১৯ মার্চ ২০২৬

প্রফেসর রেজাউলের দূরদর্শীতা : করোনা মহামারীতে নীরব সেবা পাচ্ছেন অর্ধকোটি মানুষ

সায়ীদ আলমগীর  »

বিশ্বের চলমান আতংক করোনা মহামারী। গত ২০২০ সালের মার্চের মাঝামাঝি সময় হতে পর্যটন নগরী কক্সবাজারও ‘কোভিড-১৯’ ভাইরাসের থাবা মোকাবিলা করছে। করোনার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে এ ১৮ মার্চ হতে ‘রেড জোন’ ঘোষিত হয় কক্সবাজার। সমস্ত ব্যবসা-বাণিজ্য, হোটেল-মোটেলসহ পর্যটনের সকল অনুষঙ্গের সাথে বন্ধ করে দেয়া হয় সকল পথের যোগাযোগ। এরপরও চেনা-অচেনা অনেকে করোনা করোক্রান্ত হয়ে ভোগেছেন। মারা গেছেন অনেকে। তবে সেপ্টেম্বর হতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে এলে স্বাস্থ্য বিধি মেনে সবকিছু আগের মতো খুলে দেয়া হয়।

কিন্তু চলতি বছরের একই সময়ে আবারো বিস্তার লাভ করেছে করোনা। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের তোড়ে পহেলা এপ্রিল হতে আবারও লকডাউনের কবলে পড়েছে দেশ। গত বছরের চেয়ে আরো বেশি প্রাচুর্য নিয়ে করোনা রোগাক্রান্তের সংখ্যা বাড়াচ্ছে। এবারও মরেছে বেশ কয়েকজন।

তবে, কক্সবাজারের ৮ উপজেলার প্রায় ২৮ লাখ স্থানীয় ও ১১ লাখ রোহিঙ্গা, পার্বত্য বান্দরবানের ৭ উপজেলার ৬ লাখ এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ, লোহাগড়া, সাতকানিয়া ও বাঁশখালী এ চার উপজেলার ১৩ লাখ মিলে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ দিনের পরীক্ষার রিপোর্ট দিনে পেয়ে স্বস্তিতে সময় পার করছেন। দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে পারায় ভোগান্তি ও মৃত্যুর হার কমছে বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের। গত ৮ মে পর্যন্ত কক্সবাজারের ল্যাবে করোনা পরীক্ষার সুযোগ পেয়েছেন এক লাখ ৪০ হাজার ৮১৯জন।

