বাংলাধারা প্রতিবেদন »
একটা সময় ছিল নারীরা ঘরের বাহির কাজ করতো না। কিন্তু এখন নারীরা আর ঘরে বসে থাকে না। তারাও পুরুষের মত সমান তালে প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করছেন। নানামুখী প্রশিক্ষণ গ্রহণে আগ্রহী হয়ে উঠেন। তেমনি এখন নারীরা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে কাজ করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। চট্টগ্রাম নগরীর নাসিরাবাদ আবাসিক এলাকার ২ নম্বর রোডের ২৪ নম্বর বাড়িতে ২০১৩ সাল থেকে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর সংস্থাটি নারীদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে।
এখান থেকে আট বছরে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে বিভিন্ন পোশাক কারখানায় প্রায় ছয় শতাধিক ও বিউটিপার্লারে ২ শতাধিক নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৪০ ভাগ নারী নিজেরাই উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন।
নাসিরাবাদের এই অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে কাজের সুযোগ পেয়েছেন পলি বিশ্বাস, সুমা আক্তার, তাহমিনা আক্তার লিমা। নিজেই সফল উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন জান্নাতুল ফাহিমা মুক্তা, জেসমিন সোলতানা ও রাবেয়া খাতুন নামের এ নারী।
নগরীর অক্সিজেন এলাকায় কেডিএস ফ্যাশন্সের সুয়িং অপারেটর পলি বিশ্বাস জানান, প্রায় ছয় বছর আগে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরে। সেলাইয়ের কাজ প্রথম সেখান থেকেই শিখেছি। তারপর ওই প্রতিষ্ঠানের সাবেক উপ-পরিচালক অঞ্জনা ভট্টাচায্যর সহায়তায় এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাই। এখন আমার প্রমোশন হয়েছে। প্রথমে খুব ছোট একটা পদের মাধ্যমে কাজ শুরু করেছি। তখন মাত্র ৩ হাজার টাকা বেতন পেলেও এখন বেতন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার টাকা। এখন আমি আমার পরিবারে অর্ধেক ভার বহন করি।
লিমা নগরীর বাদুরতলা ‘ইফতি বিউটি পার্লার’ নামের একটি বিউটি পার্লারে কাজ করছে। তিনি বলেন, ভালোবেসে বিয়ে করেছি ৭ বছর আগে। কিন্তু ভুল মানুষের হাত ধরায় বেশি দিন সংসার হয়নি আমার। সে প্রায় আমার গায়ে হাত তুলনো। একসময় আমাকে আর আমার সন্তানকে ফেলে আরেকটা বিয়েও করে। তখনি কাজের সন্ধানে এদিক-ওদিক খবর নিয়ে ২০১৪ সালের শেষের দিকে আমি এ অধিদপ্তর থেকে ৩ মাসের একটা প্রশিক্ষণ নিই বিউটিফিকেশনের উপর। তখনই অধিদপ্তরের পরিচালক ছিলেন অঞ্জনা ম্যাডাম। তারই সুপারিশে মেহেদীভাগ একটা পার্লারে খুব অল্প বেতনে একটা চাকরি হয়। পরে আরো ছোট-বড় কিছু পার্লারে কাজ করেছি। আজ তিন বছর হলো ইফতিতে কাজ করছি। এখানে পুরো পার্লারটি আমার দায়িত্বে। আমি এখানে সিনিয়র বিউটিশিয়ান। এখন মা-বাবা, ছোট ভাই ও সন্তানকে নিয়ে আমার সংসার। আমার মেয়ে ও ভাইকে পড়ালেখা করাচ্ছি।
মুক্তা বলেন, চট্টগ্রামে থাকাকালে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলাম। বিয়ের পরে পাঁচ বছর হলো শশুরবাড়ি কুমিল্লাতে চলে আসি। আমার স্বামী আর্থিকভাবে একটু অসচ্ছল। তাই সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতেই কুমিল্লর নাঙ্গলকোট বাজারে দুইটি মেশিন নিয়ে ছোট পরিসরে একটি সেলাইয়ের দোকান দিয়েছি। এখন আরো একটি দোকান নিয়েছি। আমার দুই দোকানে বর্তমানে কাজ করে ছয়জন নারী। এ নারীদের মধ্যে একজন স্বামী পরিতাক্ত, তিনজন বিবাহিত ও বাকি দুই জন পড়ালেখার পাশাপশি এখানে কাজ করছে। তারা সবাই স্বামী-সন্তান ও পরিবার নিয়ে অনেক ভালো আছেন। তেমনি সফল হয়েছেন বাকিরাও।
প্রথম থেকেই সংস্থাটি ৪শ’ সিট নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেন। যা এখনো চলমান। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে এখানো পর্যন্ত যারা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে তাদের প্রায় অনেকে কর্মসংস্থান হয়েছে বলে জানিয়েছেন মহিলা অধিদপ্তরের বর্তমান উপ-পরিচালক মাধবী বড়ুয়া।
মাধবী বড়ুয়া আরো জানান, আগে নারীরা ঘর থেকে বাহির হত না। কিন্তু এখন নারীরা অনেক বেশি সচেতন। তারা নিজ দায়িত্বে এসব প্রশিক্ষণের জন্য আসেন। তাই এখন আমাদের সিটের তুলনায় প্রশিক্ষনার্থীর সংখ্যাই বেশি। প্রতিটি কোর্স তিন মাস মেয়াদে হয়ে থাকে। আমাদের প্রতি মৌসুমে ২ ব্যাসে ৫টা বিষয়ের উপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ১শ’ জন নারীকে। অনেকে সিটের অভাবে প্রশিক্ষণ নিতে পারে না। আমরা তাদের পরবর্তী সময়গুলোতে তাদের সুযোগ দেয়ার চেষ্টা করি। তাই সিট আরো বৃদ্ধি করা দরকার।
মাধবী বড়ুয়া আরো জানান, প্রশিক্ষণ শেষে অনেক নারী পোশাক কারখানায় চাকরির সুযোগ পায়। অনেকে নিজেই উদ্যোক্তা হয়ে উছঠেন। অনেকে ঘরে বসে শো-পিস তৈরি করে অনলাইনে ব্যবসা করছে। কেউ কেউ সেলাই মেশিন নিয়ে ঘরে সেলাই কাজ করছে। এছাড়া এখানে যারা প্রশিক্ষণ নেন সেই নারীদের প্রতিদিন ১শ’ টাকা করে যাতায়াত খরচও দিই। জুলাই মাস থেকে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু হয়। তবে করোনার কারণে গত দুই বছরের ধরে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালানো সম্ভব হচ্ছে না। মাঝখানে সরকারিভাবে আদেশ আসার প্রথম প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু করি। আবারও করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসায় কার্যক্রম বন্ধ করতে হয়। নারীদের সেলাই ও বিউটিফিকেশনের উপর বেশি আগ্রহ দেখা যায়।
বাংলাধারা/এফএস/এআর










