১৯ মার্চ ২০২৬

জীবন সংগ্রামে হার না মানা পা’হীন এক যোদ্ধা সৈয়দুল বশর

আশিক এলাহী, প্রতিনিধি :::

দুই পা নেই, হাত দু’টি দিয়ে স্বপ্ন দেখেন বিশ্ব জয়ের। এমন এক অনুপ্রেরণার নাম হাফেজ সৈয়দুল বশর প্রকাশ বটন (৫১)। তিনি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা ইউনিয়নের ১নম্বর ওয়ার্ড বশির বাড়ি এলাকার মৃত আব্দুন নূরের ছেলে সৈয়দুল বশর বটন।

চার ছেলে-মেয়ের জন্মদাতা পিতা। বড় ছেলে আব্দুল হামিদ (১৯) রাঙ্গুনিয়া কলেজ প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় ছেলে হাসান মুহাম্মদ আদর (১৭) ইমাম গাজ্জালী কলেজে প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত। তৃতীয় ছেলে আব্দুল হালিম (১৫) পোমরা উচ্চ বিদ্যালয়ে এসএসসি পরিক্ষার্থী আর ছোট মেয়ে তৈয়বা বশর (১১) ৫ম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত।

তিনি জীবন সংসারের টানে ছুটে যাচ্ছেন কত দূরান্তর পথ। আশেপাশের মানুষকে বুঝতে দেন না জন্মগত ভাবে পা’হীন জীবন সংগ্রামের কথা তাঁর। সে জীবন সংগ্রামে একজন সেনাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি নিজেকে সবসময় স্বাভাবিক মানুষ মনে করেন, অন্য সুস্থ-সবল স্বাভাবিক মানুষের মতই। আর স্বাভাবিক মানুষের সাথে তাল মিলিয়ে চলেন। পিছিয়ে থাকেন না, কোনো অংশে। যেদিকে যায় সেদিকে শতভাগ দেওয়ার চেষ্টা করেন। ছোট বেলা থেকে জ্ঞান, মেধা, প্রজ্ঞা ও পরিশ্রমী ছিলেন। বেসিক নলেজও ছিল ভরপুর। তিনি ছোট বেলায় পবিত্র কুরআন শরীফও মুখস্থ করেছেন। মাদ্রাসায় শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছিলেন। নিজেকে আড়ালে রাখতে বেশি পছন্দ করেন। তবে স্বপ্ন দেখেন একজন বড় ব্যবসায়ী হবেন। স্বপ্নকে কয়জনে বাস্তবতায় রুপ দিতে পেরেছেন? যারা পেরেছেন তারাই সফল। যারা পারেনি তারা! কিন্তু সময়ের সাথে সাথে জীবনের বয়স আর থেমে থাকছে না। আর বয়সের সাথে সাথে চিন্তার ভাঁজও মাথায় ঘুর পাক খাচ্ছে। জীবনের কঠিন বাস্তবতা মেনে চলতে হচ্ছে দূর-দূরন্তরে, কত যে অজানা পথ বয়ে যেতে হচ্ছে।

দেখুন দেশে কত শিক্ষিত ছাত্র-ছাত্রীর বেকার হয়ে এদিক-সেদিকে ঘুরছে। সাহসের কমজুরির অভাবে নিজেকে পারছে না মিলাতে বাস্তবতার সাথে। আর সেখানে হাফেজ সৈয়দুল বশর এক অনন্য বলা যায় নিশ্চয়ই। দেশে কত হাত-পা’হীন মানুষ ভিক্ষাপাত্র নিয়ে অন্যের সহযোগীতা কামনা করেন। নইতো’বা পরিবারের সদস্যের উপর নির্ভরশীল। আর সে জায়গায় সৈয়দুল বশর কতটা আত্মনির্ভরশীল, আত্মপ্রত্যয়, একটু ভাবা যায়। নিজের মেধা ও পরিশ্রমের উপর অগাধ বিশ্বাস তাঁর। নিজের বিশ্বাসে আজ এ অবধি আসতে সক্ষম হয়েছে। রাগ, অভিমান ও জেদ অন্যের মানুষের চেয়ে একটু বেশি লক্ষ্য করা যায়। এই জীবন সংসারে হারতে পছন্দ করেন না। বিজয়ী হওয়া তাঁর একটি বড্ড নেশা। কিন্তু জীবন সংসারে এমন কয়জন আছে শতভাগ সফল?

