১২ মার্চ ২০২৬

চাটগাঁইয়া এগ্রোর অর্গানিক গরু সেরার সেরা

বিশেষ প্রতিবেদক »

চারিদিকে ছায়াঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশে বিদেশী গরুর দেশীয় খামার। তরুণ উদ্যোক্তাদের সাফল্যে গাঁথা এ খামার। কাউব্রাশসহ সম্পূর্ণ অর্গানিক পদ্ধতিতে গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক এই খামার। প্রতিবছরই গুনে গুনে শ’খানেক গরুর বাছুরকে নিয়ে আসা হয় প্রতিপালনের জন্য। প্রায় আড়াইকোটি টাকা বিনিয়োগে গড়া খামারটি দেখলে বোঝার উপায় নেই এত স্বল্প পরিসরে অধিক টাকার প্রকল্প। তবে অর্ধেক টাকাই ব্যাংক ঋণের। অনেকটা মায়ের যত্নে শিশুকে গড়ে তোলার প্রয়াস। বাছুরগুলো মাস পার না হতেই যেন পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেয়। বিদেশী এসব গরু সযত্নে বেড়ে উঠতে থাকে খামারে।

২০২০ সালেই সবুজে ঘেরা পরিবেশটিতে যদিও খামারটি ভেতরে আধুনিকতার ছোঁয়ায় কৃত্রিমত্তা লাগান তরুণ দুই উদোক্তা আব্দুস সবুর লিটন ও রিফাত মোহাম্মদ ইকবাল। খামারে প্রত্যেকটি বাছুর দিনে দিনে যখন মাতৃস্নেহে বড় হতে থাকে তখন তরুণ এই দুই উদ্যোক্তা আশার আলো দেখেন স্বপ্নের কোলে। খামারে দাঁড়িয়েই যেন স্বপ্নের দিন গুনতে থাকেন মুনাফা প্রাপ্তির আশায়। দুজনেই দিনে প্রায় ১২ ঘন্টা সময় দেন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে। তবে এই দুই উদ্যোক্তা কিন্তু নীতি উদ্দেশ্য নিয়ে এগুচ্ছেন। তাদের একটি ধারাবাহিক নীতির কথা জানাতে গিয়ে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সবচেয়ে বেশী। এটি হলো ‘প্রফিট ইজ দ্যা চাইল্ড অব অনেস্টি এন্ড কোয়ালিটি’। মূলত গ্রাহক চাহিদা আর আস্থা পেতেই এমন স্লোগান কাজ করছে এখানে।

চাটগাঁইয়া এগ্রো নামের এ খামারটির অবস্থান চট্টগ্রামেই। তবে চট্টগ্রামের জন্যই কি চাটগাঁইয়া শব্দটি এসেছে নাকি চট্টগ্রামের মানুষ মোটাতাজা ও বিশালাকার গরু পছন্দ করেন তাই এই খামারের নাম এমনটি করা হয়েছে তা জানার কৌতুহল অনেকেরই। বিকেল হলেই কৌতুহলীদের আড্ডাও জমে এই আঙ্গিনায়। তবে নামটা শুনে যেমন চাঁটগা শব্দটি উঠে এসেছে তেমনি এগ্রো থেকে খামারের বিষয়টি নিশ্চিত করা যাচ্ছে এমনটিই ধারনা আগতদের।

চাটগাঁইয়া এগ্রোতে এরাবিয়ান দুম্বা।

নগরীর পাহাড়তলী থানাধীন এ খামার। একেখান বা অলংকার মোড় থেকে যেকোন গাড়িতে যেতে পারবেন উত্তর কাট্টলী এলাকায়। কর্ণেল জোনস রোডের শেষ প্রান্তে একটি রেলপথ রয়েছে। যা চট্টগ্রাম বন্দর জেটি থেকে বেরিয়ে অনেকটা এই খামারের অনতিদূর দিয়ে ঢাকার দিকে চলে গেছে সিঙ্গেল লাইনের মিটারগেজ রেলপথটি। কর্ণেল জোনস রোডকে দুভাগে বিভক্ত করা এই রেলপথটি টপকালেই চাটগাঁইয়া খামার।

