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘বিষয়টা প্রাইভেট পাবলিকের না। বিষয়টা হলো মেধার। যোগ্যতার। আপনি পাবলিকের গরু নেবেন নাকি প্রাইভেটের মেধা নেবেন।’ এই স্ট্যাটাসের পর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ অন্যদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল।
এদিকে, ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাসে প্রধানমন্ত্রী ও রাজনীতিবিদদের ‘কটূক্তি’ করার অভিযোগে ২০১৭ ইরেজীর ৪ ফেব্রেয়ারী (শনিবার) রাতে খন্দকার এহেসান হাবিবের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় দুটি মামলা করা হয় ময়মনসিংহ সদরের কোতোয়ালি মডেল থানায়। ময়মনসিংহ পৌরসভার ২১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি দিদারুল ইসলাম বাদী হয়ে খন্দকার এহেসান হাবিব ছাড়াও আরো একজনকে আসামী করা হয়েছিল সে মামলায়। অপর মামলাটির বাদী ময়মংসিহ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি নুরুল বাকি খান। এই মামলায় এহসান হাবিবকে প্রধান করে আরো দুইজনকে আসামী করা হয়েছিল।
মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে অফিস আদেশে রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ পাওয়া খন্দকার এহেসান হাবিব ময়মনসিংহ কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে অব্যাহতির ঘটনা স্বীকার করে বলেন, যেসব অভিযোগে আমি চাকরিচ্যুত হয়েছিলাম সেসব বিষয়ে আপিল করা হয়েছে, যা এখনো চলমান।
তথ্যপ্রযুক্তি আইনে দায়ের করা মামলাগুলো প্রমাণ হলে আমি কারাগারে না গিয়ে বাইরে কেন? এমন প্রশ্ন করে এহেসান হাবিব বলেন, আওয়ামীলীগের কিছু নেতার বিরাগভাজন ছিলাম বলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার সময় তারাও কিছু অভিযোগ তুলে মামলা করেছিল। সিআইডি মামলাগুলো তদন্ত করে প্রমাণ পায়নি। এসব স্ট্যাটাস আমার আইডি থেকে করা এমন প্রমাণ দাঁড় করানো যায়নি। এ বিষয়ে আমি হাইকোর্টের শরণাপন্ন হলে মামলাগুলো চলার যোগ্য নয় আদেশ দিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগের বিষয়ে বলেন, আমি ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারী হতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেপুটি রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদান করে দায়িত্বপালন করে আসছি। মাঝখানে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের দায়িত্বও দেয়া হয়। কিন্তু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সেই অতিরিক্ত দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু এখন কেন অফিস আদেশে আমাকে নিয়োগ দেয়া হলো সেটা উপাচার্য এবং ট্রাস্টি বোর্ড ভালো জানবে। তবে, চাইলে ইমার্জেন্সি এমন নিয়োগ দেয়ার এখতিয়ার উপাচার্য ও ট্রাস্টি বোর্ড রাখেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সালাহউদ্দিন আহমেদ সিআইপি’র মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সংযোগ না পাওয়ায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
উল্লেখ্য, পর্যটন নগরীর কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (সিবিআইইউ) প্রায় তিন কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ট্রাস্টি বোর্ডের সচিব লায়ন মুজিবুর রহমানসহ (লরেল মুজিব) চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির জন্য সরকার মনোনীত ট্রেজারার প্রফেসর আবদুল হামিদ বাদি হয়ে গত ২ জুন কক্সবাজার সদর থানায় মামলাটি রুজু করেন (মামলা নাম্বার-১/৪৩২,তাং-২ জুন)। মামলার পরের দিনই বিনা বিজ্ঞপ্তিতে অফিস আদেশে রেজিস্ট্রার নিয়োগ দেন তিনি।
বাংলাধারা/এফএস/টিএম/এএ