এটি সম্ভব হচ্ছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের একমাত্র সরকারি মেডিকেল কলেজটিতে তিনটি পিসিআর ল্যাবে একসাথে কাজ করতে পারায়, এমনটি দাবি শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপক ও করোনা স্বেচ্ছাসেবী আনোয়ার হোসেনের।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একটি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের যথাযথ চিকিৎসাপাঠ দিতে প্রায় প্রতিটি বিভাগের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের জন্য ল্যাব দরকার। এর মাঝে বায়োকেমিস্ট্রি, ফিজিওলজি, ফার্মাকোলজি, প্যাথলজি ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ অন্যতম। এসব বিভাগের মাঝে প্যাথলজি ও মাইক্রোবায়োলজির আবার কয়েকটি পৃথক ধাপে আলাদা ল্যাব স্থাপন করা দরকার পড়ে। মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের জেনারেল মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবটি সংক্রমণ রোগত্বত্তসহ নানা মহামারিতে রোগের নমুনা পরীক্ষার ফলাফল নির্ণয়ে কাজ দেয়। আর যেকোন মেডিকেল কলেজ এ ধরণের ল্যাব একটির বেশি স্থাপন করে না। কিন্তু কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে জেনারেল মাইক্রোবায়োলজির তিনটি ল্যাব চলমান রয়েছে। শুরুতে কলেজের প্রয়োজনে একটি ল্যাব স্থাপনের পর আইসিডিডিআরবির (আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ) মাধ্যমে আরো একটি ল্যাব বসানো হয়। পরে করোনার প্রাদুর্ভাব বাড়ায় রোহিঙ্গাদের সেবা সুচারু করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) আরো একটি ল্যাব স্থাপন করে। এ তিনটি ল্যাবে দিনে দিনেই অর্ধসহস্রাধিক করোনা টেস্টের রিপোর্ট সরবরাহ দিয়ে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিতের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কক্সবাজার সরকারি মেডিক্যাল কলেজ সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. রেজাউল করিমের দূরদর্শী চিন্তার কারণে আজ করোনা মহামারীতে রোগের স্যাম্পল পরীক্ষায় সুফল দিনে দিনে পাওয়া যাচ্ছে। নিয়ম মতে, একটি জেনারেল মাইক্রোবায়োলজি ল্যাব স্থাপন হলে একদিনে এত পরীক্ষার রিপোর্ট প্রদান কোন মতেই সম্ভব হতো না। ২০০৮ সালে যাত্রা শুরু করা মেডিকেল কলেজটির স্থায়ী ক্যাম্পাস সদরের পাওয়ার হাউস এলাকাতে ২০১৬ সালের শেষের দিকে স্থানান্তরিত হয়। নতুন ভবনে সবকিছু নতুনই বসানো হয়েছে। এসময় অন্য প্রয়োজনীয় ল্যাবের সাথে একাধিক জেনারেল মাইক্রোবায়োলজি ল্যাব স্থাপনের বন্দোবস্ত করেন ততকালীন অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. রেজাউল করিম। ২০১৭ সালে শেষের দিকে এবং ২০১৮ সালের শুরু হতে রোহিঙ্গাদের নানা রোগের পরীক্ষার মাধ্যমে জেনারেল মাইক্রোবায়োলজি ল্যাব পাঠক্রমের পাশাপাশি জনস্বার্থে ব্যবহার শুরু হয়। কলেজের পিসিআর ল্যাব ও আইসিডিডিআরবির ফিল্ড ল্যাবটি মিয়ানমার হতে বাস্তুচ্যুত হয়ে আশ্রয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মাঝে দেখা দেয়া নানা রোগের দ্রুত রিপোর্ট প্রদানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০১৮ সালে অবসরে চলে যান প্রফেসর ডা. রেজাউল করিম। ২০২০ সালের করোনা পরীক্ষায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটিসহ তিনটি পিসিআর ল্যাব এখন দক্ষিণ চট্টগ্রামের ৬০ লাখ মানুষের ভরসাস্থলে পরিণত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের তিনটি পিসিআর ল্যাবে দৈনিক ১১শ’ স্যাম্পল পরীক্ষা করার সক্ষমতা রয়েছে। গড়ে প্রতিদিন ৬০০ স্যাম্পল পরীক্ষার পর রিপোর্ট দেয়া হচ্ছে। সকাল হতে বিকাল ৩টা পর্যন্ত সংগ্রহকরা স্যাম্পল একই দিন রাত ৮টার ভেতর রিপোর্ট দেয়া সম্ভব হয়। বিকাল ৩টার পর আসা স্যাম্পল পরের দিন সকাল ৮টার ভেতর রিপোর্ট তৈরি করে সরবরাহ দেয়া হয়ে থাকে।

করোনা সংক্রান্ত চিকিৎসা, মৃতদের দাফনসহ ঝুঁকি নিয়ে নানাভাবে কাজ করা কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি এসএম সাদ্দাম হোসাইন বলেন, কক্সবাজারে একাধিক পিসিআর ল্যাব স্থাপন না হলে তখন হয়তো অনেক নমুনা চট্টগ্রাম কিংবা ঢাকায় পাঠাতে হতো এবং ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে হতো দুই থেকে ৪দিন। এতে আক্রান্ত রোগীর দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত সম্ভব হতো না। ফলে রোগ সম্পর্কে ধারণা পেতে দেরি হলে অনেকে সঠিক চিকিৎসার আগেই অঘটনের শিকার হতেন হয়তো।

কক্সবাজার সদরের বাসিন্দা দুবাই প্রবাসী মুহাম্মদ ইউনূস খান, সৌদি প্রবাসী মোহাম্মদ শাহ আলম, রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়ির জাহাঙ্গীর আলমসহ আরো অনেক বলেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের আগে ছুটিতে বাড়িতে এসেছিলাম। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে আবার কর্মস্থলে ফিরতে হয়েছে। করোনার এ কঠিন সময়েও মাত্র ৮ ঘন্টার ব্যবধানে পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পেয়ে বিমান ধরতে সুবিধা হয়েছে। নিজ এলাকায় পরীক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ হওয়ায় এমনটি সম্ভব হয়েছে, নয়তো প্রথমবার বিদেশ আসার মতো চট্টগ্রাম ও ঢাকাতে পরীক্ষা করালে অর্থ ও ভোগান্তি দুটোই যেত।

সম্প্রতি করোনা আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার পর সুস্থ হওয়া কক্সবাজারের সাংবাদিক নেতা রাসেল চৌধুরী ও আমান উল্লাহ আমান বলেন, তেমন কোন উপসর্গ না থাকলেও শারিরীক অসুস্থতায় চিকিৎসকদের পরামর্শে স্যাম্পল দেয়ার ৫ ঘন্টার মাথায় রিপোর্ট হাতে আসে আর জানতে পারি করোনা পজিটিভ। সাথে সাথেই চিকিৎসা শুরু করায় অল্পদিন পার না হতেই আবার নেগেটিভ রিপোর্ট আনা সম্ভব হয়েছে। কক্সবাজার মেডিক্যালে এসব পিসিআর ল্যাব না বসলে হয়তো এসব সুযোগ ভোগ করা হয়ে উঠতো না।

