মাকসুদ আহম্মদ, বিশেষ প্রতিবেদক»
রোহিঙ্গারা শরনার্থী শিবির ছেড়ে পালাচ্ছে। দেশব্যাপী জেলায় জেলায় ছড়িয়ে পড়ার টার্গেট নিয়ে এগুচ্ছে তারা। এ পর্যন্ত হাজারো রোহিঙ্গা সড়কপথে পালাতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চেকপোস্টে আটকা পড়েছে। আবার সমুদ্রপথে ইঞ্জিন বোটে চড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করতে গিয়ে নৌকা ডুবিতে মৃত্যুর ঘটনাও একাধিক। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় পালাতে গিয়ে সম্প্রতি ১৭ জন রোহিঙ্গা ইন্দো-পুলিশের হাতে আটক হয়ে কারাগারে রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সর্বশেষ বোয়ালখালী থানা পুলিশ মঙ্গলবার সকালে লেবু বাগানসহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমিসহ বন থেকে কাঠ সংগ্রহের কাজে যাওয়ার সময় বিভিন্ন রাস্তার মোড় থেকে ৭৪ জন রোহিঙ্গাকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পরে তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী দালাল চক্র ও লেবুবাগানের ৯ জনকেও গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃতদের মঙ্গরবার চট্টগ্রাম আদালতে সোপর্দ করেছে পুলিশ।
এ ব্যাপারে বোয়ালখালী থানার অফিসার ইনচার্জ(ওসি) আব্দুল করিম বাংলাধারাকে বলেন, ‘গত ঈদের আগেও ৫০/৬০ জন রোহিঙ্গাকে আটক করেছি চা বাগান ও লেবু বাগান এলাকার বিভিন্ন শেড থেকে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সকালে ৭৪ জনকে বিভিন্ন স্থান থেকে আটক করি। পরে তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী লেবুবাগানের মালিক ও দালাল চক্রের ৯ সদস্যকে গ্রেফতার করেছি। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, কম মজুরীতে এদের দিয়ে কাজ করানো যায়।‘
অভিযোগ রয়েছে, গত ২৬ জুন রাতেও বোয়ালখালী পুলিশ ৩১ জন রোহিঙ্গাকে গ্রেফতার করেছিল অবৈধ অনুপ্রবেশ ও কক্সবাজারের বিভিন্ন শিবির থেকে পালিয়ে আসার জন্য। রোহিঙ্গাদের শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত করতে একটি চক্র কাজ করছে। এ চক্রটি বোয়ালখালীসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ী এলাকায় কম মজুরীতে রোহিঙ্গা শ্রমিক সরবরাহ করছে। বিভিন্ন বাগান মালিক দালাল চক্রের মাধ্যমে এদের নিয়ে এসেছে বলে স্থানীয়দের ধারণা। এলাকার করলডাঙ্গা গ্রামে কালন্দরশাহ(রঃ) মাজার গেইট এলাকায় বিভিন্ন ভাড়া ঘরে থেকে তারা দীর্ঘদিন কাজ করছে। তারা লেবু বাগানে কাজ করতে এসেছিল কম শ্রমমূল্যে। সন্দেহ করা হচ্ছে স্থানীয় একটি চক্রের কারণে রোহিঙ্গরা শিবির ছেড়ে বোয়ালখালীতে এসেছে। কম মজুরীতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে রোহিঙ্গারা। ফলে স্থানীয় শ্রমিকরা কাজ পাচ্ছে না। এমনকি স্থানীয় শ্রম বাজারে শ্রমের মজুরিতে ধস নেমেছে। ফলে স্থানীয়রা কাজ পাচ্ছে না।
প্রশ্ন উঠেছে কি কারণে তারা শরনার্থী শিবির ছেড়ে কক্সবাজার ত্যাগ করার চেষ্টা করছে। জেলা প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারীকে এড়িয়ে শিবির থেকে পালানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এদিকে, বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আয়োজিত সভায় রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় পাওয়া গেলে আটক বা গ্রেফতারের পরিবর্তে উদ্ধার দেখাতে বলায় প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে প্রশাসন।
২০১৭ সালের ১৮ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ শুরু হলেও মূলত ২৩ আগস্ট থেকে বানের পানির মতো রোহিঙ্গা প্রবেশ করার রেকর্ড গড়েছে। মানবিক কারণে ও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের যোগসাজশ সংবাদ পরিবেশন ও মায়া কান্নার কারনে সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গা প্রবেশে কোন বাঁধা প্রয়োগ করেনি বিজিবি।
কিন্তু রোহিঙ্গারা শরনার্থী শিবির ছেড়ে পালাচ্ছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে র্যাব-৭ কক্সবাজারের বিভিন্ন সড়কে চেকপোস্ট বসিয়েছিল। ওই বছরের ৯ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের লিংক রোড এলাকায় স্থাপিত চেকপোস্টে মাত্র কয়েক ঘন্টায় ২১০ জন রোহিঙ্গা আটকের ঘটনা ঘটেছিল। তবে এসব রোহিঙ্গাকে কক্সবাজারে বালুখালী শরনার্থী শিবিরে হস্তান্তর করেছেন তৎকালীন র্যাব-৭ এর মেজর রুহুল আমীন।