খামারের সামনেই রয়েছে একটি লোহার ফটক। ফটকের ভেতরে রয়েছে একটু খালি জায়গা। আসন্ন কোরবানির ঈদ উপলক্ষে একটি ছাউনী টাঙ্গানো হয়েছে। পুঁতে দেয়া হয়েছে বাঁশের খুঁটি। যাতে খামারের বিশালাকার গরুগুলোকে শোডাউন করানো হয় ক্রেতার আকর্ষণ কাড়তে। শুধু যে শোডাউন হয় তা নয় অর্গানিক পদ্ধতিতে বেড়ে ওঠা এসব গরু খুবই আরাম প্রিয়। এদের আরাম পাইয়ে দিতে লাগানো হয়েছে কাউব্রাশ। আরেক আধুনিকতা এই কাউব্রাশকে ঘিরে। কৌতুহলীরা প্রতিনিয়ত দেখতে ভিড় করেন কিভাবে গরুকে আরাম-আয়েশ দিয়ে মাতৃস্নেহ দেয়া হয় কৃত্রিমভাবে।

প্রতিটি দুই লাখ টাকা মূল্যের ভেড়া ও দুম্বা লালিত হচ্ছে।

এক লাখ টাকারও বেশী মূল্যের একটি আধুনিক মেশিন স্থাপন করা হয়েছে এই খালী জায়গাটুকুতে। বিদ্যুতের স্লুইচ অন করলেই কাউব্রাশটি ঘুরতে শুরু করে। এসময় গরুকে ওই ব্রাশের সামনে নিয়ে এলেই গরু নিজে থেকেই তার বিশালাকার শরীরাটা ব্রাশের কাছে নুঁইয়ে দিয়ে ঘষতে থাকে। এতে ব্রাশটি অনেকটা ঘুরে ঘুরে গরুর পিঠের অংশ তথা ঘাড়, চোয়াল, মাথা, কান, লেজের উপরিভাগ ও চোটে আরাম দিতে থাকে। তবে অবাক হবার বিষয় হচ্ছে কাউব্রাশে যখন গরুটি গা ঘঁষতে থাকে তখনই মনে হয় গরুগুলো প্রশিক্ষিত। আরাম নিতে কোন ধরনের ভুল নেই তাদের আচরণে।

সীমানা প্রাচীরের আরেকটি গেইট পার হলেই রয়েছে খামারের মূলফটক। প্রায় সাড়ে সাত হাজার বর্গফুটের একটি সেড রয়েছে টিপ টপ অবস্থায়। গরুর গোবরের কোন দুর্গন্ধ পাওয়া যাবে না এমনকি চোখেও দেখা যাবে না। কারণ সেকেন্ডের মধ্যেই সেবরা পানি দিয়ে ধুঁয়ে মুঁছে পরিষ্কার করে দিচ্ছে।

কাউব্রাশের ছোঁয়ায় আরাম নিচ্ছে আমেরিকান প্রজাতির ব্রাহমা ষাঁড়।

এখানে প্রায় একশ গবাদি পশুকে অর্গানিক পদ্ধতিতে ও কৃত্রিম উপায়ে প্রাকৃতিক খাবার দিয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে। এই খামারটি মূলত প্রায় বিশ গন্ডা জায়গার উপর হলেও সেডটি তত বড় নয় তবে বিনিযোগের জন্য সরকার থেকে খামার তৈরিতে কৃষি বা পোল্ট্রি ঋণ পাওয়া গেলে আরো বড় পরিসরে খামারের বিস্তৃতি করা যাবে। এক্সক্লুসিভ ভিডিও ও গুগলের মাধ্যমে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে দেখে প্রশিক্ষণের অনেকটা অংশ বাগিয়ে নিয়েছেন উদ্যোক্তা রিফাত। এছাড়াও বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে এমনকি চট্টগ্রামে থাকা বিভিন্ন খামার পর্যবেক্ষণ করেও কিছুটা অভিজ্ঞতা নিয়েছেন খামার পরিচালানার। এমনটিই বললেন উদ্যোক্তা রিফাত মোহাম্মদ ইকবাল।