একটির স্থলে একাধিক পিসিআর ল্যাব বসানোর কারণ কি এমন প্রশ্নে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ, বর্তমানে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ডা. রেজাউল করিম বলেন, পৃথিবীর দীর্ঘতম সৈকতের শহর কক্সবাজার বিশ্ব পর্যটনের একটি উর্বর স্থান। এখানে দেশী-বিদেশী মিলে বছরে লাখ লাখ পর্যটক আসেন। আমি এ মাটির-ই (কক্সবাজারের) সন্তান। ২০১৭ সাল হতে উখিয়া-টেকনাফে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে মানবিক আশ্রয়ে রাখা হয়েছে। এসব বিষয় চিন্তা করে সম্ভাব্য চিকিৎসা দূর্যোগ বা মহামারীর কথা মাথায় রেখে সুযোগ থাকায় জেনারেল মাইক্রোবায়োলজির একাধিক ল্যাব স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিই। নিয়ম মতো কলেজের একটি স্থাপনের পর, লিখিত আবেদনের মাধ্যমে আইসিডিডিআরবির একটি ফিল্ড ল্যাবের ব্যবস্থা করি। প্রয়োজনে আরো ল্যাব বসানোর জন্য পর্যাপ্ত জায়গা এবং সুযোগ রাখা হয়। সেখানে করোনা শুরুর পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে আরেকটি ল্যাব বসানো হয়েছে। এসব করতে গিয়ে অপচয়, পাগলামি, খেয়ালিপনাসহ নিন্দুকের কত মিথ্যাচার শুনতে হয়েছে। কিন্তু সেই খেয়ালিপনার (নিন্দুকের ভাষায়) সুফল আজ কক্সবাজারবাসী, শরণার্থী, চট্টগ্রাম ও বান্দরবানের অর্ধকোটি লোকজন পাচ্ছেন। এটা তৃপ্তির।

কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মাহবুবুর রহমান জানান, গেল ২০২০ সালের পহেলা এপ্রিল হতে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের তিনটি পিসিআর ল্যাবে চলতি বছরের ৮ মে পর্যন্ত কক্সবাজার-বান্দরবান ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের এক লাখ ৪০ হাজার ৮১৯জনের পরিক্ষা করা হয়। এতে পজেটিভ হয়েছেন ১০ হাজার ৪৩০ জন। কক্সবাজার জেলায় পরীক্ষার আওতায় আসা ৮৩ হাজার ৭৬১ জনে আক্রান্তের সংখ্যা ৮ হাজার ৩৫৯ জন।

বান্দরবান জেলায় ৫ হাজার ৬৩৩ জনে পজেটিভ হয়েছেন ৯১৩ জন। দক্ষিণ চট্টগ্রামের ১১ হাজার ৮০১ জনে পজেটিভ হয়েছেন ৪৫৯ জন। রোহিঙ্গাদের পরীক্ষার আওতায় আসা ৩৯ হাজার ৬৭১ জনে পজেটিভ এসেছে ৬৯৬ জন। করোনার শুরু হতে ৩১ মার্চ পর্যন্ত এক বছরে আক্রান্ত হয়ে কক্সবাজার জেলায় মারা গেছেন ১০০জন। এর মাঝে ১১ জন রোহিঙ্গা রয়েছেন।

বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ) কক্সবাজার শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, এটি নিঃসন্দেহে কক্সবাজারবাসীর জন্য গর্বের। এখানে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সমেত ল্যাবে পর্যাপ্ত সেবা পাওয়ায় দ্রুত চিকিৎসা পাচ্ছে করোনা আক্রান্তরা। কমেকের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর রেজাউল করিমের দূরদর্শিতার কারণে এ সেবা পাওয়া যাচ্ছে। এ জন্য ওনাকে সংবর্ধনা দেয়া উচিত ছিল। কিন্তু মিথ্যা ও কাল্পনিক অভিযোগে দুদকে মামলা করে ওনার (প্রফেসর রেজাউল করিমের) পেনশনটা আটকে দেয়া হয়েছে। আমরা চরম অকৃতজ্ঞ। থমকে থাকা একটি মেডিকেলকে ওনি গতি সঞ্চার করেছিলেন। ওনার নির্ধারিত সেই কক্ষে আরো একটি পিসিআর ল্যাব বসানোর উদ্যোগ চলছে৷ সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিকতায় এ সেবা আরো বাড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

বাংলাধারা/এফএস/এআর

আরও পড়ুন