১০ মার্চ ২০২৬

সিআরবি’তে হাসপাতাল নির্মাণে জটিলতার পাশাপাশি তৈরি হয়েছে বিতর্ক

বাংলাধারা প্রতিবেদক » 

নগরীর সিআরবিতে সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে একটি ৫০০ শয্যা বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং ১০০ আসন বিশিষ্ট মেডিক্যাল কলেজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে ।

২০২০ সালের ১৮ই মার্চ ইউনাইটেড হাসপাতালের সাথে এ নিয়ে একটি চুক্তিও হয়েছিল। হাসপাতাল নির্মাণে জটিলতার পাশাপাশি নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পেরিয়ে সিআরবি রক্ষার আন্দোলন মাঠ পর্যায়েও নামতে যাচ্ছে।

উদ্বিগ্ন নাগরিকবৃন্দের ব্যানারে আগামী সোমবার (১৬ জুলাই) একটি মানবন্ধনের ডাক দিয়েছে চট্টগ্রামের বিশিষ্টজনরা। ইতোমধ্যে গত সোমবার (১২ জুলাই) চট্টগ্রামের ১৭ বিশিষ্টজন এ দাবির সাথে একমত প্রকাশ করে গণমাধ্যমে ইমেল-এ বিবৃতি পাঠান।

আবৃত্তিশিল্পী রাশেদ হাসান স্বাক্ষরিত ওই বিবৃতিতে একমত প্রকাশ করেছেন শহীদজায়া বেগম মুশতারী শফী, প্রফেসর ড. অনুপম সেন, প্রফেসর ড. সিকান্দার খান, দৈনিক আজাদী সম্পাদক এমএ মালেক, অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত, প্রফেসর আবুল মনসুর, কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান, প্রফেসর ডা. একিউএম সিরাজুল ইসলাম, প্রফেসর হরিশংকর জলদাস, অধ্যাপক ফেরদৌস আরা আলীম, ডা. চন্দন দাশ, নাট্যব্যক্তিত্ব আহমেদ ইকবাল হায়দার, প্রফেসর অলক রায়, স্থপতি জেরিনা হোসেন, প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার প্রমুখ।

জানা যায়, সিআরবি এলাকার শতবর্ষী গাছ কেটে এই প্রকল্পের অধীনে বহুতল ভবন নির্মাণ করার যে পরিকল্পনা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের; তার অনুমতি দেবে না চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। পাশাপাশি পরিবেশের ক্ষতি করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করার বিপক্ষে মত দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

অন্যদিকে প্রকল্পটি নিয়ে মত প্রকাশ করেছেন শিক্ষা উপ মন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। তিনি বলেছেন, কোনোভাবেই উম্মুক্ত স্থানে অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে না। প্রকল্পটি যদি পরিবেশের ক্ষতি করে তাহলে অবশ্যই সরানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

মঙ্গলবার (১৩ জুলাই) বিকালে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে তিনি লিখেছেন-

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্যা কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন পরিবেশের প্রশ্নে কোনো ছাড় নেই। সুতরাং বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই। আস্থা রাখুন। চট্টগ্রামে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের সদরদপ্তর সিআরবির একটি জায়গায় সরকারি বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে হাসপাতাল নির্মাণ এবং পরিবেশ ও বৃক্ষ সংরক্ষণ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে শীঘ্রই আলোচনা করে এর একটি সমাধান করা হবে।’
‘শহরের প্রানকেন্দ্রে এই দৃষ্টিনন্দন সবুজ জায়গায়, পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে এই উন্মুক্ত জায়গায় যেনো অবকাঠামো নির্মাণ না হয়, এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। প্রকল্পের জায়গা আর উন্মুক্ত জায়গা সমূহের স্থান এক নয়, বা একই জায়গায় কি না, সেটি নিয়ে আলোচনা হবে। একই স্থানে হলে সেটিকে সরানোর প্রয়োজন হবে। কোনোভাবেই উন্মুক্ত জায়গায় অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে না।’

শতবর্ষী গাছ কেটে হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে কি না জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আহসান জাবির বলেন, ‘শিগগিরই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু হবে। তখন দেখা যাবে। যেটা ভালো হয়, সেটাই করা হবে।’

এ প্রসঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের পরিচালক মো. নুরুল্লাহ নূরী দেশ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘সিআরবি এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণ করা অযৌক্তিক। এটা তো রিজার্ভ এরিয়া। সেখানে অনেকগুলো শতবর্ষী গাছ আছে। আশা করি অনুমোদনও পাবে না। সিডিএর অনুমোদনের পর পরিবেশের কাছে আসবে। পরিবেশের বিরূপ প্রভাবের সমীক্ষা (ইআইই) রিপোর্টের পর পরে সিদ্ধান্ত হবে। কোনো মতেই নগরীতে পরিবেশের ক্ষতি করে এমন কোনো ভবন নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না।’

সিডিএর প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি শাহীনুল ইসলাম খান বলেন, ‘এখনো এই হাসপাতালের নির্মাণের অনুমতির জন্য সিডিএতে আবেদন করা হয়নি। করলেও কোনোভাবেই অনুমোদন পাবে না। তা ছাড়া সিআরবি আমাদের হেরিটেজ এরিয়া। এখানে কোনোভাবেই হাসপাতাল নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হবে না। হাসপাতাল নির্মিত হলে এখানে হাজার হাজার লোকজন চিকিৎসা নিতে আসবে, তখন পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাবে।’

জানা যায়, সিআরবি এলাকায় বিদ্যমান রেলওয়ের হাসপাতাল (বক্ষব্যাধি) সংশ্লিষ্ট ও দক্ষিণ অংশে ছয় একর জায়গার ওপর গড়ে তোলা হবে এই হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ। এই অংশে রেলওয়ের কয়েকটি কোয়ার্টারও রয়েছে। এই পুরো জায়গাজুড়ে রয়েছে নানা প্রজাতির শতবর্ষী অনেকগুলো গাছ। এ স্থানেই বিশেষায়িত হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ নির্মাণে গত বছরের ১৮ মার্চ ইউনাইটেড গ্রুপের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়।

আরও জানা যায়, ৫০ বছর মেয়াদের এই চুক্তিতে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে রেলওয়ের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হয়। চুক্তির আওতায় হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ স্থাপনের জন্য রেলওয়ের ছয় একর জমি দেওয়া হবে। তবে এই জায়গা দেওয়া হবে দুই ধাপে। প্রথম ধাপে ২.৪২ একর এবং ২য় ধাপে বাকি ৩.৫৮ একর জমি বুঝিয়ে দেওয়া হবে এই প্রতিষ্ঠানকে। আর ৫০০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতালটি নির্মাণে প্রতিষ্ঠানটিকে পাঁচ বছর সময় দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম তিন বছরের মধ্যে ২৫০ শয্যা এবং পরবর্তী দুই বছরে বাকি ২৫০ শয্যার নির্মাণ কাজ শেষ করতে হবে। তবে ১০০ আসনের মেডিকেল কলেজ স্থাপনে ১০ বছর সময় দেওয়া হয় প্রতিষ্ঠানটিকে। চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে রেলওয়ে পাবে এককালীন পাঁচ কোটি টাকা। আর জমির ফি বাবদ পাওয়া যাবে প্রতি বছর দেড় কোটি টাকা। চিকিৎসা সুবিধা হিসেবে হাসপাতালের নিয়মিত খরচের ২০ শতাংশ কমে চিকিৎসাসেবা গ্রহণের সুযোগ পাবেন রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

বাংলাধারা/এফএস/এআই

আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও

সর্বশেষ