প্রতি মাসে ১৮ হাজার টাকা ভাড়া দেওয়া হয় খামারটির জায়গার জন্য। মাসে ২৫/৩০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল দিতে হয়। তাও আবার বাণিজ্যিক বিল পরিশোধ করতে হয়। সবকিছু মিলে মাসে প্রায় ১১/১২ লাখ টাকা গুনতে হয়। আড়াই কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রায় এক কোটি টাকাই চড়া সুদে ঋণ। ঋণের চড়া সুদের কারণে মুনাফার পরিমান কমে যাচ্ছে এমন অভিযোগ উদ্যোক্তাদের।

ইন্ডিয়ান সিন্ধি গরুকে আদর করছে ভুটানি গরু।

এ খামারে এখন প্রায় একশটি বিভিন্ন জাতের গরু রয়েছে। রয়েছে ইন্ডিয়ান, ইন্ডিয়ান সিন্ধি, পাকিস্তানের শাহিওয়াল ও গ্রিলান্দো। দেশী প্রজাতির গরুও রয়েছে। খামারে আম্বর রাখা হয়েছে এদের নাম। তবে আমেরিকার একটি সুখ্যাত ব্রাহাম প্রজাতির গরুও রয়েছে এই খামারে। এই প্রজাতির ষাঁড় ক্ষিপ্ত হলে ১৫/২০ জনের শক্তিকেও হার মানিয়ে পালাবে। তবে পেটের নিচে আরাম দিয়ে এদের নিয়ন্ত্রণ করা যায়। খামারে ষাঁড়টির শুধু নাকে লোহার রিং লাগানো রয়েছে। কিন্তু বাজারে নেওয়ার সময় গলায় মজবুত রশি লাগানো নিশ্চিত করা না গেলে বিপদ আছে ক্রেতার। এ ধরনের একটির ওজন প্রায় ১০টন। এবারের কোরবানীর ঈদে চট্টগ্রামের সকল খামারীদের মধ্যে এটিই সেরা গরু। এর দাম হাঁকা হয়েছে ২৫ লাখ টাকা।

অর্গানিক পদ্ধতিতে আধুনিক খামারের উদ্যোক্তা আবদুস সবুর লিটন বাংলাধারা প্রতিবেদককে বলেন, ‘মাতৃস্নেহে এসব বিদেশী গরুকে দেশীয় খামারে আমরা লালন পালন করছি। মানসম্মত পরিবেশে এদের সাইলেস জাতীয় কাঁচা ঘাস ও দানাদার খাবারে গরুর পরিপুষ্টতা আনায়ন করা হচ্ছে। কোনো ধরনের কৃত্রিমতা নেই। ফলে গ্রাহক চাহিদা গতবারের তুলনায় এবার অনেক বেশি। গ্রাহক সেবার শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে হালাল করা হচ্ছে কোরবানির এসব পশু। কোন ধরনের মেডিসিনের ব্যবহার নেই। শুধু মাত্র ডাক্তারি মতে প্রতি তিন মাস অন্তর পশুদের সুস্থ্যসবল ও সুন্দর রাখতে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়।’

পাকিস্তানি শাহিওয়াল প্রজাতির ষাঁড়টি অনেক লম্বা ও শক্তিশালী।

এছাড়াও ইন্ডিয়ান বিটল জাতের প্রায় ২ লাখ টাকা দামের ছাগল যেমন রয়েছে তেমনি প্রায় তিন লাখ টাকা দামের ভেঁড়াও রয়েছে এই খামারে। দেড় থেকে দুই বছর বয়সের এসব বাছুর যেন তরে তরে বড় হতে থাকে মায়ের আদরে। অনেকটা কোলে পিঠে করা আদরে গদ গদ করে বড় করতে গিয়ে খামারের ব্যয়ভার প্রতিমাসে দাঁড়ায় প্রায় ১১/১২ লাখ টাকা। তবে খুঁদে আকৃতির একটি গরু রয়েছে এই খামারে দেখে মনে হবে যেন এটি কোন বাছুর, মূলত এটি ভুটানি গরু। এই গরুটির দামও ২ লাখ টাকা। ৮/১০ কর্মচারী প্রতিনিয়ত এ খামারে সেবা দিয়ে যাচ্ছে মাতৃস্নেহের আন্তরিকতায়। দিনের বিভিন্ন সময়ে রাজশাহী থেকে আনা সাইলেস জাতীয় কাঁচা ঘাস আর চাক্তাইয়ের দানাদার খাবারেই এদের শারীরিক বৃদ্ধি ঘটানো হয়। শুধু খাবারের উপরই নির্ভরশীলতা নয় আরো অনেক ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয় ধাপে ধাপে এদের জন্য।

