সায়ীদ আলমগীর, কক্সবাজার »
কক্সবাজারে গত ৫দিনের টানা শ্রাবণ বর্ষণে পাহাড়ী ঢলে সৃষ্ট বানের পানি নামতে শুরু করেছে। এতে ঢলের স্রোতে তৈরী হওয়া ক্ষতগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে। মানুষের বাসা-বাড়ির পানিবন্দি অবস্থা কিছুটা পরিবর্তন হলেও দুর্ভোগ সহজে পিছু ছাড়ছে না।
জেলার ৯ উপজেলার অধিকাংশ নিম্নাঞ্চলে এখনো পানি বিদ্যমান রয়েছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় ক্ষতিগ্রস্থ বাড়িঘর, পুকুর, চিংড়ি ঘেরসহ রোপা আমন ও শাকসবজির আবাদ মেরামতে হাত দিতে পারছেন না জলদূর্ভোগ তাড়িতরা। জেলার রামু-সদর, পেকুয়া, চকরিয়া, ঈদগাঁও, উখিয়া, টেকনাফসহ প্রতিটি উপজেলায় বিভিন্ন এলাকা কম-বেশি প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানিতে ঘর-বাড়ি, স্কুল-কলেজ, রাস্তাঘাট ও হাট-বাজার ডুবে যায়।

টানা বর্ষণে চকরিয়ার মাতামুহুরী, ঈদগাঁওর ফুলেশ্বরী ও রামুর বাঁকখালীতে তীব্র বেগে পাহাড়ি ঢল নামে। পানিতে একাকার হয়ে যায় ৯ উপজেলার উপকুল-নদীরতীর ও সমতল সমেত অর্ধশত ইউনিয়নের অর্ধসহস্রাধিক গ্রাম। টানা কয়েকদিন বাড়ির ভেতর পানি স্থিতি থাকায় হাজার হাজার কাঁচা ঘর-বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গত মঙ্গলবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত ৫টি পৃথক পাহাড় ধসে ১৩ জন এবং বানের জলে ভেসে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৯জন। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত রোহিঙ্গা ও শিশুসহ ২১ জন মারা যায়।
শুক্রবার সকালে পেকুয়াকে বন্যার পানিতে খেলতে গিয়ে তলিয়ে যাওয়া জাহেদুল ইসলাম (১২) নামে এক শিশুর মরদেহ বেলা ১১টার দিকে উদ্ধার হয়। জাহেদুল ইসলাম পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের পুর্ব গোঁয়াখালী গ্রামের ফজল করিমের ছেলে।
টিউবওয়েল ও বসতবাড়ির রান্নার চুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট পড়েছে। নির্ঘুম রাত কাটানোর পাশাপাশি ক্ষুধার জ্বালায় অতিষ্ট ভুক্তভোগীদের প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ খাবার বিতরণ অব্যহত রেখেছে। তবে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতূল।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, বন্যা ও পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সহায়তায় ৩০০ মেট্রিক টন চাল, ২ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১৫ লাখ নগদ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বন্যায় এবং পাহাড় ধসে নিহতদের পরিবারে জনপ্রতি দেয়া হয়েছে ২৫ হাজার নগদ টাকা। ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসরত প্রায় ২৫ হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে প্রয়োজনীয় খাবার দেয়া হয়। জেলা প্রশাসনের সাথে কাজ করছে ৮ হাজার স্বেচ্ছাসেবক ও শৃংখলাবাহিনীর সদস্যরা। চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার কামরুল হাসান বৃহস্পতিবার বিকেলে এক জরুরী সভায় সাবলম্বীদের স্ব স্ব অবস্থান থেকে দূর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে অনুরোধ করেন।
শুক্রবার সকাল থেকে বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। বাসাবাড়ি থেকে পানি নামলেও এলাকার বিলে-মাঠে পানি থৈ থৈ করছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট ও বাসাবাড়ির ক্ষতচিহ্ন দৃশ্যমান হচ্ছে। চলাচলের এখনো ভরসা নৌকা। পানি কমতে শুরু করায় বাড়িঘরে ফিরে আসছেন কেউ কেউ। অনেক ঘরে বেড়া, মাথার ওপর চাল, খাবার, ওষুধ কিছুই নেই। পুকুরের মাছ, ক্ষেতের ফসলসব তলিয়ে গেছে। একদিকে লকডাউন, অপরদিকে বন্যায় বন্ধ রয়েছে আয়-রোজগার। চাকরিজীবীদের ভোগান্তি চরমে। সব মিলিয়ে বন্যার্তদের ত্রাহি অবস্থা।