প্রশ্ন উঠেছে টেকানাফ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা প্রবেশে কোন বাঁধা নেই। ২০১৭ সালের ২৭ আগষ্ট থেকে এমন ঘোষনায় সীমান্ত দিয়ে নাফ নদী পার হয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে। ফলে কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে শরনার্থীর পরিমান দাড়িয়েছে প্রায় ১১ লাখ। গত ৪ বছরে রোহিঙ্গা শরনার্থীর পরিমান আরো এক লাখ ছাড়িয়ে গেছে।
এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বাংলাধারাকে বলেন, ‘মানবিক দিক চিন্তা করে রোহিঙ্গাদের শরনার্থী শিবিরে ঠাঁই দিয়েছে সরকার। তবে রোহিঙ্গারা যেন কোন অপরাধের সঙ্গে জড়াতে না পারে সেদিকে আমাদের নজরদারী রয়েছে। এছাড়াও রোহিঙ্গারা যেন কক্সবাজার ছাড়তে না পারে সেজন্য চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। বিভিন্ন ভাবে নজরদারী রাখা হয়েছে যেন রোহিঙ্গাকে কেন্দ্র করে কেউ ব্যবসায় মেতে উঠতে না পারে। ‘
অভিযোগ রয়েছে, দেশব্যাপী রোহিঙ্গা ছড়ানো ঠেকাতে মরিয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে একদিকে প্রবেশ অন্যদিকে রোহিঙ্গা ঠেকানোর বিষয়টি এখন প্রশ্নবিদ্ধ। কেন রোহিঙ্গা প্রবেশে বাঁধা না দিয়ে দেশের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গা আটকাতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে তা নিয়ে সচেতনদের মাঝে রয়েছে কৌতুহল। এ কেমন সিদ্ধান্ত, এ কেমন মানবতার টান। তবে এসব রোহিঙ্গা আগামীতে কাল হয়ে দাঁড়াবে যদি অনুপ্রবেশ বন্ধ করা না যায় বা পুশব্যাক করা না যায়। কারণ ত্রাণের পণ্য ও খাদ্য সামগ্রী বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রোহিঙ্গারা উপার্জনের দিকে এগুতে শুরু করেছে। তখনই টেকনাফ-কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন শ্রমবাজার ও দিনমজুর এমনকি হতদরিদ্র শ্রেণীর উপর প্রভাব পড়ছে এখন। অভাবের তাড়নায় শুরু হয়েছে অপরাধ।
আরো অভিযোগ রয়েছে, রোহিঙ্গা প্রবেশে সহায়তা করছে পুরাতন রোহিঙ্গা সিন্ডিকেটসহ টেকনাফ-কক্সবাজার সিন্ডিকেট। উখিয়া ও কুতুপালংয়ে সরকারের নির্ধারিত শরনার্থী শিবির থাকলেও এখন তা বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, বালুখালী থেকে শুরু করে কক্সবাজারের আনাচে কানাচে এমনকি বাসাবাড়িতেও মানবিকতার টানের দোহাই দিয়ে ঠাঁই করে নিচ্ছে রোহিঙ্গারা।
আরো প্রশ্ন উঠেছে এদেশের মানুষের মানবিকতাকে পুঁজি করে শেষ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আবাস গড়ে তোলে কিনা রোহিঙ্গারা। এদিকে, বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরের মোবাইল ও সিম ব্যবহার করেছে এসব রোহিঙ্গারা। প্রশ্ন উঠেছে, বায়োমেট্রিক সিম জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যাতীত কিসের ভিত্তিতে তাদের কাছে বিক্রয় করা হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে মোবাইল অপারেটরেদের দোকানীরা বিভিন্ন নামে এসব সিম বিক্রি করলেও আগামীতে রোহিঙ্গাদের অপরাধের কারণে নিবন্ধিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
২০১৭ সালের ২৫ ও ২৬ আগস্ট প্রথম ২ দিন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ(বিজিবি) রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে বাঁধা দিলেও পরে মানবিকতার বিষয়টি বিবেচনায় এনে সরে দাড়ায় রোহিঙ্গা ঠেকানো থেকে। বিজিবি প্রথমদিকে দুই হাজার রোহিঙ্গা পুশব্যাক করলেও পরে অনায়াশে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছে। এদিকে, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িসহ চট্টগ্রাম অঞ্চলে রোহিঙ্গা ঠেকাতে ২৭টি চেকপোস্ট থাকলেও ততটা তৎপর নয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তথা ইরান, মরক্কো, ভারত, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া রোহিঙ্গাদের সাহায্য সহোযোগীতার হাত বাড়াতে গিয়ে ত্রাণ সামগ্রী পাঠিয়েছে। আর সরকারী হিসেব অনুযায়ী হাজার হাজার টন ত্রাণ বিতরন কার্যক্রম চললেও এখন তা একেবারেই বন্ধ প্রায়। তবে ব্যক্তিগত ও বেসরকারী পর্যায়ের ত্রাণ বিতরনের কোন হিসেব নেই। বিশ্বের ৪০টি দেশের রাষ্ট্রদূতসহ ৪৭টি দেশের প্রতিনিধি কক্সবাজারের উখিয়া, কুতুপালংসহ বিভিন্ন রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্প পরিদর্শন করলেও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে পারেনি। মিয়ানমার রোহিঙ্গা তাড়ানোর ইস্যুতে অটল থাকায় নাফ নদী পার হয়ে রোহিঙ্গারা আসছে এদেশে।
বাংলাধারা/এফএস/এফএস