বিদেশী প্রজাতির এসব গরুকে যেভাবে যত্ন করা হয় তা যেন মায়ের বিকল্প নেই এমন শর্তে। খামারের ভেতরেই নয় বাইরেও গবাদি পশুকে কাউব্রাশ দিয়ে আরাম আয়েশ দেওয়াটা অন্যরকম কাজ। অনেকটা মায়ের ভালবাসার মতোই সেবার স্থানটা দখল করে নেয়। দিনের বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের সেবা না দিলে বিদেশী জাতের এসব গরুর শারীরিক বৃদ্ধি বা প্রসারতা আসে না। তবে লাখ টাকার এ মেশিনে কোটি টাকার সেবার কাজই চলে সারাদিন। যদিও সেবার বা মাতৃ স্নেহের কোন বিনিময় মূলই কেউ কখনো দিতে পারেনি। এ খামারে সকাল থেকে রাত অবধি সেবার মান নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলার কোন সুযোগ নেই।

ইন্ডিয়ান ব্রিটল প্রজাতির প্রতিটি ছাগলের দাম দুই লাখ টাকা।

এই খামারে অর্গানিক পদ্ধতিতেই সাইলেস ও দানাদার খাবার দিয়েই গুরুর দেহের ও ওজনের বৃদ্ধি ঘটানোর প্রক্রিয়াটি শুধু স্থানীয়ভাবেই নয় তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে অনলাইনেও চাটগাঁইয়া এগ্রোর খ্যাতি বিরাজমান। যদিও গত বছর থেকে এই খামারের পদচারণা শুরু কিন্তু উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতার কারণে সুদূর প্রসারী চিন্তা ভাবনা রয়েছে তাদের। ভেজাল নয়, অর্গানিক পদ্ধতিতেই গবাদি পশুর খাবার নিশ্চিত করেই প্রতি তিনমাস অন্তর অন্তর ভ্যাকসিন দিয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয় এই খামারে রক্ষিত সকল প্রাণীকুলের।

খামারী বা উদ্যোক্তাদের একজন রিফাত মোহাম্মদ ইকবাল বাংলাধারা প্রতিবেদককে জানান, ‘এখানে এরাবিয়ান দুম্বা যেমন রয়েছে তেমনি আমেরিকার ব্রাহমা প্রজাতির গরুও রয়েছে। তবে প্রজননের উদ্দেশ্যে এদের কয়েকটিকে প্রতিপালন করা হচ্ছে যথেষ্ট পরিমাণ যত্ন সহকারে। বিদ্যুৎ বিল বাণিজ্যিকভাবে দিতে গিয়ে ব্যয়ের পরিমাণটা বেড়ে গেছে। বিশেষ করে কোরবান উপলক্ষ্যে অনেকে মাসখানেক আগ থেকে পছন্দের প্রাণিটির আগাম অর্ডার দিতেও আসেন। নির্ধারিত কোন দামে খামার থেকে বেচা বিক্রি হয় না। তবে ক্রেতার দরকষাকষিতে হয়ত দাম একটু এদিক সেদিক হতে পারে এমন ধারনা দিলেন এই তরুণ উদ্যোক্তা। খামারে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির এসব গরুর নামও রাখা হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে মেশক, আম্বর, মাম্বা, রক, ক্রুজার, প্রোমেক্সসহ বিভিন্ন নাম।

বাংলাধারা/এফএস/এআই

আরও পড়ুন