ভুক্তভোগীরা বলেন, মহামারি করোনার থাবার মাঝে বন্যার ধকল দিশেহারা করে দিয়েছে। বন্যায় অনেক ঘরে কয়েক ফুট পানি ঢুকেছে। আবার অনেক বাড়ি ডুবে রয়েছে চালা পর্যন্ত। অনেক বাড়িতে দুয়ারে পানি আসায় মানুষ জলবন্দি। এমন দুর্যোগে গৃহপালিত প্রাণী নিয়ে তৈরী হয়েছে চরম ভোগান্তি। বাসাবাড়িতে পানি ঢুকা লোকজন আশ্রয় নিয়েছে অন্যের বাড়ি, সাইক্লোন শেল্টার কিংবা উঁচু স্থানে। অনেকের সময় কেটেছে নৌকায়। হাট-বাজার ও রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় ভোগান্তির শেষ নেই।
দুর্গতরা জানিয়েছেন, বন্যায় রোপা আমন আবাদ ও সবজি ক্ষেত ভেসে গেছে। অনেকের বাড়িঘর পানিতে ডুবে আছে। হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল নিয়ে বিপাকে পড়ে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিয়েছেন কেউ কেউ। পানি কমতে শুরু করার সঙ্গে দেখা দিয়েছে খাবার পানির সংকট। টিউবওয়েল ডুবে গেছে। আর যেসব টিউবওয়েল জেগেছে সেগুলো দিয়ে পানি ওঠে না। নদী ও খাল-বিলের পানিতে বিভিন্ন আবর্জনা ভাসছে। পানি ফুটিয়ে বা অন্য কোনও উপায়ে খাওয়ার উপযোগী করার সুযোগও নেই। মাঠের ফসল তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে চাষের মাছও। আয়ের পথই খোলা নাই। ঘর-দুয়ার ঠিক করা নিয়ে দু:চিন্তায় সবাই।

বন্যাকবলিত এলাকায় আমাশয়, ডায়রিয়ার মতো পানিবাহিত রোগের সঙ্গে চর্মরোগ ছড়িয়ে পড়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। বিদ্যুতের খুঁটির গোড়ার মাটি সরে যাওয়ায় সংযোগ বন্ধ রাখা হয়েছে বিভিন্ন এলাকায়। এ কারণে অন্ধকারে আছেন অনেক বানভাসিরা।
ঝিলংজার মুক্তারকুলের জাফর আলম বলেন, বন্যার পানি ঘরে ঢুকলেও মাচা করে ঘরেই ছিলাম। পরে ঘরের চাল বরাবর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে উপজেলা সদরে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয়ে যায়। শুক্রবার (৩০ জুলাই) সকাল থেকে পানি কমতে শুরু করায় বাড়ি ফিরেছি। কিন্তু ঘরে থাকার তো কোনও উপায় নাই।
কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, বন্যার পানি নেমে গেলে পানিবাহিত নানা রোগ হয়, সেদিকে আমাদের বিশেষ নজর রয়েছে। বিভিন্ন উপজেলা থেকে সামান্য রিপোর্ট পাচ্ছি। তবে রোগবালাই এখনও প্রকট আকার ধারণ করেনি। আমরা প্রস্তুত রয়েছি।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ বলেন, বন্যা কবলিত এলাকাগুলো নজরদারি করা হচ্ছে। দুর্ভোগ তাড়িতরা রোগাক্রান্ত হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট মেরামতেরও। ইতোমধ্যে বন্যা কবলিতদের সহায়তায় ৩০০ মেট্রিক টন চাল, ২ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১৫ লাখ নগদ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। পাহাড় ধসে নিহতদের পরিবারে জনপ্রতি ২৫ হাজার নগদ টাকা দেয়া হয়েছে।
বাংলাধারা/এফএস/এআই