ব্যর্থতা থেকে সফলতার গল্প রচিত হয়। সেও জীবন সংসারে কখনও বিজয়ী আবার কখনও ব্যর্থ। মেঘডাকা মেঘাচ্ছন্ন আকাশ সরিয়ে নতুন সকালের আশায় বুক বাঁধেন। নতুন আলোতে কুয়াশা বেদ করে আলোকিত মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখেন প্রতিনিয়ত। তার এই জীবনে গরু, ছাগল, ধান, ক্ষেত-খামার ব্যবসা থেকে শুরু করে বর্তমানে তিনি দেশীয় মুরগী ব্যবসা করেছেন। তিনি পাওয়া-না পাওয়ার হিসাব ঘষে বেড়ান না। বসে থেকে অলস সময় কাটাতে পছন্দ করেন না। প্রতিনিয়ত তিনি ছুটে বেড়ান কখনও ব্যবসার দিকে আবার কখনও ছুটে চলেন খতমে কুরআন তেলাওয়াতে। সময়ের কাজ সময় থাকতে শেষ করতে চান।

জানতে চাইলে হাফেজ সৈয়দুল বশর বলেন, ‘আমি সবসময় নিজেকে সাধারণ মানুষ মনে করি। আর সবসময় কাজের মধ্যে ব্যস্ত থাকতে চেষ্টা করি। আমার বড় একটি স্বপ্ন ছিল মানুষের পাশে থাকা ও সেবা করার। সে জন্য ২বার ইউপি সদস্য প্রার্থী হয়েছি। কিন্তু জনগণ উপযুক্ত মনে করেননি বলে বিজয়ের স্বাদ পায়নি। কখনও সুযোগ আসলে জনগণের প্রতিনিধি হয়ে জনগণের পাশে ও সেবা করার ইচ্ছা আছে।’

ছেলেদের নিয়েও অনেক বড় স্বপ্ন কাজ করে তাঁর। ছেলেদের উচ্চ শিক্ষিত করে মানুষের মত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।

তিনি আরও বলেন, ‘আমার নিজের একান্ত প্রচেষ্টায় আজ এই অবধি আসতে সক্ষম হয়েছি। সরকারি নিয়মে সবার মত আমিও প্রতিবন্ধী ভাতা পায়। যদি সরকারের পক্ষ থেকে কখনও ভাল সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়, চেষ্টা করব সে সুযোগ-সুবিধা দিয়ে স্বপ্নকে বাস্তবতায় রুপ দিতে।’

পোমরা ইউপি পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ফজলুল কবির গিয়াসু বলেন, ‘তিনি একজন সৎ ও আত্মনির্ভরশীল মানুষ। সমাজে দেখা যায়, তার মত অনেক প্রতিবন্ধী ভিক্ষাবৃত্তি করছেন। কিন্তু তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয়ী করে স্বাভাবিক সংসার জীবন পরিচালিত করছেন। এমন নির্ভীক মানুষের জন্য রাঙ্গুনিয়া উপজেলা প্রসাশন ও সরকার থেকে সাহায্য- সহযোগীতা করা একান্ত প্রয়োজন।’

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাসান বলেন, ‘শারিরীক প্রতিবন্ধকতা স্বত্ত্বেও সৈয়দুল বশর পরনির্ভরশীল না হয়ে যেভাবে আত্মনির্ভরশীল হয়ে জীবন যাপন করছেন, তা আমাদের সমাজের জন্য উদাহরণ। উপজেলা সমাজসেবা অফিসের পক্ষ থেকে উনাকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমান বলেন, অন্যের দয়ার উপর নির্ভরশীল না হয়ে প্রতিবন্ধী হয়েও সৈয়দুল বশরের আত্মনির্ভর হওয়ার কথা শুনেছি। উনার পথচলায় উপজেলা প্রশাসন সবসময় উনার পাশে থাকবে।

বাংলাধারা/এফএস/এআই

আরও পড়ুন